spot_imgspot_imgspot_imgspot_img

গ্রাম থেকে শহরে পণ্য বিক্রি—কৃষকদের জন্য শুরু হলো স্মার্ট সাপ্লাই চেইন

লেখা: কাজী গণিউর রহমান

বাংলাদেশের অর্থনীতি আজও কৃষিনির্ভর। দেশের ৪০% এরও বেশি জনগণ কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত, যারা গ্রামাঞ্চলে থেকে শাকসবজি, ফলমূল, দুধ, মাছসহ নানা খাদ্যপণ্য উৎপাদন করেন। এসব পণ্যের বড় একটি অংশ শহরমুখী, কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—এই পণ্যগুলো কি সরাসরি কৃষকের হাত থেকে শহরের ভোক্তার কাছে পৌঁছাচ্ছে, নাকি একাধিক মধ্যস্বত্বভোগীর হাত ঘুরে যাচ্ছে? দীর্ঘদিন ধরে শহরের বাজার ব্যবস্থার একচেটিয়া দখলদারিত্ব এবং অনুন্নত সরবরাহ চেইনের কারণে কৃষক যেমন ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত, তেমনি শহরের ক্রেতাও পণ্যের বাড়তি দাম দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা উদ্যোগ এবং সরকারি হস্তক্ষেপ মিলিয়ে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। আজকের আলোচনার বিষয়—এই পরিবর্তন বাস্তবেই কতটা কার্যকর হচ্ছে, এবং গ্রামীণ কৃষকের জন্য কী ধরনের বাস্তব সুফল তৈরি করছে।

প্রচলিত বাজার ব্যবস্থা ও কৃষকের অসুবিধা

বাংলাদেশের কৃষি বিপণন ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে মধ্যস্বত্বভোগীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। একজন কৃষক যদি ১০০ টাকা মূল্যের পণ্য বিক্রি করেন, তার মধ্যে প্রায় ৪০ টাকারও কম তিনি হাতে পান। বাকি অংশ চলে যায় পরিবহনকারী, আড়তদার, পাইকার, খুচরা বিক্রেতা ও অন্যান্য মধ্যস্থ কারবারিদের হাতে। একদিকে কৃষকের লাভ সীমিত, অন্যদিকে ভোক্তাকেও দিতে হয় দ্বিগুণ মূল্য।

Center for Development Innovation-এর ২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের একটি সাধারণ কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ৩৫-৪০% এর বেশি মূল্য পান না। ফলে কৃষকের আয় বৃদ্ধি না পেয়ে বরং দিনে দিনে আয়ের অংশ কমে যাচ্ছে।

প্রযুক্তিনির্ভর বাজার সংযোগের উত্থান

তথ্যপ্রযুক্তি এবং ই-কমার্সের বিকাশ এই বাজার কাঠামোতে পরিবর্তন আনার সূচনা করেছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে শহরের ভোক্তাদের আগ্রহ বাড়ে সরাসরি কৃষকের পণ্য কেনার প্রতি। এই প্রবণতা টের পেয়ে একাধিক নতুন উদ্যোক্তা এবং কিছু সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে, যেখানে গ্রামীণ কৃষক সরাসরি শহরের ভোক্তার সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ:

  • iFarmer: কৃষকের পণ্য সাপ্লাইচেইন ও বিনিয়োগ সুবিধা
  • Khaas Food: নিরাপদ ও অর্গানিক খাবারের সরবরাহ
  • ShudhuiKhamar: গ্রামীণ কৃষকের তৈরি প্রাকৃতিক পণ্যের অনলাইন বাজার
  • Krishi Market App: কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের উদ্যোগে কৃষক-ক্রেতা সংযোগকারী অ্যাপ

এই প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে কৃষকের পণ্য বাজারজাত সহজ হচ্ছে, সঠিক দামে বিক্রি হচ্ছে এবং পণ্যের গুণমান সংরক্ষণের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

