spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img

কোম্পানি কিভাবে বিদ্যুৎ খরচ কমাতে পারে?

লেখা: কাজী গণিউর রহমান 

বিদ্যুৎ খরচ এখন শুধু একটি আর্থিক ব্যয় নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে টেকসই উৎপাদন ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বাংলাদেশে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে বিদ্যুৎ ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে, যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে খরচও। বিশেষ করে এসএমই এবং মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ খরচের চাপে লাভজনকতা হারাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠে—একটি কোম্পানি কীভাবে কার্যকরভাবে বিদ্যুৎ খরচ কমাতে পারে?

বিশ্বব্যাপী টেকসই ব্যবসা ও ESG (Environmental, Social and Governance) সূচকের আলোকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাকে এখন কৌশলগতভাবে গ্রহণ করতে হচ্ছে। শুধুমাত্র বিল কমানোই নয়, বরং কোম্পানির ব্র্যান্ড ইমেজ, কর্মক্ষমতা ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতা—সবই এখন বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় সচেতনতা: শুরুটা কোথা থেকে?

কোনো কোম্পানির বিদ্যুৎ খরচ কমাতে হলে প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন চিহ্নিত করা। কোন বিভাগে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে, কোন মেশিনগুলো নিরবিচারে চলছে কিংবা দিনের কোন সময় বিদ্যুৎ চাহিদা সর্বোচ্চ—এসব বিশ্লেষণ ছাড়া কৌশলগত সিদ্ধান্ত সম্ভব নয়। এই জন্য ‘এনার্জি অডিট’ অত্যন্ত কার্যকর একটি পদ্ধতি। বাংলাদেশে এখন অনেক প্রতিষ্ঠানই বছরে একবার করে তাদের কারখানা বা অফিসের বিদ্যুৎ ব্যবহারের অডিট করে। এমনকি সরকারিভাবেও SREDA (Sustainable and Renewable Energy Development Authority) এর মাধ্যমে এনার্জি অডিটের সেবা দেওয়া হচ্ছে।

অটোমেশন ও স্মার্ট ব্যবস্থাপনার প্রভাব

বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠানই তাদের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভরতা বাড়াচ্ছে। অফিস বা কারখানার আলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হওয়া, নির্দিষ্ট সময় পর এসি বা হিটিং সিস্টেম বন্ধ হওয়া কিংবা সফটওয়্যারের মাধ্যমে রিয়েল টাইমে কোন যন্ত্রপাতি কী পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ করছে—এসব ব্যবস্থা বিদ্যুৎ অপচয় রোধে অত্যন্ত কার্যকর। DBL Group এবং Square Textiles-এর মতো কোম্পানি ইতোমধ্যে এসব ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিদ্যুৎ খরচ ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়েছে। এটি শুধু বিদ্যুৎ সাশ্রয় নয়, বরং আধুনিক ব্যবস্থাপনারও অংশ।

নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ

বিশ্বব্যাপী যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন ও জ্বালানি সংকট আলোচনার কেন্দ্রে, সেখানে নবায়নযোগ্য শক্তি, বিশেষ করে সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারের দিকেও গুরুত্ব বাড়ছে। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের ছাদের ওপর সৌর প্যানেল বসিয়ে অফিস ও উৎপাদন ইউনিটের বিদ্যুৎ খরচ কমিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, Envoy Textiles প্রতি বছর তাদের সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহার করে প্রায় ২৫ লাখ টাকা সাশ্রয় করছে। Walton ও Unilever-এর মতো প্রতিষ্ঠানও ধাপে ধাপে গ্রিড-ভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারে ঝুঁকছে। এই প্রবণতা কেবল খরচ কমাচ্ছে না, ESG রিপোর্টিং এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশবান্ধব প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি অর্জনেও সহায়ক হচ্ছে।

যন্ত্রপাতি ব্যবহারে সচেতন রূপান্তর

বিদ্যুৎ খরচ কমানোর আরেকটি বড় দিক হচ্ছে যন্ত্রপাতির মান এবং কার্যকারিতা। পুরনো ও বিদ্যুৎ অপচয়কারী যন্ত্রপাতির পরিবর্তে শক্তি-সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহার এখন অনেক কোম্পানির নিয়মিত চর্চা। উচ্চ রেটিংযুক্ত এসি, ব্রাশলেস ফ্যান, LED আলো কিংবা Smart UPS ব্যবহার করলে খরচের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে আসে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শুধুমাত্র LED আলোর ব্যবহারের মাধ্যমে কোনো কোম্পানি তাদের বিদ্যুৎ বিলের ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারে। তবে এটি কেবল প্রযুক্তি পরিবর্তনের মাধ্যমে নয়—ব্যবস্থাপনায় ব্যবধান আনলেই এটি কার্যকর হয়।

আরো পড়ুনঃ কোম্পানি বড় হলে কি শ্রমিকদের বেশি সুবিধা পাওয়া উচিত?

