spot_imgspot_imgspot_imgspot_img

ড্রোন প্রযুক্তি কীভাবে বদলে দিচ্ছে বাংলাদেশের কৃষি খাত? জানুন চাষিদের নতুন সফলতার গল্প

লেখা: কাজী গণিউর রহমান 

বাংলাদেশের কৃষি খাত দীর্ঘদিন ধরে মানুষের ঘামঝরা পরিশ্রম, মৌসুমি নির্ভরতা এবং প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু বিশ্ব যখন কৃষিতে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ছোঁয়া পাচ্ছে, তখন বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে প্রযুক্তি, বিশেষ করে ড্রোন বা UAV (Unmanned Aerial Vehicle) ব্যবহারের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। কৃষিকাজে ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে যেমন শ্রম এবং সময় সাশ্রয় হচ্ছে, তেমনি উৎপাদনশীলতাও বাড়ছে—যা জলবায়ু পরিবর্তন, শ্রমঘাটতি ও বাজার প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রশ্ন হচ্ছে—ড্রোন প্রযুক্তির এই অগ্রগতি বাংলাদেশে কৃষকদের মধ্যে কতটা জনপ্রিয় হয়েছে? এবং এটি কি কেবল পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে, নাকি বাস্তব প্রয়োগে ইতোমধ্যে সফলতার ছাপ ফেলছে?

ড্রোন প্রযুক্তি: কৃষিতে ব্যবহারের ধারণা

ড্রোন মূলত এমন এক ধরনের স্বয়ংক্রিয় বা দূরনিয়ন্ত্রিত উড়ন্ত যন্ত্র, যা ক্যামেরা ও সেন্সর প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকায় চিত্র ধারণ, তথ্য সংগ্রহ বা নির্দিষ্ট কাজ (যেমন কীটনাশক ছিটানো) করতে পারে। আধুনিক কৃষিতে ড্রোন ব্যবহারের প্রধান কাজগুলো হলো:

  • ক্ষেতে সার বা কীটনাশক স্প্রে করা
  • ফসলের অবস্থা পর্যবেক্ষণ (crop monitoring)
  • জমির ম্যাপিং ও মাটি বিশ্লেষণ
  • বন্যা বা জলাবদ্ধতার পর অবস্থা মূল্যায়ন
  • ফসল কাটার পূর্বাভাস ও ডেটা বিশ্লেষণ

এই প্রযুক্তির ব্যবহারে কৃষকরা স্বল্প খরচে অধিক উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারছেন, যা কৃষির ভবিষ্যত উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক দিক।

বাংলাদেশে ড্রোন ব্যবহারের বর্তমান চিত্র

বাংলাদেশে ড্রোন কৃষিতে ব্যবহারের ধারণাটি এক দশক আগেও ছিল কল্পনার মতো। তবে ২০২১ সালের পর থেকে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কৃষিতে ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়। BRRI (বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট) এবং BARI (বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট) পরীক্ষামূলকভাবে ধান ও সবজি চাষে ড্রোন ব্যবহার শুরু করে। উদাহরণস্বরূপ, গাজীপুর ও নরসিংদীর কয়েকটি উপজেলায় কীটনাশক স্প্রে করার জন্য ড্রোন ব্যবহার করে কৃষকদের মধ্যে সফলতা দেখা যায়।

একইসাথে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন iFarmer, KrishiHub, এবং কিছু অ্যাগ্রোটেক স্টার্টআপ ড্রোন ব্যবহার করে ডেটা সংগ্রহ, রোগ শনাক্তকরণ ও জমির মান যাচাইয়ে কৃষকদের সহায়তা দিচ্ছে। ‘Digital Bangladesh’ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে কৃষি বিভাগ ২০২৩ সালে কয়েকটি জেলায় ড্রোন প্রদর্শনীও আয়োজন করে।

