spot_imgspot_imgspot_imgspot_img

ঋণ জালিয়াতি রোধে জামানত নিরীক্ষায় যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক

ডেস্ক রিপোর্টার- কাজী গণিউর রহমান 

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণ জালিয়াতি ও খেলাপি ঋণের সমস্যা নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ব্যাংকে জামানতের (ঋণের বিপরীতে দেওয়া সম্পদ) অতিমূল্যায়ন, ভুয়া কাগজপত্র এবং দুর্বল তদারকির কারণে বিপুল অঙ্কের অর্থ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক সারাদেশে ব্যাংকগুলোর ঋণের বিপরীতে রাখা জামানত পুনরায় যাচাই বা নিরীক্ষার পরিকল্পনা নিয়েছে। এই উদ্যোগকে ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ব্যাংক ঋণ দেওয়ার সময় গ্রাহকের কাছ থেকে জমি, ভবন, শিল্পকারখানা বা অন্যান্য সম্পদ জামানত হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে এসব সম্পদের মূল্য কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। ফলে ব্যাংক প্রকৃত মূল্যের তুলনায় অনেক বেশি ঋণ অনুমোদন করেছে। পরবর্তীতে ঋণ খেলাপি হলে ব্যাংক সেই জামানত বিক্রি করে পুরো অর্থ উদ্ধার করতে পারেনি। এতে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বেড়েছে এবং আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, এই অনিয়ম রোধে জামানতের প্রকৃত মূল্য যাচাই এবং নথিপত্র পরীক্ষা করা এখন অত্যন্ত প্রয়োজন। নিরীক্ষার মাধ্যমে জানা যাবে—

  • কোন ব্যাংকে কতটা অতিমূল্যায়ন হয়েছে,
  • কোথায় নথি জালিয়াতির সম্ভাবনা রয়েছে,
  • এবং কোন ঋণগুলো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে।

অর্থাৎ, এই নিরীক্ষা কেবল অতীতের অনিয়ম শনাক্ত করার জন্য নয়; ভবিষ্যতে ঝুঁকি কমানোর কৌশল নির্ধারণের অংশ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ ব্যাংক কেন্দ্রীয়ভাবে একটি কাঠামো তৈরি করছে, যার আওতায় ব্যাংকগুলোর বড় অঙ্কের ঋণ আগে যাচাই করা হবে। বিশেষ করে যেসব ঋণ ইতোমধ্যে খেলাপি হয়েছে বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত, সেগুলোর জামানত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরীক্ষা করা হবে।

এই প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্যভাবে যা করা হবে:

প্রথমত, স্বাধীন মূল্য নির্ধারক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য পুনরায় নির্ধারণ।
দ্বিতীয়ত, জমি বা সম্পত্তির মালিকানা সংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই।
তৃতীয়ত, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম ছিল কি না তা পরীক্ষা।

যদি কোনো ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত অতিমূল্যায়ন বা জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও গ্রাহকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

এই উদ্যোগের সরাসরি প্রভাব পড়বে ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায়। ভবিষ্যতে ব্যাংকগুলো জামানত গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হবে। মূল্য নির্ধারণে কড়াকড়ি বাড়বে এবং নথি যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর হবে। এতে ঋণ বিতরণ কিছুটা ধীর হতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা বাড়বে।

একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্রও পরিষ্কার হবে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকের হিসাবপত্রে যে ঋণ এখনো আদায়যোগ্য হিসেবে দেখানো হচ্ছে, নিরীক্ষার পর সেটি ঝুঁকিপূর্ণ বা অগ্রহণযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। এতে ব্যাংকের আর্থিক বিবরণীতে সাময়িক চাপ তৈরি হলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি স্বচ্ছতা বাড়াবে।

বাংলাদেশে অতীতে বেশ কয়েকটি বড় ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে, যেখানে জামানতের মূল্য ছিল মূল সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু। নিরীক্ষা কার্যক্রম সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে তিনটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে:

এক. ভবিষ্যতে ভুয়া বা অতিমূল্যায়িত জামানতের মাধ্যমে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া কঠিন হবে।
দুই. ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে।
তিন. বাজারে একটি বার্তা যাবে যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন কঠোর অবস্থানে আছে।

তবে এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের চাপমুক্ত থাকার ওপর।

এই সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীদের জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত। কারণ ব্যাংকের সম্পদমান সঠিকভাবে যাচাই করা হলে আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা বাড়বে। আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থা ও উন্নয়ন অংশীদাররাও সাধারণত এমন কাঠামোগত সংস্কারকে ইতিবাচকভাবে দেখে। ফলে ভবিষ্যতে বৈদেশিক সহায়তা ও বিনিয়োগ আকর্ষণেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

একই সঙ্গে সৎ ব্যবসায়ীদের জন্য এটি একটি স্বস্তির বিষয়। কারণ বাজারে অসৎ উপায়ে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমলে প্রতিযোগিতার পরিবেশ আরও ন্যায্য হবে।

যদিও উদ্যোগটি প্রশংসনীয়, তবু বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সম্পদের সঠিক বাজারমূল্য নির্ধারণ সবসময় সহজ নয়। ভূমি সংক্রান্ত তথ্যভান্ডার এখনো পুরোপুরি আধুনিকায়িত হয়নি। এছাড়া বড় ঋণগ্রহীতাদের প্রভাব ও আইনি জটিলতাও প্রক্রিয়াকে ধীর করতে পারে।

তাই নিরীক্ষা কার্যক্রমকে সফল করতে হলে প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর তথ্যব্যবস্থা, দক্ষ মূল্য নির্ধারক এবং শক্তিশালী আইনি সহায়তা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের জামানত নিরীক্ষা উদ্যোগ ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি কেবল অতীতের জালিয়াতি উন্মোচনের জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমানোর কৌশল হিসেবেও বিবেচ্য। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা বাড়বে এবং অর্থনীতির সামগ্রিক আস্থা শক্তিশালী হবে।

অতএব, এই উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি—কারণ শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়।

তথ্যসূত্র 

Bangladesh Bank plans collateral audits for fraud crackdown — The Daily Star

https://www.thedailystar.net/business/news/bangladesh-bank-plans-collateral-audits-fraud-crackdown-4102036

More articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest article

কারখানা পুনরায় চালু ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা

ঢাকা, ২৪ মে ২০২৬ — দ্য ডেইলি কর্পোরেট ডেস্ক দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু, রপ্তানি কার্যক্রমে গতি আনা এবং বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য...

আইএফআইসি ব্যাংক ও ল্যাবএইড গ্রুপের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর

ঢাকা, ২০ মে ২০২৬ — দ্য ডেইলি কর্পোরেট ডেস্ক গ্রাহক ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা নিশ্চিত করতে আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসি এবং দেশের অন্যতম...

ব্যস্ত না, কার্যকর হোন, উদ্যোক্তাদের সময় ব্যবস্থাপনা

লিখেছেনঃ মালিহা মেহেজাবিন বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক বিশ্বে একজন উদ্যোক্তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ শুধু মূলধন, মানবসম্পদ বা প্রযুক্তি নয়; বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো সময়। অর্থ...

ব্যবসায় ব্যর্থতার প্রধান কারণগুলো কী?

লেখকঃ আরেফিন রানা পিয়াস বর্তমান সময়ে ব্যবসা ও উদ্যোক্তা কার্যক্রম বিশ্ব অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন অনেক মানুষ নতুন ব্যবসা শুরু করলেও বাস্তবে...