spot_imgspot_imgspot_imgspot_img

Post-Covid Strategy: এখনো কতোটা বদলেছে কর্পোরেট নীতি?

লেখকঃ নাওমী ইসলাম 

ভূমিকা 

করোনাভাইরাস মহামারি বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সংস্কৃতিতে এক ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। মহামারি-পরবর্তী সময়ে দেশের কর্পোরেট নীতিতে কতোটা পরিবর্তন এসেছে, তা নিয়ে ব্যবসায়িক মহলে আলোচনা চলছে। এই নিবন্ধে আমরা দেখব, করোনা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের কর্পোরেট নীতির কী কী পরিবর্তন হয়েছে, তা কতোটা টেকসই, এবং এসব বদল কতোটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

মহামারি-পরবর্তী কর্পোরেট নীতির মূল দিকগুলো

১. ডিজিটাল ট্রান্সফর্মেশন ও অনলাইন ব্যবসা

করোনা মহামারি বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যবসা ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বাড়িয়েছে। লকডাউনের সময়ে মানুষ ঘর থেকে বের হতে না পারায়, অনলাইন শপিং, ফুড ডেলিভারি, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম এবং অন্যান্য ডিজিটাল সেবার চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। অনেক কোম্পানি তাদের ব্যবসা মডেলকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসেছে, যেখানে ই-কমার্স, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং সার্চ ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশন (SEO) এখন ব্যবসার মূল অস্ত্র হয়ে উঠেছে। সার্চ ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশন (SEO) এখন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি কোম্পানি চায় তাদের ওয়েবসাইট বা অনলাইন স্টোর যাতে সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়। এজন্য তারা লোকাল কীওয়ার্ড রিসার্চ, গুগল মাই বিজনেস (GMB) অপ্টিমাইজেশন, মোবাইল ফ্রেন্ডলি ওয়েবসাইট এবং ভয়েস সার্চ অপ্টিমাইজেশনে জোর দিচ্ছে।

২. কর্মী ব্যবস্থাপনা ও ‘নিউ নরমাল’ কাজের সংস্কৃতি

করোনা মহামারির কারণে বাংলাদেশের প্রায় সব কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানই ‘নিউ নরমাল’ বা নতুন স্বাভাবিক কাজের সংস্কৃতি গ্রহণ করেছে। অনেক কোম্পানি এখন কর্মীদের জন্য Work From Home (WFH) এবং হাইব্রিড কাজের সুযোগ দিচ্ছে। এই পরিবর্তন শুধুমাত্র কাজের পদ্ধতিই বদলায়নি, বরং মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা (HR) পদ্ধতিতেও ব্যাপক পরিবর্তন আনতে বাধ্য করেছে।

এখন HR ম্যানেজারদের টেকস্যাভি কর্মী নিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের দিকে বেশি নজর দিতে হচ্ছে। এছাড়া, মহামারির সময়ে অনেক কোম্পানি কর্মী ছাঁটাই, বেতন কমানো বা চাকরি স্থগিত রাখার মতো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। তবে, এখন অনেক প্রতিষ্ঠান আবার নতুন করে কর্মী নিয়োগ দিচ্ছে এবং কর্মীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও ব্যবস্থা নিচ্ছে।

৩. সাপ্লাই চেইন ও উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তন

মহামারির কারণে বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হওয়ায়, বাংলাদেশের অনেক কোম্পানি তাদের সাপ্লাই চেইনকে ডাইভারসিফাই (বিভিন্ন উৎস থেকে নেওয়া) করতে বাধ্য হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী এখন বিদেশি পণ্যের পরিবর্তে দেশীয় পণ্য ও সরঞ্জাম ব্যবহার করছে, যা সময় ও খরচ কমাতে সাহায্য করছে। এছাড়া, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও টেকসই এবং স্থিতিস্থাপক (resilient) করতে কোম্পানিগুলো ডিজিটাল সমাধান ও অটোমেশন প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেছে।

৪. সরকারি নীতি ও সহায়তা

বাংলাদেশ সরকার মহামারির সময়ে ব্যবসায়ীদের সহায়তা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ, ঋণ সুবিধা এবং নীতিগত সহায়তা প্রদান করেছে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্প, পোশাক শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (SME) এবং অন্যান্য সেবা খাতকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে, অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী এখনো এই সহায়তা সম্পর্কে সচেতন নয় বা সহজে পাচ্ছেন না।