ড্রোন ব্যবহারে কৃষকদের অভিজ্ঞতা

ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার কৃষক মো. মনির হোসেন জানিয়েছেন, সাধারণত ৩ বিঘা জমিতে কীটনাশক স্প্রে করতে যেখানে ৩ জন শ্রমিক ও ৩ ঘণ্টা সময় লাগত, সেখানে ড্রোনের মাধ্যমে মাত্র ৩০ মিনিটেই পুরো কাজটি সম্পন্ন হয়েছে এবং খরচও ৪০% কমেছে।

এই অভিজ্ঞতা শুধু সময় ও খরচ সাশ্রয়ের প্রমাণই নয়, বরং কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণযোগ্যতা কতটা দ্রুত বাড়ছে, তারও একটি দৃষ্টান্ত।

আরো পড়ুন – গ্রাম থেকে শহরে পণ্য বিক্রি—কৃষকদের জন্য শুরু হলো স্মার্ট সাপ্লাই চেইন

সরকারি ও নীতিগত উদ্যোগ

২০২২ সালের ডিসেম্বরে কৃষি মন্ত্রণালয় ও ICT Division যৌথভাবে “Precision Agriculture Initiative” চালু করে, যার মূল লক্ষ্য ছিল প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির প্রসার ঘটানো। এর আওতায় নির্বাচিত ১০টি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে ড্রোন ব্যবহার করে মাটি ও ফসলের মান পর্যবেক্ষণ, কৃষক প্রশিক্ষণ এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে তথ্য হালনাগাদ শুরু হয়।

এছাড়া Krishi Call Center 16123 এবং কৃষি বাতায়ন প্ল্যাটফর্মে কৃষকদের ড্রোন সংক্রান্ত প্রাথমিক পরামর্শ এবং ট্রেনিংয়ের তথ্য দেওয়া হচ্ছে। এমনকি কৃষি ব্যাংক ও SME ফান্ডের আওতায় কিছু স্টার্টআপকে ড্রোন কেনার জন্য সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে।

ড্রোন ব্যবহার: সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ

ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষকেরা জমির স্বাস্থ্য সম্পর্কে আগেভাগেই জানতে পারছেন। আগাছা বা রোগ-বালাই শুরু হওয়ার পূর্বেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। উৎপাদনশীলতা ১০–২০% পর্যন্ত বাড়ছে, বিশেষ করে ধান ও সবজি চাষে। তাছাড়া, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় (যেমন বন্যা কবলিত অঞ্চল) ড্রোন ব্যবহার করে দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি নির্ণয় ও পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা গ্রহণ সম্ভব হচ্ছে।

তবে এই ব্যবস্থার কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে:

  • ড্রোনের দাম এখনও অনেক কৃষকের জন্য ব্যয়বহুল (প্রতি ইউনিট ৩–৪ লাখ টাকা পর্যন্ত)
  • দক্ষ অপারেটরের অভাব
  • প্রযুক্তিগত জটিলতা ও রক্ষণাবেক্ষণের ঝামেলা
  • লাইসেন্স ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত নীতিমালার অভাব

বিশ্বব্যাপী ড্রোন কৃষির রোল মডেল

চীন, ভারত ও ইসরায়েলের মতো দেশগুলো ইতোমধ্যে ড্রোন কৃষিতে বিপ্লব ঘটিয়েছে। ভারতে কেন্দ্রীয় সরকার ‘Kisan Drone Yojana’ নামক প্রকল্প চালু করে কৃষকদের ভর্তুকিতে ড্রোন সরবরাহ করছে। বাংলাদেশও চাইলে এই মডেল অনুসরণ করে দীর্ঘমেয়াদি ফল পেতে পারে।

বিশ্বব্যাপী কৃষি ড্রোন মার্কেট ২০২৮ সালের মধ্যে ৭.৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে জানিয়েছে MarketsandMarkets। বাংলাদেশ যদি সঠিকভাবে এই খাতে বিনিয়োগ করে, তবে ড্রোনভিত্তিক কৃষি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি রপ্তানিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

