spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img

ইংরেজি শেখার মোবাইল অ্যাপ বাংলাদেশে কতটা কাজ করছে?

লেখা: কাজী গণিউর রহমান

বিশ্বায়নের এই যুগে ইংরেজি ভাষার দক্ষতা শুধু একটি যোগাযোগ মাধ্যম নয়—এটি চাকরি, উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। অথচ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইংরেজি শিক্ষা এখনো অনেক শিক্ষার্থী ও চাকরি প্রত্যাশীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ইংরেজি শেখার প্রচলিত পদ্ধতিগুলোর সীমাবদ্ধতা, শিক্ষকের অভাব ও অনুশীলনের সুযোগের ঘাটতি—সব মিলিয়ে এই ঘাটতি পূরণের এক সম্ভাব্য সমাধান হয়ে উঠেছে মোবাইল অ্যাপ ভিত্তিক ইংরেজি শিক্ষা।

স্মার্টফোনের প্রসার ও ইন্টারনেট অ্যাক্সেস সহজলভ্য হওয়ার ফলে এখন ঘরে বসেই হাজার হাজার শিক্ষার্থী ইংরেজি শেখার জন্য মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করছেন। তবে প্রশ্ন হলো—এই অ্যাপগুলো আসলে কতটা কার্যকর? সেগুলো কি সত্যিই শেখার মান বাড়াতে সাহায্য করছে, নাকি শুধুই একটি ট্রেন্ড?

বাংলাদেশে ইংরেজি দক্ষতার বর্তমান চিত্র

EF English Proficiency Index (EPI) 2023 অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের ১১৬টি দেশের মধ্যে ৬১তম অবস্থানে রয়েছে, যেখানে স্কোর ছিল 504। এক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের চেয়েও আমাদের অবস্থান পিছিয়ে। শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজি বিষয় বাধ্যতামূলক থাকলেও অধিকাংশ শিক্ষার্থী মৌলিক পর্যায়েও দক্ষ হতে পারে না।

বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইংরেজি বিষয়ে আত্মবিশ্বাসের অভাব প্রকট। শহরের চেয়ে গ্রামে ভালো শিক্ষক পাওয়া কঠিন, অনুশীলনের পরিবেশ নেই, এবং শিক্ষার্থীরা ইংরেজিকে ভয় পায়। ফলে বিকল্প উপায় হিসেবে স্মার্টফোন অ্যাপের দিকে ঝুঁকছে অনেকেই।

আরো পড়ুন- AI ব্যবহার করে রিসার্চ শেখা: মিড-লার্নারদের জন্য প্র্যাকটিক্যাল টিপস

ইংরেজি শেখার জনপ্রিয় অ্যাপগুলো ও কার্যকারিতা

বাংলাদেশে বর্তমানে যে ইংরেজি শেখার অ্যাপগুলো ব্যাপক ব্যবহৃত হচ্ছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হলো:

  • BBC Janala: এটি গ্রামীণফোন ও বিটিআরসি সহযোগিতায় চালু হওয়া একটি অডিওভিত্তিক লার্নিং প্ল্যাটফর্ম। সহজ বাংলা ব্যাখ্যার মাধ্যমে ইংরেজি শেখার জন্য এই অ্যাপটি দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়।
  • Duolingo: গেমের মতো ধাপে ধাপে শেখার পদ্ধতি থাকায় তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা বেশি। ব্যবহারকারীরা দৈনন্দিন ভিত্তিতে নতুন শব্দ, বাক্য গঠন এবং শোনার অনুশীলন করতে পারে।
  • Hello English: কনভারসেশন-ভিত্তিক শেখানোর ওপর গুরুত্ব দেয় এবং একাধিক দক্ষতা একত্রে উন্নত করার সুযোগ দেয়।
  • 10 Minute School: দেশীয়ভাবে তৈরি হওয়া এই অ্যাপে রয়েছে ব্যাকরণ, উচ্চারণ, কুইজ ও ভিডিও লেসনের সমন্বয়। এটি বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর।

