চলতি অর্থবছর ২০২৫–২৬-এর প্রথম সাত মাসে বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থায়ন চিত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন স্পষ্ট হয়েছে। নতুন ঋণ প্রবাহের তুলনায় পরিশোধের পরিমাণ বেশি হওয়ায় সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি নীরব চাপ তৈরি হচ্ছে—বিশেষ করে যখন বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোচ্ছে না।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন Economic Relations Division (ইআরডি)-এর তথ্য অনুযায়ী, জুলাই–জানুয়ারি সময়ে বাংলাদেশ মোট ২.৬৭ বিলিয়ন ডলার বিদেশি ঋণ পরিশোধ করেছে। একই সময়ে ঋণের ছাড় (ডিসবার্সমেন্ট) নেমে এসেছে ২.৪ বিলিয়ন ডলারে—যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩৩ শতাংশ কম। অর্থাৎ, দেশ এখন যত বৈদেশিক সম্পদ পাচ্ছে, তার চেয়ে বেশি অর্থ বাইরে পাঠাচ্ছে।
সতর্ক সংকেত কেন?
Ashikur Rahman, Policy Research Institute (পিআরআই)-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ, এই প্রবণতাকে একটি “সতর্ক সংকেত” হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, ঋণ পরিশোধ নতুন ঋণ প্রবাহকে ছাড়িয়ে গেলে বৈদেশিক তারল্য পরিস্থিতি সংকুচিত হয় এবং সরকারের আর্থিক নমনীয়তা কমে যায়।
এটি কেবল ঋণের মেয়াদপূর্তির ফল নয়; বরং ধীর প্রকল্প বাস্তবায়ন, ঋণ ছাড়ে জটিলতা এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধির সীমাবদ্ধতার সম্মিলিত প্রতিফলন। যদিও বর্তমান পরিস্থিতি সরাসরি সংকট নির্দেশ করে না, তবুও এটি নীতিনির্ধারণে সরকারের সক্ষমতাকে সীমিত করছে—বিশেষত যখন রাজস্ব ও বৈদেশিক আয়ের ওপর চাপ রয়েছে।
এডিপি বাস্তবায়ন ও প্রতিশ্রুতি হ্রাস
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন Implementation Monitoring and Evaluation Division (আইএমইডি) জানিয়েছে, বিদেশি অর্থায়িত এডিপি বাস্তবায়নের হার জুলাই–জানুয়ারি সময়ে ছিল ৩৬ শতাংশ—যা আগের বছরের তুলনায় সামান্য উন্নতি হলেও কাঙ্ক্ষিত গতি অর্জন করতে পারেনি।
এদিকে World Bank, Asian Development Bank এবং রাশিয়া, চীন, জাপান ও ভারতের মতো উন্নয়ন অংশীদারদের নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতি ৩ শতাংশ কমে ২.২৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বৈশ্বিক আর্থিক পরিবেশের অনিশ্চয়তা ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবায়ন জটিলতা—দুইয়ের সমন্বয়ে এই ধীরগতি দেখা যাচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
রাজস্ব ঘাটতি ও ব্যাংক ঋণের চাপ
রাষ্ট্রের প্রধান রাজস্ব সংস্থা National Board of Revenue (এনবিআর) জুলাই–জানুয়ারি সময়ে রাজস্ব আদায় ১৩ শতাংশ বাড়াতে সক্ষম হলেও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২৭ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে। রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬০,১১০ কোটি টাকা—যা সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে আরও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
অন্যদিকে Bangladesh Bank-এর প্রাথমিক তথ্যে দেখা যায়, একই সময়ে সরকারের ব্যাংক খাত থেকে নিট ঋণ গ্রহণ বেড়ে ৪৮,৮০০ কোটির বেশি হয়েছে—যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ। অর্থাৎ, বৈদেশিক প্রবাহ কমে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, যা বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি সংকুচিত করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সংকুচিত হচ্ছে ‘ফিসক্যাল স্পেস’
Towfiqul Islam Khan, Centre for Policy Dialogue (সিপিডি)-এর গবেষণা পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব), বলেন—ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ার অর্থ সরকারের ‘ফিসক্যাল স্পেস’ দ্রুত কমে যাওয়া। অর্থাৎ, সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ন না করে নতুন খাতে ব্যয় করার সক্ষমতা সংকুচিত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, অর্থবছর ২০২৪–২৫-এ বাংলাদেশ বহুপাক্ষিক ও দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতাদের প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে—যা আগের বছরের ৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।
সামনে কী?
অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি সমন্বয়ের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য। রপ্তানি বহুমুখীকরণ, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং দেশীয় সম্পদ আহরণ জোরদার—এসব পদক্ষেপ ছাড়া বৈদেশিক ঝুঁকি পুনরায় তীব্র হতে পারে।
বাংলাদেশ এখনো ঋণসংকটে পড়েনি, তবে ঋণপ্রবাহ ও পরিশোধের এই ভারসাম্যহীনতা একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—উন্নয়ন ব্যয়, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং বৈদেশিক ঋণ কৌশলে আরও শৃঙ্খলা ও দক্ষতা প্রয়োজন। অন্যথায় প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা—দুইই কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: The Daily Star




