রমজান শুরু হতেই রাজধানীর ফলের বাজারে দাম যেন লাগামছাড়া। ইফতারের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হিসেবে ফলের চাহিদা বাড়লেও মূল্যবৃদ্ধির চাপে নাভিশ্বাস উঠেছে মধ্যবিত্ত পরিবারের। রাজধানীর শাহজাদপুর, কারওয়ান বাজার ও ইস্কাটন ঘুরে দেখা গেছে—খেজুর, মাল্টা, আপেল, আঙুর ও নাশপাতির দাম গত কয়েক সপ্তাহে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
খুচরা কেনাকাটায় ঝুঁকছেন ক্রেতারা
রাজধানীর শাহজাদপুরে ইফতারের বাজার করতে এসে এক ক্রেতা জানান, আগে এক–দুই কেজি করে ফল কেনা যেত, এখন কয়েক পিস করে কিনতেই বাধ্য হচ্ছেন। মাত্র দুটি মাল্টা, চারটি কমলা, চারটি আপেল ও অল্প কিছু আঙুর কিনতেই গুনতে হয়েছে প্রায় ৮০০ টাকা। দেশি ফলের দামও কম নয়—বরই, পেঁপে, পেয়ারাসহ কলার দামও বেড়েছে ৩০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত।
আমদানি ফলের দামে বড় উল্লম্ফন
বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মাল্টা ও কমলা বিক্রি হচ্ছে ৩২০–৩৬০ টাকায়। লাল আপেল ৩৬০–৪০০ টাকা, সবুজ আপেল ৪৩০–৪৫০ টাকা, সবুজ আঙুর ৪৩০–৪৫০ টাকা এবং লাল আঙুর ৫২০–৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ডালিমের কেজি ৫০০–৬০০ টাকা এবং নাশপাতি ৪৫০ টাকার ঘরে।
সুপারশপগুলোতে দাম আরও বেশি। চাইনিজ কমলা ৪৪৫ টাকা, কিনো ৪০০ টাকা, লাল অস্ট্রেলিয়ান আঙুর প্রায় ৬৯৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। উন্নত মানের খেজুরের দাম ৬০০ থেকে ১,৫০০ টাকার মধ্যে।
চাহিদা ও সরবরাহ—দুইয়ের চাপে বাজার
ব্যবসায়ীরা বলছেন, রমজানে স্বাভাবিকভাবেই ফলের চাহিদা বেড়ে যায়, ফলে দাম বাড়ে। বিশেষ করে ইফতারের সময় খেজুর, আঙুর ও আপেলের বিক্রি কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। তবে শুধু চাহিদাই নয়, সরবরাহ ব্যবস্থার জটিলতাও মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
কিছু আমদানিকারকের দাবি, নির্দিষ্ট কিছু ফলের চালান বন্দরে আটকে থাকায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। চাহিদার তুলনায় পণ্যের জোগান কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই বাজারে দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়।
উচ্চ শুল্ক নিয়ে বিতর্ক
বর্তমানে ফল আমদানিতে মোট শুল্কের হার প্রায় ৯০ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উচ্চ শুল্ক সরাসরি খুচরা বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণ। জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফল কোনো বিলাসপণ্য নয়; এটি সুষম খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উচ্চ শুল্ক সাধারণ মানুষের পুষ্টি প্রাপ্তিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর চাহিদা শুধু দেশীয় উৎপাদন দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখতে আঙুর, আপেল, কমলা, নাশপাতির মতো ফলের সহজলভ্যতা জরুরি।
পুষ্টির প্রশ্নে সতর্কবার্তা
পুষ্টিবিদরা বলছেন, ফল ও সবজিতে থাকা ভিটামিন ও মিনারেলস দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি রোধ করে। রমজানে দীর্ঘ সময় রোজা রাখার পর শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি পূরণে ফল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতিদিন অন্তত ১০০ গ্রাম ফল খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।
সবজির বাজারে আংশিক স্বস্তি
ফলের বাজারে অস্থিরতার বিপরীতে কিছু সবজির দামে সামান্য স্বস্তি মিলেছে। বেগুন, কাঁচামরিচ ও লেবুর দাম কিছুটা কমেছে সরবরাহ বাড়ার কারণে। তবে মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এই কমতিও যথেষ্ট স্বস্তি এনে দিতে পারছে না।
বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বেগুন কেজিপ্রতি ৭০–১০০ টাকা, কাঁচামরিচ ৮০–১২০ টাকা এবং লেবু ডজনপ্রতি ১৫০–২৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য সবজির দাম মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে।
মধ্যবিত্তের বাজেটে চাপ
রমজানের শুরুতেই ফলের বাজারে এমন ঊর্ধ্বগতি মধ্যবিত্ত পরিবারের বাজেটে বড় চাপ তৈরি করেছে। অনেকেই নিয়মিত কেনাকাটার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া এবং নীতিগত সমন্বয় না এলে সামনে দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
রমজানে ইফতারের টেবিলে ফলের উপস্থিতি শুধু ঐতিহ্য নয়, পুষ্টিরও অংশ। কিন্তু বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সেটি অনেক পরিবারের জন্য ধীরে ধীরে বিলাসিতায় পরিণত হচ্ছে।