সরকারি নীতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, ব্যবসায়িক পরিবেশকে সহজ করা এবং বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। এজন্য লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজ করা, রেগুলেটরি বোঝা কমানো এবং নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছে।

৫. কর্পোরেট গভর্ন্যান্স ও আর্থিক স্থিতিস্থাপকতা

করোনা মহামারির সময়ে বাংলাদেশের কর্পোরেট গভর্ন্যান্সের গুরুত্ব নতুনভাবে উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শক্তিশালী গভর্ন্যান্স কাঠামো (বোর্ড সাইজ, বোর্ড স্বাধীনতা, অডিট কমিটির কার্যকারিতা) থাকা কোম্পানিগুলো আর্থিক সংকটে বেশি স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছ। বোর্ডের স্বাধীনতা এবং অডিট কমিটির কার্যকারিতা আর্থিক স্থিতিশীলতা বাড়ায়, অন্যদিকে মালিকানার কেন্দ্রীকরণ আর্থিক স্থিতিস্থাপকতা কমায়। এজন্য এখন কোম্পানিগুলো গভর্ন্যান্স কাঠামো শক্তিশালী করার দিকে জোর দিচ্ছে।

কর্পোরেট নীতির বদল কতোটা টেকসই?

করোনা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের কর্পোরেট নীতিতে যে পরিবর্তন এসেছে, তা অনেকটাই টেকসই এবং দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে ডিজিটাল ট্রান্সফর্মেশন, অনলাইন ব্যবসা, এবং কর্মী ব্যবস্থাপনার নতুন পদ্ধতি এখন প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল কৌশলে পরিণত হয়েছে। তবে, এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। যেমন, অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এখনো ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে আছে। এছাড়া, সরকারি সহায়তা অনেক সময় সঠিকভাবে পৌঁছাচ্ছে না বা ব্যবসায়ীরা সচেতন নয়। আবার, সাপ্লাই চেইন এবং উৎপাদন ব্যবস্থাকে স্থিতিস্থাপক করতে হলে আরও বেশি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন প্রয়োজন।

SEO ও ডিজিটাল মার্কেটিং: ব্যবসার নতুন হাতিয়ার

করোনা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে অনলাইন মার্কেটিং ও SEO এখন ব্যবসার মূল কৌশলে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি কোম্পানি চায় তাদের ব্র্যান্ডকে অনলাইনে দৃশ্যমান করতে। এজন্য তারা লোকাল কীওয়ার্ড রিসার্চ, গুগল মাই বিজনেস অপ্টিমাইজেশন, মোবাইল ফ্রেন্ডলি ওয়েবসাইট, ভয়েস সার্চ অপ্টিমাইজেশন এবং সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং ব্যবহার করছে।

অনলাইন মার্কেটিং ও SEO-এর মাধ্যমে কোম্পানিগুলো এখন তাদের টার্গেট গ্রাহকদের কাছে সহজেই পৌঁছাতে পারছে এবং ব্যবসার রেভেনিউ বাড়াতে পারছে। এছাড়া, অনলাইন মার্কেটিং ট্র্যাডিশনাল বিজ্ঞাপনের চেয়ে সাশ্রয়ী এবং ফলপ্রসূ হওয়ায়, ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরাও এটি গ্রহণ করছে।

অভ্যন্তরীণ ও বহিঃস্থ চ্যালেঞ্জ

করোনা-পরবর্তী কর্পোরেট নীতির বদল এখনো কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। যেমন:

  • ডিজিটালাইজেশনে পিছিয়ে থাকা: অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এখনো ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে আছে।
  • সরকারি সহায়তা সচেতনতার অভাব: অনেক ব্যবসায়ী এখনো সরকারি প্রণোদনা ও ঋণ সুবিধা সম্পর্কে সচেতন নয় বা সহজে পাচ্ছেন না।
  • তরল অর্থের অভাব: মহামারির কারণে অনেক ব্যবসায়ীর তরল অর্থের সংকট দেখা দিয়েছে, যা ব্যবসা চালু রাখতে বাধা সৃষ্টি করছে।
  • কর্মী ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন: নতুন কাজের সংস্কৃতি গ্রহণ করতে অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো সংগ্রাম করছে।
  • সাপ্লাই চেইন ও উৎপাদন ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা: সাপ্লাই চেইন ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিস্থাপক করতে হলে আরও বেশি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন প্রয়োজন।

ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা

করোনা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের কর্পোরেট নীতির বদল একদিকে যেমন নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে নতুন চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করেছে। ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি ডিজিটালাইজেশনে জোর দিতে হবে, কর্মী ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক করতে হবে এবং সাপ্লাই চেইন ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিস্থাপক করতে হবে। এছাড়া, সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনা প্যাকেজ যাতে সঠিকভাবে ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছায়, সেদিকেও নজর দিতে হবে। সর্বোপরি, অনলাইন মার্কেটিং ও SEO-এর মতো ডিজিটাল কৌশলগুলো এখন বাংলাদেশের ব্যবসার জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

উপসংহার

করোনা মহামারি বাংলাদেশের কর্পোরেট নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। ডিজিটাল ট্রান্সফর্মেশন, অনলাইন ব্যবসা, কর্মী ব্যবস্থাপনার নতুন পদ্ধতি এবং সরকারি সহায়তা এখন প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল কৌশলে পরিণত হয়েছে। তবে, এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, যা মোকাবিলা করতে হলে আরও বেশি ডিজিটালাইজেশন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কর্পোরেট নীতির বদল আরও গতিশীল ও টেকসই হবে বলে আশা করা যায়।

কিছু সাধারণ প্রশ্নোত্তর (Q&A)

১: Post-Covid সময়ে বাংলাদেশের কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে পরিবর্তন হয়েছে?
উত্তর: কর্মপদ্ধতি, প্রযুক্তি ব্যবহার, মানবসম্পদ নীতি, এবং গ্রাহক সেবায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।

২: হাইব্রিড ওয়ার্ক এখনো চালু আছে?
উত্তর: হ্যাঁ, বিশেষ করে IT ও ব্যাংকিং খাতে।

৩: প্রতিষ্ঠানগুলো এখন Employee wellbeing-এ কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে?
উত্তর: এখন প্রায় ৭৮% প্রতিষ্ঠান মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতা নিয়ে সচেতনভাবে বাজেট দিচ্ছে।

৪: কোভিডের পরে বাংলাদেশের কোন প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ বেশি দেখা যাচ্ছে?
উত্তর: ফিনটেক (ফাইন্যান্সিয়াল টেকনোলজি), ই-কমার্স ও অনলাইন মার্কেটপ্লেস, এডটেক (এডুকেশন টেকনোলজি) ও হেলথটেক (হেলথ টেকনোলজি), ক্লাউড কম্পিউটিং, বিগ ডেটা ও এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা), সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ও আইটি সার্ভিস, লজিস্টিকস ও ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন।

More articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest article

কারখানা পুনরায় চালু ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা

ঢাকা, ২৪ মে ২০২৬ — দ্য ডেইলি কর্পোরেট ডেস্ক দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু, রপ্তানি কার্যক্রমে গতি আনা এবং বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য...

আইএফআইসি ব্যাংক ও ল্যাবএইড গ্রুপের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর

ঢাকা, ২০ মে ২০২৬ — দ্য ডেইলি কর্পোরেট ডেস্ক গ্রাহক ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা নিশ্চিত করতে আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসি এবং দেশের অন্যতম...

ব্যস্ত না, কার্যকর হোন, উদ্যোক্তাদের সময় ব্যবস্থাপনা

লিখেছেনঃ মালিহা মেহেজাবিন বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক বিশ্বে একজন উদ্যোক্তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ শুধু মূলধন, মানবসম্পদ বা প্রযুক্তি নয়; বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো সময়। অর্থ...

ব্যবসায় ব্যর্থতার প্রধান কারণগুলো কী?

লেখকঃ আরেফিন রানা পিয়াস বর্তমান সময়ে ব্যবসা ও উদ্যোক্তা কার্যক্রম বিশ্ব অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন অনেক মানুষ নতুন ব্যবসা শুরু করলেও বাস্তবে...