ঢাকা ও চট্টগ্রামের তরুণদের মধ্যে একটি সাম্প্রতিক ResearchGate জরিপে দেখা গেছে, 70% তরুণ নিয়মিতভাবে ইংরেজি শেখার অ্যাপ ব্যবহার করেন। এমনকি ১০ মিনিট স্কুলের ভাষ্যমতে, তাদের অ্যাপের ইংরেজি ভিডিও কনটেন্ট প্রতি মাসে প্রায় ১.২ মিলিয়ন+ ভিউ পায়। (সূত্রঃ ResearchGate: Use of Mobile Applications for Learning Academic English১০ মিনিট স্কুল ইউটিউব চ্যানেল স্ট্যাটাস)

অ্যাপভিত্তিক শেখার উপকারিতা

অনলাইনে ইংরেজি শেখার অ্যাপগুলো ব্যবহার করে বহু শিক্ষার্থী এখন নিজস্ব গতিতে শেখার সুযোগ পাচ্ছে এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ধাপে ধাপে ভাষাগত দক্ষতা অর্জন করছে। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে তারা স্পীকিং, রিডিং, কুইজ ইত্যাদি একযোগে অনুশীলন করতে পারছেন যা প্রথাগত ক্লাসরুমে সহজ নয়। এছাড়া, অনেকেই অনলাইন গ্রুপ বা প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময় করছেন, যেখানে তারা নিজেদের শেখার অগ্রগতি শেয়ার ও মূল্যায়ন করতে পারে।

সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ

তবে মোবাইল অ্যাপগুলোতে শেখার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। প্রথমত, অনেক ব্যবহারকারী রেগুলার নয়—অ্যাপে রেজিস্ট্রেশন করেও নিয়মিত অনুশীলন করেন না। দ্বিতীয়ত, বেশিরভাগ অ্যাপেই শিক্ষকের রিয়েল‑টাইম ফিডব্যাক না থাকায় শিক্ষার্থীরা ভুল সংশোধন না পেয়ে ঘুরে ফিরে শেখে। তাছাড়া, জাতীয়ভাবে ওয়াই‑ফাই বা মোবাইল ডেটা শক্ত না থাকা, বিশেষ করে গ্রামে, শেখার ধারাবাহিকতা তড়িৎ গতি হারাতে পারে। তাছাড়া, অনেক বিদেশি কনটেন্ট স্থানীয় প্রেক্ষাপটে সহজবোধ্য নয়—যা শেখার মানকে প্রভাবিত করতে পারে।

কোন শ্রেণিতে এর ব্যবহার বেশি?

তরুণ শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্রছাত্রী এবং ফ্রিল্যান্সাররা এই অ্যাপগুলোর প্রধান ব্যবহারকারী। যারা IELTS, GRE বা চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তারাও Duolingo বা Hello English-এর মতো অ্যাপ বেছে নিচ্ছেন প্রস্তুতির জন্য। তবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী কনটেন্টের অভাব এখনও লক্ষ্য করা যায়।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মোবাইল অ্যাপের সংযুক্তি কতটা হচ্ছে?

কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, যেমন NSU, BRAC University ইত্যাদি বিভিন্ন কোর্সে Duolingo Practice বা Quizlet Tool ব্যবহার করছে ভাষা শিক্ষায় সহায়ক হিসেবে। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে বা সরকারিভাবে এখনও অ্যাপভিত্তিক শেখাকে পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। A2i এবং ICT Division কিছু উদ্যোগ নিলেও তা এখনও সীমিত আকারেই রয়েছে।

চূড়ান্ত বিশ্লেষণ

ইংরেজি শেখার মোবাইল অ্যাপ এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজনীয় একটি বিকল্প পদ্ধতি হয়ে উঠছে—বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য। প্রযুক্তির প্রসার, স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা এবং ভাষাগত সক্ষমতার প্রয়োজন—সব মিলিয়ে এই অ্যাপগুলোর ব্যবহার প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তবে এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব নির্ভর করছে শেখার অভ্যাস, কনটেন্টের মান, এবং প্ল্যাটফর্মগুলোর নির্ভরযোগ্যতার ওপর।