কর্মীদের অংশগ্রহণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি

প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির উন্নয়ন যত গুরুত্বপূর্ণ, কর্মীদের আচরণগত পরিবর্তনও ততটাই দরকারি। অনেক সময় দেখা যায়, আলো বা এসি বন্ধ না রেখে অফিস থেকে বের হয়ে যাওয়া, নির্ধারিত সময়ের বাইরে যন্ত্রপাতি চালু রাখা ইত্যাদি আচরণ বিদ্যুৎ খরচ বাড়িয়ে দেয়। কিছু কোম্পানি এখন কর্মীদের জন্য এনেছে ‘Energy Saving Challenge’, যেখানে মাসিক ভিত্তিতে কে কতটা বিদ্যুৎ সাশ্রয় করেছে তা ট্র্যাক করে পুরস্কৃত করা হয়। এতে যেমন সচেতনতা বাড়ে, তেমনি দলগতভাবে খরচ কমানোর সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। এটি শুধু পরিবেশবান্ধব নয়, বরং কর্মক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

উৎপাদন সময় ব্যবস্থাপনায় কৌশল প্রয়োগ

বিদ্যুৎ খরচ কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হলো সময় ভিত্তিক উৎপাদন পরিকল্পনা করা। পিক আওয়ারে (যখন জাতীয় বিদ্যুৎ চাহিদা সর্বোচ্চ) বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে খরচ বেশি হয়, আর অফ-পিক সময়ে বিদ্যুৎ খরচ তুলনামূলক কম। কিছু উৎপাদন-নির্ভর প্রতিষ্ঠান এখন রাতের শিফটে যন্ত্রচালনা বাড়িয়ে পিক আওয়ার এড়িয়ে যাচ্ছে। একইভাবে শিফট শিডিউল ভাগ করে উৎপাদনের গতি বজায় রেখে খরচও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে। এটি বিদ্যুৎ খরচ কমানোর পাশাপাশি উৎপাদনের গতি নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক।

ব্যবস্থাপনায় টেকসই রূপান্তর

বর্তমান যুগে বিদ্যুৎ খরচের ওপর মনোযোগ দেওয়া মানে শুধুমাত্র বিল কমানো নয়, বরং এটি একটি কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি টেকসই ব্যবসা গঠনের কৌশল। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন তাদের ERP সফটওয়্যারের মধ্যেই Energy Efficiency Indicator যুক্ত করছে, যাতে প্রতিদিনের খরচ ও অপচয়ের জায়গাগুলো বিশ্লেষণ করা যায়। এর ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তথ্যভিত্তিক এবং বাস্তবভিত্তিক, যা একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি সাশ্রয় ও টেকসইতা নিশ্চিত করে।

