বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের অবদান অনস্বীকার্য। এই অর্থই অনেক পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখে, দেশে ডলার প্রবাহ নিশ্চিত করে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গড়ে তোলে। অথচ সম্প্রতি এক আন্তর্জাতিক প্রস্তাব আমাদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে এমন একটি আইন প্রস্তাব উঠেছে, যেখানে বিদেশে অর্থ পাঠালে ৫ শতাংশ হারে এক্সসাইজ কর (Excise Tax) আদায়ের বিধান রাখা হয়েছে। বিষয়টি যেন বাংলাদেশের প্রবাসীদের কাঁধে নতুন এক বোঝা।
কোন প্রস্তাবনা?
২০২৫ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেস সদস্যরা “Remittance Transfer Fairness and Responsibility Act” নামে একটি বিল পেশ করেছেন। এই আইনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত কেউ যদি উন্নয়নশীল দেশগুলোতে (যেমন বাংলাদেশ, ফিলিপাইন, মেক্সিকো, ইত্যাদি) অর্থ পাঠান, তাহলে তাঁকে ৫ শতাংশ এক্সসাইজ ট্যাক্স দিতে হবে।
এই ট্যাক্স প্রযোজ্য হবে প্রতি ট্রান্সফারের ওপর এবং এই খরচ বহন করতে হবে সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে, যিনি অর্থ পাঠাচ্ছেন।
রেফারেন্স:
EY Tax News – New 5% Excise Tax Proposed for Remittance Transfers (2025)
বাংলাদেশে প্রভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে?
বাংলাদেশে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসী আয় এসেছে প্রায় ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বড় একটি অংশ এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এই আইন কার্যকর হলে:
- প্রবাসীরা আইনত অর্থ পাঠাতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
- রেমিট্যান্সের খরচ বেড়ে যাবে, যা পরিবারগুলোকে আর্থিক চাপে ফেলবে।
- অনেকেই হুন্ডি বা অবৈধ পথে টাকা পাঠাতে আগ্রহী হতে পারেন।
- বৈধ রেমিট্যান্স কমে গেলে ডলারের রিজার্ভে মারাত্মক প্রভাব পড়বে।
এই কর কি শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রযোজ্য?
হ্যাঁ, এই মুহূর্তে করের প্রস্তাবটি শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রবাসীরা যদি বাংলাদেশে টাকা পাঠান, তাহলে এই আইন কার্যকর হলে তারা কর দিতে বাধ্য হবেন।
যারা ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য বা অন্য দেশ থেকে টাকা পাঠান, তারা এই আইনের আওতায় আসবেন না (যতক্ষণ না ঐসব দেশ এ ধরনের আলাদা আইন করে)।
বাংলাদেশ সরকারের করণীয় কী?
এই মুহূর্তে সরকার চাইলে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ নিতে পারে:
- কূটনৈতিক স্তরে আলোচনা: মার্কিন সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে প্রবাসী রেমিট্যান্সে কর না বসানোর দাবি জানানো।
- প্রণোদনার ব্যবস্থা: প্রবাসীদের জন্য নগদ প্রণোদনা বা রেমিট্যান্সের ওপর ভ্যাট/চার্জ ছাড়।
- হুন্ডি প্রতিরোধ: অবৈধ লেনদেন প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা জোরদার করা।
উপসংহার
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো বহুলাংশে প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত লাখো বাংলাদেশি নাগরিক যাদের পাঠানো রেমিট্যান্সে হাজার হাজার পরিবার বেঁচে থাকে, তাদের ওপর কর বসানো হলে সেই প্রভাব শুধু প্রবাসী বা পরিবারেই নয়, সম্পূর্ণ দেশের অর্থনীতিতে নেমে আসবে বড় বিপর্যয়।
এখনই সময়—সরকার, পলিসি মেকার ও প্রবাসী সংগঠনগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে। না হলে ভবিষ্যতে ‘অর্থ পাঠানো’ হয়ে উঠবে ‘অর্থিক শাস্তি’। এখনই সময়, সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহলের উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচনায় যাওয়া।



