spot_imgspot_imgspot_imgspot_img

রেমিট্যান্স অর্থনীতিতে কীভাবে ভূমিকা রাখে?

লেখকঃ মালিহা মেহেজাবিন

বর্তমান বিশ্বে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বড় অবদান রাখছে। 

প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রবাসীরা তাদের উপার্জনের একটি বড় অংশ দেশে পাঠান, যা “রেমিট্যান্স” নামে পরিচিত। বাংলাদেশে এই রেমিট্যান্স এখন শুধু পারিবারিক সহায়তা নয়; বরং এটি জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।

রেমিট্যান্স কী?

রেমিট্যান্স বলতে বিদেশে কর্মরত কোনো ব্যক্তি তার উপার্জিত অর্থ নিজ দেশে পরিবার বা আত্মীয়স্বজনের কাছে পাঠানোকে বোঝায়। সাধারণত ব্যাংক, মোবাইল ব্যাংকিং বা আন্তর্জাতিক মানি ট্রান্সফার সেবার মাধ্যমে এই অর্থ পাঠানো হয়। বাংলাদেশের লাখ লাখ প্রবাসী মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কাজ করে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠাচ্ছেন।

নিচের টেবিলে বাংলাদেশের প্রধান রেমিট্যান্স উৎস দেশগুলো দেখানো হলো:

দেশপ্রধান কর্মক্ষেত্র রেমিট্যান্স প্রবাহের গুরুত্ব 
সৌদি আরব নির্মাণ, সেবা সর্বোচ্চ উৎসগুলোর একটি 
সংযুক্ত আরব আমিরাত ব্যবসা, শ্রম উচ্চ বৈদেশিক আয় 
মালয়েশিয়া শিল্প ও কারখানা মধ্যম আয়ের উৎস 
যুক্তরাষ্ট্র পেশাজীবী ও ব্যবসা উচ্চমূল্যের রেমিট্যান্স 
যুক্তরাজ্য ব্যবসা ও চাকরি দীর্ঘমেয়াদি অবদান 

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের ভূমিকা

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে। এটি শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনই করে না; বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে গতিশীল করে তোলে।

১. বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি

রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ যেহেতু খাদ্য, জ্বালানি, শিল্প কাঁচামালসহ বিভিন্ন পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করে, তাই ডলারের স্থিতিশীল সরবরাহ অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দেশে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আসে, যা আমদানি ব্যয় মেটাতে সহায়তা করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে ২৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় সহায়তা হিসেবে কাজ করেছে।

২. দারিদ্র্য হ্রাস ও জীবনমান উন্নয়ন

রেমিট্যান্স সরাসরি লাখো পরিবারের জীবনমান উন্নত করছে। বিদেশে কর্মরত পরিবারের সদস্যদের পাঠানো অর্থ দিয়ে অনেক পরিবার শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বাসস্থান এবং দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করতে পারছে।

গ্রামীণ অঞ্চলে রেমিট্যান্সের প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। অনেক পরিবার এই অর্থ ব্যবহার করে নতুন ব্যবসা শুরু করছে, কৃষিতে বিনিয়োগ করছে অথবা সন্তানদের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করছে। ফলে দারিদ্র্য কমছে এবং সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হচ্ছে।

৩. কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি

রেমিট্যান্স শুধু ভোগ ব্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি অনেক সময় বিনিয়োগের উৎস হিসেবেও কাজ করে। অনেক প্রবাসী দেশে ফিরে ছোট ব্যবসা, দোকান, পরিবহন বা কৃষিভিত্তিক উদ্যোগে বিনিয়োগ করেন।

নিচের টেবিলে রেমিট্যান্সের অর্থ সাধারণত কোন খাতে ব্যবহৃত হয় তা দেখানো হলো: 

খাতব্যবহারের ধরন 
শিক্ষা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ 
স্বাস্থ্য চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা 
আবাসন বাড়ি নির্মাণ ও সংস্কার 
ব্যবসা ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগ 
কৃষি জমি, যন্ত্রপাতি ও উৎপাদন 

এই ধরনের ব্যয় স্থানীয় অর্থনীতিকে সক্রিয় রাখে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। 

