আপনি হয়তো লক্ষ্য করেছেন—অফিসে এক সময়ের প্রাণবন্ত সহকর্মীটি আজকাল নিঃশব্দ, আগ্রহহীন। মিটিংয়ে থাকলেও মন নেই, ডেডলাইনের চাপে বিরক্তি লুকানো যায় না। এটাই বার্নআউট—একটা নিঃশব্দ বাস্তবতা, যা আজ বাংলাদেশের প্রায় সব কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে ঢুকে পড়েছে।
আমাদের দেশের কর্পোরেট কালচারে কাজের চাপকে অনেক সময় ‘অর্জনের অংশ’ ভাবা হয়। কিন্তু সত্যি হলো, বার্নআউট মানে শুধু ক্লান্তি নয়—এটা ধীরে ধীরে কর্মীদের মানসিক এবং শারীরিকভাবে ভেঙে দেয়, যার প্রভাব পড়ে কোম্পানির পারফরম্যান্স, এমপ্লয়ি রিটেনশন এবং ব্র্যান্ড ইমেজেও।
কর্মীদের বার্নআউট কেমন হয়?
কর্মীরা যখন প্রতিদিন একঘেয়ে চাপের মধ্যে কাজ করেন, সঠিক প্রশান্তি বা স্বীকৃতি ছাড়া, তখন তারা ধীরে ধীরে ভিতর থেকে ক্ষয়ে যেতে থাকেন। কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে যায়, উৎপাদনশীলতা কমে আসে, অনিদ্রা ও হতাশা নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়।
একটা গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার কর্পোরেট কর্মীদের মধ্যে অন্তত ৭২% কর্মী মানসিক চাপের কারণে কর্মক্ষেত্রে অস্বস্তিতে ভুগছেন। তাদের অনেকেই বার্নআউটের লক্ষণ বুঝলেও সেটা প্রকাশ করতে পারেন না, কারণ এখনো অনেক অফিসে এই বিষয়টিকে ‘দুর্বলতা’ হিসেবে দেখা হয়।
কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কী করার আছে?
প্রথমত, ‘wellness’ নিয়ে নীতিগত চিন্তা করতে হবে। কেবল সাপ্তাহিক ছুটি দিয়ে বা বছরে একবার পিকনিক করলেই কর্মীদের সুস্থ রাখা যায় না। কর্মীদের যত্ন নেওয়া মানে বিনিয়োগ—একজন কর্মী সুস্থ থাকলে তার প্রোডাক্টিভিটি বাড়ে, রিটেনশন বাড়ে, কোম্পানির ব্র্যান্ড ভ্যালুও বাড়ে।
বাংলাদেশের কিছু বড় কর্পোরেট ইতিমধ্যে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। উদাহরণস্বরূপ, কয়েকটি টেলিকম কোম্পানি ‘mental health champion’ রাখছে, কিছু ব্যাংক “mental health day” চালু করেছে, আবার কিছু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বছরে একবার “mental detox week” রাখছে।
বাস্তব সমাধান: বার্নআউট মোকাবেলায় করণীয়
এখানে আমরা ২টি বিষয় তুলে ধরছি, যা যেকোনো প্রতিষ্ঠান কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে:
১. ফ্লেক্সিবল ওয়ার্ক কালচার চালু করা: outcome-based কাজের পরিবেশ গড়লে কর্মীদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ পড়ে না। রিমোট ওয়ার্ক, হাইব্রিড সিস্টেম বা ফ্লেক্সিবল টাইম অনেক কর্মীর জন্যই জীবন বদলে দিতে পারে।
২. মনোযোগ দেওয়া মানসিক স্বাস্থ্যে: প্রতি মাসে ১টি মাইন্ডফুলনেস সেশন, অফিসে কাউন্সেলিং সুবিধা, কিংবা একটি break-out space—এই ছোট ছোট উদ্যোগগুলো কর্মীদের বার্নআউট থেকে রক্ষা করতে পারে।
উপসংহার
একটা বিষয় ভুললে চলবে না—একটা কোম্পানির সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার মানুষ। তারা যদি প্রতিদিন নিঃশব্দে ভেঙে পড়ে, তবে সেই কোম্পানির ভবিষ্যৎও ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
আজই সময় সচেতন হবার। বার্নআউটকে ‘personal issue’ ভাবা বন্ধ করতে হবে। এটা কর্পোরেট দায়বদ্ধতারই অংশ। কর্মীদের ভালো রাখলে, তারাই আপনার প্রতিষ্ঠানকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে।