শহর-কৃষক সংযোগে সরকারের পদক্ষেপ

সরকার সম্প্রতি কৃষি খাতকে আধুনিকীকরণ ও বিপণন ব্যবস্থাকে সরলীকরণে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে “ব্লকচেইন-ভিত্তিক কৃষি সরবরাহ চেইন” প্রকল্পের পাইলট শুরু হয়েছে a2i-এর পরিচালনায়।

এছাড়া কৃষি বিপণন অধিদপ্তর প্রতিটি উপজেলায় কৃষিপণ্য সংগ্রহ ও বিপণন কেন্দ্র স্থাপনের জন্য অবকাঠামোগত পরিকল্পনা নিয়েছে, যার জন্য DAE-এর Annual Development Programme বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া হিমাগার ও কোল্ড স্টোরেজ সুবিধা সম্প্রসারণে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন-এর সঙ্গে যৌথ প্রকল্পে কাজ করছে।

এই উদ্যোগগুলো সরাসরি শহর ও গ্রামীণ পণ্যের মধ্যকার সেতুবন্ধন তৈরি করছে এবং কৃষকের হাতে ন্যায্য মূল্য পৌঁছানোর পথ তৈরি করছে।

বাস্তব উদাহরণ: একটি কৃষকের অভিজ্ঞতা

নওগাঁর কৃষক রবিউল ইসলাম আগে প্রতিদিন পণ্য নিয়ে শহরের আড়তে যেতেন। আড়তদার প্রতি কেজি টমেটোর জন্য ৬ টাকা দিতেন যেখানে বাজারমূল্য ছিল ১২ টাকা। iFarmer-এর সহযোগিতায় তিনি সরাসরি ঢাকার এক রেস্টুরেন্ট চেইনের সঙ্গে যুক্ত হন। এখন তিনি প্রতি কেজি টমেটো ১০ টাকায় বিক্রি করছেন, পরিবহন খরচ বাদেও আগের চেয়ে দ্বিগুণ লাভ করছেন।

এই ধরণের সংযোগ শুধু কৃষকের আয়ই বাড়াচ্ছে না, বরং ভোক্তাদের কাছেও নির্ভরযোগ্য উৎসের নিরাপদ খাবার পৌঁছে দিচ্ছে। (Source:  iFarmer ব্লগ: From Naogaon to Dhaka)

চ্যালেঞ্জ এবং সীমাবদ্ধতা

তবে এই অগ্রগতির মাঝেও কিছু বাস্তব সমস্যা এখনও রয়ে গেছে:

  • গ্রামে দ্রুতগতির ইন্টারনেটের অপ্রতুলতা
  • কৃষকের প্রযুক্তি ব্যবহারের জড়তা ও অজ্ঞতা
  • লজিস্টিক সমস্যা ও সংরক্ষণ সুবিধার ঘাটতি
  • স্থানীয় পর্যায়ে দালাল ও অসাধু ব্যবসায়ীর প্রভাব
  • বাজার সংযোগের জন্য কৃষকের প্রশিক্ষণের অভাব

এ চ্যালেঞ্জগুলো সমাধানে সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ এবং স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে সমন্বিত পদক্ষেপ অপরিহার্য।

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ও দিকনির্দেশনা

ভবিষ্যতের কৃষি হবে প্রযুক্তিনির্ভর, বিকেন্দ্রীকৃত এবং কৃষকের জন্য স্বচ্ছ। তাই শহর ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যে কার্যকর কৃষিপণ্য বিনিময় নিশ্চিত করতে হলে প্রযুক্তি, নীতিমালা এবং অবকাঠামোগত সহায়তার সম্মিলিত প্রয়োগ প্রয়োজন। প্রতিটি উপজেলায় ডিজিটাল মার্কেটিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করে কৃষকদের অনলাইন বাজার ব্যবস্থাপনায় অভ্যস্ত করে তুলতে হবে।