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় রেমিট্যান্সের গুরুত্ব

বিশ্ব অর্থনীতিতে সংকট দেখা দিলে রেমিট্যান্স অনেক সময় অর্থনীতির জন্য “সেফটি নেট” হিসেবে কাজ করে। রপ্তানি আয় বা বৈদেশিক বিনিয়োগ কমে গেলেও প্রবাসীরা সাধারণত পরিবারের জন্য অর্থ পাঠানো চালিয়ে যান। ফলে দেশের অর্থনীতিতে অর্থ প্রবাহ বজায় থাকে।

বিশেষ করে COVID-19 মহামারির সময় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স বড় ভূমিকা পালন করে। যখন অনেক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তখন প্রবাসী আয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে সাহায্য করে।

রেমিট্যান্স খাতের চ্যালেঞ্জ

রেমিট্যান্স অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এই খাতে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অবৈধ হুন্ডি ব্যবস্থার কারণে সরকার অনেক সময় প্রকৃত বৈদেশিক মুদ্রা থেকে বঞ্চিত হয়। এছাড়া বিদেশে শ্রমিকদের দক্ষতার অভাব, কম মজুরি এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তাও একটি বড় সমস্যা।

অনেক প্রবাসী শ্রমিক উচ্চ খরচে বিদেশে যান, কিন্তু প্রত্যাশিত আয় করতে পারেন না। ফলে তাদের আর্থিক চাপ বৃদ্ধি পায়। তাই দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষ শ্রমশক্তি বৃদ্ধি এবং নতুন আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে পারলে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয় ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা এবং দক্ষ কারিগরি খাতে কর্মী পাঠানোর মাধ্যমে উচ্চ আয়ের সুযোগ তৈরি হবে।

সরকার যদি বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানো সহজ করে এবং প্রবাসী কর্মীদের জন্য আরও প্রশিক্ষণ ও সহায়তা নিশ্চিত করে, তাহলে রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে আরও শক্তিশালী অবদান রাখতে পারবে।

রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যদিও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবুও সঠিক পরিকল্পনা ও দক্ষ জনশক্তি তৈরির মাধ্যমে এই খাত দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরও বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে। 

প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন ১: রেমিট্যান্স কী?
বিদেশে কর্মরত ব্যক্তিরা তাদের উপার্জনের অর্থ দেশে পাঠালে তাকে রেমিট্যান্স বলা হয়।

প্রশ্ন ২: বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রেমিট্যান্স উৎস কোন দেশ?
সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম বড় রেমিট্যান্স উৎস দেশ।

প্রশ্ন ৩: রেমিট্যান্স কীভাবে দারিদ্র্য কমায়?
এটি পরিবারের আয় বাড়ায় এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ব্যবসায় বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে।

প্রশ্ন ৪: রেমিট্যান্সের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
হুন্ডি, দক্ষতার অভাব এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তাজনিত সমস্যা।

তথ্যসূত্র

More articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest article

বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি: স্মার্ট ইকোনমি গঠনের পথে একটি কৌশলগত রূপান্তর

লিখেছেনঃ মীম আক্তার বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। “ডিজিটাল বাংলাদেশ” রূপকল্পের সফল বাস্তবায়নের পর দেশটি এখন “স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১” লক্ষ্যকে...

৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যাংক আমানতে শুল্কমুক্ত সীমা বাড়ানোর পরিকল্পনা

লিখেছেনঃ বাহারিন আক্তার অন্তরা ১৪ মে ২০২৬, ঢাকা — সাধারণ ও ক্ষুদ্র আমানতকারীদের আর্থিক চাপ কমাতে আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্কের...

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠক কেন বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?

লেখকঃ মুসাররাত খান বিশ্ব অর্থনীতি এখন এক ধরনের “nervous equilibrium”-এ দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে প্রবৃদ্ধির আশা, অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি। এই টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন।...

ঘরে বসেই ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন আপনিও, নতুন ‘ই-লোন’ চালু করলো বাংলাদেশ ব্যাংক

দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় পরিবর্তন আনতে নতুন ডিজিটাল ঋণসেবা চালু করেছে Bangladesh Bank। এখন থেকে ঘরে বসেই মোবাইল অ্যাপ, ইন্টারনেট ব্যাংকিং কিংবা ই-ওয়ালেট ব্যবহার...