দ্য ডেইলি করপোরেট ডেস্ক
ঢাকা, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬:
বাংলাকিউআর-এর মাধ্যমে পণ্য ও সেবা কেনাবেচায় কোনো লেনদেন নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে তা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য নতুন নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) প্রদানকারী এবং পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে গ্রাহকের অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘গাইডলাইন অন ডিসপিউট রেজল্যুশন ফর বাংলাকিউআর (মার্চেন্ট পেমেন্ট) ট্রানজ্যাকশনস’ শীর্ষক নির্দেশিকাটি ২৭ সেপ্টেম্বর জারি করেছে। নতুন ব্যবস্থা ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে।
নির্দেশনায় লেনদেন ব্যর্থ হওয়া, পণ্য বা সেবা না পাওয়া, একই লেনদেনের অর্থ দুইবার কেটে নেওয়া, ভুল বিলের পরিমাণ এবং গ্রাহকের হিসাব থেকে টাকা কেটে নেওয়ার পরও ব্যবসায়ীর হিসাবে অর্থ না পৌঁছানোর মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
ব্যর্থ লেনদেনে টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরত
বাংলাকিউআর দিয়ে কোনো লেনদেনের সময় গ্রাহকের হিসাব থেকে টাকা কেটে নেওয়া হলেও লেনদেন সম্পন্ন না হলে এবং ব্যবসায়ী টাকা না পেলে, গ্রাহককে আলাদা করে অভিযোগ করতে হবে না।
এ ক্ষেত্রে গ্রাহকের টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরত দেওয়ার দায়িত্ব থাকবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা এমএফএস প্রতিষ্ঠানের। এই অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে অথবা সর্বোচ্চ ৩০ মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।
এতে ব্যর্থ লেনদেনের জন্য গ্রাহককে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা বা আলাদা করে অভিযোগ করার প্রয়োজন কমবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অভিযোগ করার সুযোগ ৪৫ দিন
যেসব বিরোধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে না, সেসব ক্ষেত্রে গ্রাহককে লেনদেনের তারিখ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে অভিযোগ করতে হবে।
অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে দুই কার্যদিবসের মধ্যে তা গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত জানাতে হবে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো সিদ্ধান্ত না এলে অভিযোগটি জাতীয় পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ (NPSB)-এর কেন্দ্রীয় বিরোধ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে চার্জব্যাক প্রক্রিয়ায় যাবে।
বিরোধ নিষ্পত্তিতে ধাপে ধাপে সময়সীমা
চার্জব্যাকের অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট অর্থ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে সাত দিনের মধ্যে জবাব দিতে হবে।
এ পর্যায়েও বিরোধের সমাধান না হলে তা মধ্যস্থতামূলক সালিশি প্রক্রিয়ায় যেতে পারবে। সে ক্ষেত্রে পুরো প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে।
অর্থাৎ বাংলাকিউআর লেনদেন নিয়ে একটি অভিযোগ শুরু হওয়ার পর সেটি নিষ্পত্তির প্রতিটি ধাপেই নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
আট ধরনের বিরোধের জন্য আলাদা কোড
নতুন নির্দেশিকায় চার্জব্যাকের কারণ হিসেবে আটটি নির্দিষ্ট কোড চালু করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে পণ্য বা সেবা না পাওয়া, একই অর্থ একাধিকবার পরিশোধ, ভুল বিল বা অর্থের অঙ্ক এবং গ্রাহকের হিসাব থেকে টাকা কেটে নেওয়ার পরও ব্যবসায়ীর হিসাবে অর্থ জমা না হওয়ার মতো বিষয়।
এর ফলে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগের জন্য আলাদা প্রক্রিয়া অনুসরণ করা সহজ হবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে একটি অভিন্ন কাঠামো তৈরি হবে।
লেনদেনের অবস্থা জানতে তাৎক্ষণিক যাচাই ব্যবস্থা
নির্দেশিকায় আরও একটি নতুন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে কোনো লেনদেনের ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অন্য পক্ষের কাছ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে লেনদেনের অবস্থা যাচাই করতে পারবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এতে ছোটখাটো বা তথ্যগত অস্পষ্টতার কারণে আলাদা করে অভিযোগ দায়েরের প্রয়োজন কমবে এবং বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে।
প্রমাণ দিতে না পারলে অর্থ ফেরত দিতে হবে
বিরোধ তদন্তের সময় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে লেনদেনের পক্ষে প্রয়োজনীয় প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে।
এর মধ্যে থাকতে পারে ইলেকট্রনিক জার্নাল, লেনদেনের তথ্য, রসিদ, এসএমএস রেকর্ড এবং অন্যান্য গ্রহণযোগ্য নথি।
কোনো অর্থ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হলে তাকে বিতর্কিত অর্থ গ্রাহককে ফেরত দিতে হবে। এর পাশাপাশি ওই অর্থের সমপরিমাণ পর্যন্ত অতিরিক্ত জরিমানাও আরোপ হতে পারে।
ব্যবসায়ীদের জন্যও নির্ধারিত সময়
কোনো ব্যবসায়ী বা মার্চেন্ট টাকা ফেরতের দাবি করলে তাকে ৬০ দিনের মধ্যে আবেদন করতে হবে।
আবেদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট অর্থ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে দুই কার্যদিবসের মধ্যে এর বিষয়ে জবাব দিতে হবে।
এতে শুধু গ্রাহক নয়, ব্যবসায়ীদের লেনদেনসংক্রান্ত অভিযোগের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমাধানের সুযোগ তৈরি হবে।
প্রতারণার অভিযোগ তদন্তে সর্বোচ্চ ৩০ দিন
অননুমোদিত বা প্রতারণামূলক লেনদেনের অভিযোগ উঠলে তা তদন্তের জন্য সর্বোচ্চ ৩০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তদন্তে যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা নিরাপত্তাজনিত দুর্বলতার কারণে গ্রাহকের অর্থের ক্ষতি হয়েছে বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে তিন কার্যদিবসের মধ্যে গ্রাহককে অর্থ ফেরত দিতে হবে।
তবে গ্রাহকের অসতর্কতা বা অনিয়মের কারণে ক্ষতি হয়েছে—এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে।
সময়সীমা না মানলে ব্যবস্থা
বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তি না করা কিংবা যথাযথ কারণ ছাড়া গ্রাহকের দাবি প্রত্যাখ্যান করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, এমএফএস বা পেমেন্ট সেবা প্রদানকারীর বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
নতুন নির্দেশিকার মাধ্যমে বাংলাকিউআর লেনদেনে গ্রাহক ও ব্যবসায়ী—উভয়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট ও পূর্বানুমানযোগ্য বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য।
ডিজিটাল পেমেন্টে আস্থা বাড়ানোর উদ্যোগ
বাংলাকিউআর দেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠছে। এ ব্যবস্থায় লেনদেন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থ কেটে নেওয়ার পর সেবা না পাওয়া, ভুল লেনদেন বা অর্থ পৌঁছাতে দেরির মতো বিরোধও তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে।
এসব ক্ষেত্রে কে দায় নেবে, কত সময়ের মধ্যে সমাধান হবে এবং প্রমাণ না দিতে পারলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—নতুন নির্দেশিকায় তার একটি নির্দিষ্ট কাঠামো দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন উদ্যোগ কার্যকর হলে ডিজিটাল লেনদেনে অভিযোগ নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রতা কমানো এবং গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের আস্থা বাড়ানোর ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (TBS)