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কার্যকারিতা চ্যালেঞ্জসারণি

ফোকাস ক্ষেত্রকার্যকরতা বিশ্লেষণ
এনার্জি অডিটSREDA–এর সাথে নিবন্ধিত অডিটররা বিশ্লেষণ করেন সেইসব এলাকা যেখানে বিদ্যুৎ অপচয় বেশি, সহায়ক হয় অপচয় চিহ্নিতকরণ ও সাশ্রয় পরিকল্পনায়  (সূত্রঃ ORDNUR+2Wikipedia+2ORDNUR+2)
সবুজ সূর্যসৌর শক্তিEnvoy Textiles তাদের প্লাটিনাম LEED কারখানায় সৌর ও LED প্রযুক্তি ব্যবহার করে ৩০–৫০% বিদ্যুৎ সাশ্রয় করেছে
বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন নিয়ন্ত্রণঅপশনগুলোতে মোশন সেন্সর, প্রোগ্রামেবল থার্মোস্ট্যাট ইত্যাদি ব্যবহারে খরচে প্রায় ২০–২৫% সাশ্রয় সম্ভব
LED উচ্চকার্যক্ষমতা যন্ত্রপাতিLED আলো ও ৫-স্টার পয়েন্টার এসি–এ পরিবর্তন এলোমেলো অপচয় হ্রাসে সাহায্য করে
কর্মী সচেতনতাকর্মীদের মধ্যে একটি নিয়মিত সাশ্রয় প্রতিযোগিতা চালু হলে আচরণগত পরিবর্তন হয়
সময়ের ভিত্তিক উৎপাদনউৎপাদন শিফট ‘পিক আওয়ার’ এড়িয়ে পরিকল্পিত করলে খরচ ব্যাপকভাবে কমে
ERP–এনার্জি মনিটরিংবাস্তব-সময়ে খরচ বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তগুলো আরও কার্যকর হয়

আরো পড়ুনঃ বাংলাদেশে Corporate Innovation Labs কি আসলেই ব্যবসার ভবিষ্যত নাকি শুধুই PR এর জন্যে?

সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)

প্রশ্ন ১: এনার্জি অডিট কেন জরুরি?
উত্তর: এটি বিদ্যুৎ ব্যবহারের অপচয় সনাক্ত করে এবং সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়, যা থেকে সাশ্রয়-প্রবণ পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হয়। SREDA-র নিবন্ধিত অডিটররা আইনি ভিত্তিতে এটি সম্পাদন করেন ।

প্রশ্ন ২: সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার বিদ্যুৎ খরচে কতটা সাহায্য করে?
উত্তর: Envoy Textiles–এর মতো প্রতিষ্ঠান তাদের LEED প্লাটিনাম কারখানায় LED ও সৌর প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রায় ৩০–৫০% বিদ্যুৎ সাশ্রয় করেছে ।

প্রশ্ন ৩: কর্মী সচেতনতা কিভাবে সাহায্য করে?
উত্তর: Behavioural change initiatives, যেমন কর্মচারীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা আয়োজন, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে আগ্রহ জাগিয়ে তোলে এবং অব্যবহৃত আলো–এসি বন্ধ রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করে।

প্রশ্ন ৪: LED পরিবর্তন প্রকৃতপক্ষে কতটা কার্যকর?
উত্তর: LED ব্যবহার উদাহরণস্বরূপ একটি রিটেইল চেইনে ১৫–২০% খরচ কমিয়েছে, কারণ LED–এর বিদ্যুৎ অপচয় কম এবং আয়ুষ্কাল দীর্ঘ।

প্রশ্ন ৫: ERP–এ অনলাইন মনিটরিং কেন প্রয়োজন?
উত্তর: এটি রিয়েল-টাইমে বিদ্যুৎ ব্যবহার ট্র্যাক করে যাতে দ্রুত অপচয় নির্ণয় ও সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

তথ্যসূত্র 

More articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest article

“আমাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়নি, পারিবারিক কাজে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে ছুটি নিয়েছি”—দাবি ওমর ফারুক খাঁনের

ঢাকা, ১২ এপ্রিল ২০২৬: ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওমর ফারুক খাঁনকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠিয়েছে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ—এমন তথ্য উঠে এসেছে...

ছেঁড়া ও অযোগ্য নোট নিয়ে গ্রাহক হয়রানি বন্ধে কঠোর অবস্থানে বাংলাদেশ ব্যাংক

ঢাকা, ১২ এপ্রিল ২০২৬: দেশের সকল তফসিলি ব্যাংককে ছেঁড়া, ক্ষতিগ্রস্ত ও ময়লা নোট গ্রহণ এবং বিনিময়ে নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।...

EDF তহবিল ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা: ব্যবসায়ীদের আশ্বাস বাংলাদেশ ব্যাংকের

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ব্যবসায়ী নেতাদের আশ্বস্ত করেছেন যে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (Export Development Fund - EDF) ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ৫ বিলিয়ন ডলারে...

দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা এক মঞ্চে—৮ম বাংলাদেশ রিটেইল কংগ্রেস

লেখক: নিশি আক্তারঢাকা, ৫ এপ্রিল ২০২৬ । দেশের খুচরা (রিটেইল) খাতকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে আগামী ১৮ এপ্রিল ২০২৬...