আরো পড়ুন- জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) বিলুপ্ত: তৈরি হলো দুটি নতুন বিভাগ! বড় রদবদল করল বাংলাদেশ সরকার

একইসাথে, মোবাইলভিত্তিক দাম যাচাই অ্যাপস, স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় কৃষি পরিবহন সহায়তা কেন্দ্র, এবং রেফার কোল্ড ট্রাক সার্ভিস চালু করতে হবে। সরকার এবং বেসরকারি খাতের সম্মিলিত অংশীদারিত্ব ছাড়া এটি সম্ভব নয়। এই ধরণের উদ্যোগগুলো গ্রহণ করা গেলে শুধু কৃষকের নয়, গোটা অর্থনীতির ওপর এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সারাংশ 

  • কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের মূল্য বাড়াতে সরাসরি বাজার সংযোগ জরুরি।
  • প্রযুক্তিনির্ভর প্ল্যাটফর্ম (iFarmer, Khaas Food) কৃষককে শহরের সঙ্গে যুক্ত করছে।
  • সরকারের ব্লকচেইন প্রকল্প ও কোল্ড স্টোরেজ সম্প্রসারণ কার্যক্রম ইতিবাচক অগ্রগতি তৈরি করছে।
  • ভবিষ্যতে ডিজিটাল প্রশিক্ষণ ও সরবরাহ কাঠামোর উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন: কৃষক কীভাবে নিজের পণ্য সরাসরি শহরে বিক্রি করতে পারেন?

উত্তর: অনলাইন প্ল্যাটফর্ম যেমন iFarmer, Khaas Food বা ShudhuiKhamar-এর মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করা যায়। এছাড়াও কৃষি মার্কেট অ্যাপ ব্যবহার করে সরাসরি ক্রেতা খোঁজা যায়।

প্রশ্ন: শহর-কৃষক সংযোগে সরকারের প্রকল্পগুলো কী? 

উত্তর: ব্লকচেইনভিত্তিক সরবরাহ চেইন, হিমাগার সম্প্রসারণ, কৃষি বিপণন কেন্দ্র ও ডিজিটাল অ্যাপস তৈরি—এগুলো সরকারের বর্তমান উদ্যোগ।

প্রশ্ন: বাস্তবভাবে এর সুবিধা পাচ্ছেন কি? 

উত্তর: হ্যাঁ, যেমন নওগাঁর কৃষক রবিউল ইসলাম আগের চেয়ে দ্বিগুণ দামে পণ্য বিক্রি করতে পারছেন iFarmer-এর মাধ্যমে।

তথ্যসূত্র :

More articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest article

কারখানা পুনরায় চালু ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা

ঢাকা, ২৪ মে ২০২৬ — দ্য ডেইলি কর্পোরেট ডেস্ক দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু, রপ্তানি কার্যক্রমে গতি আনা এবং বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য...

আইএফআইসি ব্যাংক ও ল্যাবএইড গ্রুপের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর

ঢাকা, ২০ মে ২০২৬ — দ্য ডেইলি কর্পোরেট ডেস্ক গ্রাহক ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা নিশ্চিত করতে আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসি এবং দেশের অন্যতম...

ব্যস্ত না, কার্যকর হোন, উদ্যোক্তাদের সময় ব্যবস্থাপনা

লিখেছেনঃ মালিহা মেহেজাবিন বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক বিশ্বে একজন উদ্যোক্তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ শুধু মূলধন, মানবসম্পদ বা প্রযুক্তি নয়; বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো সময়। অর্থ...

ব্যবসায় ব্যর্থতার প্রধান কারণগুলো কী?

লেখকঃ আরেফিন রানা পিয়াস বর্তমান সময়ে ব্যবসা ও উদ্যোক্তা কার্যক্রম বিশ্ব অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন অনেক মানুষ নতুন ব্যবসা শুরু করলেও বাস্তবে...