চূড়ান্ত বিশ্লেষণ

বাংলাদেশে কৃষি খাতে ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার দিনদিন বাড়ছে। যদিও এখনো এটি একটি সীমিত গণ্ডিতে থাকলেও, ভবিষ্যতে এর প্রভাব অত্যন্ত গভীর হতে পারে। সময়, খরচ ও উৎপাদন—এই তিন দিক থেকেই ড্রোন কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে। সরকার, কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি উদ্যোক্তারা সম্মিলিতভাবে কাজ করলে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির একটি সুদৃঢ় ভিত্তি গড়ে তোলা সম্ভব।

এই মুহূর্তে প্রয়োজন—অধিক হারে প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ড্রোন সরবরাহ, এবং নীতিগত রোডম্যাপ। তবেই ‘কৃষি বিপ্লব’ শুধু শব্দে নয়, বাস্তব ক্ষেত্রেও বাস্তবায়িত হবে, যার নেতৃত্বে থাকবে ড্রোন।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)

প্রশ্ন ১: ড্রোন দিয়ে কৃষিতে কী কী কাজ করা সম্ভব?
উত্তর: ড্রোন ব্যবহার করে জমিতে কীটনাশক ও সার স্প্রে, ফসল পর্যবেক্ষণ, জমির ম্যাপিং, মাটির মান যাচাই এবং ফসল কাটার পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব।

প্রশ্ন ২: বাংলাদেশের কৃষকরা কি নিজেরা ড্রোন পরিচালনা করতে পারেন?
উত্তর: কিছু কৃষক প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেরা পরিচালনা করছেন, তবে এখনো দক্ষ অপারেটরের ঘাটতি রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ প্রয়োজন।

প্রশ্ন ৩: ড্রোন কৃষিতে কী ধরনের খরচ বাঁচাতে সহায়ক?
উত্তর: এটি শ্রম, সময় ও কীটনাশক স্প্রে খরচ কমায়। অনেক ক্ষেত্রে খরচ ৩০–৪০% পর্যন্ত সাশ্রয় হয়।

প্রশ্ন ৪: ড্রোন ব্যবহার কি সব ফসলের জন্য উপযোগী?
উত্তর: ধান, গম, ভুট্টা, সবজি, সরিষা ইত্যাদির ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে। তবে ফল, বৃক্ষ বা গ্রীনহাউজ কৃষির জন্য প্রযুক্তি আরও উন্নত করতে হবে।

প্রশ্ন ৫: কৃষকরা কিভাবে ড্রোন সুবিধা পেতে পারেন?
উত্তর: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, BRRI, BARI, এবং কৃষি স্টার্টআপ যেমন iFarmer বা KrishiHub–এর মাধ্যমে ভাড়া বা সেবার ভিত্তিতে ড্রোন ব্যবহার করা যাচ্ছে।

তথ্যসূত্র 

More articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest article

কারখানা পুনরায় চালু ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা

ঢাকা, ২৪ মে ২০২৬ — দ্য ডেইলি কর্পোরেট ডেস্ক দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু, রপ্তানি কার্যক্রমে গতি আনা এবং বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য...

আইএফআইসি ব্যাংক ও ল্যাবএইড গ্রুপের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর

ঢাকা, ২০ মে ২০২৬ — দ্য ডেইলি কর্পোরেট ডেস্ক গ্রাহক ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা নিশ্চিত করতে আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসি এবং দেশের অন্যতম...

ব্যস্ত না, কার্যকর হোন, উদ্যোক্তাদের সময় ব্যবস্থাপনা

লিখেছেনঃ মালিহা মেহেজাবিন বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক বিশ্বে একজন উদ্যোক্তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ শুধু মূলধন, মানবসম্পদ বা প্রযুক্তি নয়; বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো সময়। অর্থ...

ব্যবসায় ব্যর্থতার প্রধান কারণগুলো কী?

লেখকঃ আরেফিন রানা পিয়াস বর্তমান সময়ে ব্যবসা ও উদ্যোক্তা কার্যক্রম বিশ্ব অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন অনেক মানুষ নতুন ব্যবসা শুরু করলেও বাস্তবে...