তাই সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অ্যাপ নির্মাতাদের সমন্বয়ে একটি গাইডলাইন বা নীতিমালা তৈরি করে অ্যাপভিত্তিক ভাষা শিক্ষাকে আরও কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হবে। সঠিক দিকনির্দেশনা ও পরিবেশ পেলে, মোবাইল অ্যাপ হয়ে উঠতে পারে ইংরেজি শিক্ষার সবচেয়ে গণমুখী ও টেকসই মাধ্যম।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)

প্রশ্ন ১: মোবাইল অ্যাপে ইংরেজি শেখা কি কার্যকর?
উত্তর: হ্যাঁ, অনেক শিক্ষার্থী স্বনিয়ন্ত্রিতভাবে ভাষা দক্ষতা বাড়াতে এই অ্যাপগুলো ব্যবহার করে সফল হয়েছে। বিশেষত Duolingo, BBC Janala বা 10 Minute School-এর মতো অ্যাপগুলো ব্যবহারকারীদের প্রতিদিন চর্চার অভ্যাস তৈরি করে।

প্রশ্ন ২: বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে কোন অ্যাপগুলো বেশি জনপ্রিয়?
উত্তর: BBC Janala, Duolingo, Hello English, এবং দেশীয় 10 Minute School এই মুহূর্তে সবচেয়ে জনপ্রিয়। এগুলো ব্যাকরণ, কথোপকথন, উচ্চারণসহ সবদিকেই সহায়ক।

প্রশ্ন ৩: এসব অ্যাপে কী ধরনের সমস্যা হয়?
উত্তর: নিয়মিত ব্যবহার না করা, ফিডব্যাক না পাওয়া, ইংরেজির স্থানীয় প্রেক্ষাপটে মানানসই কনটেন্টের অভাব ও ইন্টারনেট সংযোগ দুর্বলতা কিছু বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রশ্ন ৪: গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা কি এসব অ্যাপ ব্যবহার করতে পারে?
উত্তর: সীমিত হারে হলেও গ্রামাঞ্চলে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়ার সাথে সাথে অ্যাপ-ভিত্তিক শিক্ষা ছড়িয়ে পড়ছে। তবে অফলাইন অ্যাপ এবং বাংলা ভাষায় গাইডলাইন আরও প্রয়োজন।

প্রশ্ন ৫: সরকার কি অ্যাপ-ভিত্তিক ইংরেজি শিক্ষাকে উৎসাহ দিচ্ছে?
উত্তর: A2i এবং ICT Division কিছু সরকারি স্কুলে ডিজিটাল ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাব চালু করেছে। যদিও ব্যাপকভাবে মোবাইল অ্যাপ ব্যবহারকে জাতীয় পাঠ্যক্রমে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

তথ্যসূত্র 

More articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest article

প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে এগিয়ে ৬৪ প্রতিষ্ঠান, রিটেইল অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬ সম্পন্ন

ডেস্ক রিপোর্ট | দ্য ডেইলি কর্পোরেট দেশের খুচরা বাণিজ্যে উদ্ভাবন, প্রযুক্তি সংযোজন ও গ্রাহকসেবায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ রিটেইল অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬-এর তৃতীয় আসরে ৬৪টি উদ্যোগ ও...

এক মাসে এলপিজি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে তিন দফা মূল্যবৃদ্ধি, বাড়ছে জনভোগান্তি

ডেস্ক রিপোর্ট | দ্য ডেইলি কর্পোরেট এক মাসের ব্যবধানে এলপিজি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি—নিত্যপ্রয়োজনীয় তিন খাতে দাম বাড়িয়ে নতুন করে জনভোগান্তির আশঙ্কা তৈরি করেছে সরকার। চলতি...

জ্বালানির দামে আগুন, এক লাফে বাড়ল ডিজেল-অকটেন-পেট্রোল

ঢাকা, ১৯ এপ্রিল: আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ঊর্ধ্বগতির প্রেক্ষাপটে দেশে ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। নতুন দাম আজ রোববার (১৯ এপ্রিল) থেকে...

“আমাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়নি, পারিবারিক কাজে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে ছুটি নিয়েছি”—দাবি ওমর ফারুক খাঁনের

ঢাকা, ১২ এপ্রিল ২০২৬: ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওমর ফারুক খাঁনকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠিয়েছে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ—এমন তথ্য উঠে এসেছে...