লেখাঃ ফারহানা হুসাইন
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ যেখানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫-৩০% নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করতে হিমশিম খেতে হয়। এর মধ্যে ভ্যাট বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যা তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলবে।
ভ্যাট কি এবং এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর (মূসক) একটি পরোক্ষ কর, যা পণ্য বা সেবা উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে আরোপিত হয়। তবে শেষ পর্যন্ত এই করটি বহন করেন চূড়ান্ত ভোক্তা—অর্থাৎ যিনি পণ্যটি ব্যবহার করেন বা সেবাটি গ্রহণ করেন।
উদাহরণ : ধরুন আপনি একটি সাবান কিনলেন যার দাম ৫০ টাকা। এর মধ্যে যদি ৭.৫ টাকা ভ্যাট হয়, তাহলে সেই ভ্যাট সরকারকে প্রদান করবে দোকানদার। কিন্তু দোকানদার ওই টাকা আপনার কাছ থেকেই নিচ্ছে। অর্থাৎ, আপনি মূল পণ্যের দামের পাশাপাশি ভ্যাটটিও দিচ্ছেন।
গুরুত্ব
দেশের নাগরিকদের প্রতি দায়িত্ব পালন এবং তাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও ভাতা প্রদানের জন্য সরকারকে নিৰ্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়। আর এই বাজেটের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ আসে কর রাজস্ব থেকে।
সরকার এই রাজস্ব আদায়ের জন্য বিভিন্ন উৎস নির্ধারণ করে থাকে, যেমন আয়কর, সম্পত্তি কর, আমদানি-রপ্তানি শুল্ক পণ্য, মূল্য সংযোজন কর ইত্যাদি। এর মধ্যে ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর অনেক দিক থেকে অন্য কর ব্যবস্থার তুলনায় বেশি কার্যকর। শুধুমাত্র সংযোজিত মূল্য উপর ভ্যাট আরোপ করা হয় বলে তা প্রতিষ্ঠানের গঠন বা কার্যপ্রণালীর উপর নির্ভর করেন। এছাড়া প্রতিটি পর্যায়ে ভ্যাট ধার্য হওয়ার কারণে কর ফাঁকি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বড় বিষয়, এটি সরকারকে বড় আকারে রাজস্ব সংগ্রহ করতে সহায়তা করে, যা দেশের উন্নয়ন ও জনসেবায় ব্যয় করা হয়
ভ্যাট বৃদ্ধির কারণ কি?
১. সরকারি রাজস্ব বাড়ানো
দেশকে পরিচালনা করার জন্য সরকারকে বিভিন্ন খাতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। এই অর্থ সংগ্রহের প্রধান উৎস হলো সরকারি রাজস্ব। কিন্তু সাম্প্রতিককালে সরকারের রাজস্ব আয়ে ঘাটতি দেখা দিয়েছে যেটা পূরণের জন্যই ভ্যাট বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআরের হিসাবে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে নভেম্বর -এই পাঁচ মাসে সরকার যে রাজস্ব আয় করেছে, সেটা ২০২৩ সালের একই সময়ের তুলনায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা কম। এই পাঁচ মাসে সরকারের রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষমাত্রা ছিলো তার তুলনায় আদায় কম হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা।
অর্থ বছরের বাকি সময়ে টাকার এই ঘাটতি পূরণ সম্ভব নয়। তাই সহজ সমাধান হিসেবে ভ্যাট বাড়ানোর পথে গেছে সরকার।
২. বিদেশী ঋণ পরিশোধের চাপ
বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প যেমন– মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ইত্যাদি বাস্তবায়নে দেশকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। এসব ঋণ পরিশোধের জন্য সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন।
৩. IMF বা আন্তর্জাতিক সংস্থার শর্ত পূরণ
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর মতো সংস্থাগুলো থেকে অর্থ সহায়তা পাওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে থাকে কর সংস্কার করা ও রাজস্ব বাড়ানো। বর্তমান ভ্যাট বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সরকার ভ্যাট বাড়িয়েছে।
আরও পড়ুন – IMF দিচ্ছে ১৩০০ মিলিয়ন ডলার, কিন্তু এর বদলে আমাদের কী দিতে হবে? চুক্তির আসল হিসাবটা কী?
৪. সরকারের বর্ধিত ব্যয় মেটাতে
বর্তমান সময়ে সরকার একদিকে ভ্যাট বৃদ্ধি করে টাকা আদায় করছে, অন্যদিকে নতুন নতুন ব্যয়ের খাত তৈরি করছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের মহার্ঘ ভাতা বাড়ানোর ঘোষণা, বৈদেশিক ভাতা বৃদ্ধি, পুলিশ, র্যাব ও আনসারের পোশাক পরিবর্তন সহ আরো অনেক খাতে সরকার প্রচুর পরিমানে অর্থ ব্যয় করছে।
এছাড়াও ঢাকা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদন মতে, অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ভ্যাট বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন “বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যারা গুরুতর আহত হয়েছেন, তাদের প্রত্যেককে ৩৫ লাখ টাকা করে কয়েকশ কোটি টাকা দিতে হয়েছে। পুলিশের ৩০০ গাড়ি পুড়িয়েছে, সেখানে ৫০০ কোটি টাকা দিতে হবে। এই টাকার জোগান দিতেই ভ্যাট বাড়িয়েছি।”
ভ্যাট বৃদ্ধিতে জনগণের ভোগান্তি
বিশ্বে যেসব দেশের কর-জিডিপির অনুপাত সবচেয়ে কম, বাংলাদেশ তাদের অন্যতম। গত ১৫ বছরে দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পেলেও রাজস্ব জিডিপির অনুপাত বাড়েনি, বরং কিছুক্ষেত্রে কমেছে। এর প্রধান কারণ হতে পারে এদেশের মানুষের কর ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা।
অ্যাকশনএইডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে করপোরেট কর ফাঁকি ঠেকানো জরুরি। করপোরেট কর ফাঁকির কারণে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় প্রয়োজনীয় কর আদায়ে পিছিয়ে পড়ছে দেশ। ( সূত্র – প্রথম আলো )
রাজস্ব আয়ের এই ঘাটতি পূরণেই ভ্যাট বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কিন্তু ভ্যাট হলো একটি প্রতিসম কর, অর্থাৎ ধনী-গরিব সবাইকে একই হারে দিতে হয়। ফলে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর এর প্রভাব আরো প্রকট হয়।
১. জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি
ভ্যাট বৃদ্ধি পেলে যেকোনো পণ্যের মূল্য আগের থেকে বেড়ে যায়। এতে করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে জনগণকে পূর্বের তুলনায় বেশি ব্যয় করতে হয়। ফলে সীমিত আয়ের মানুষদের প্রতিদিনের খরচ বেড়ে যায় এবং পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
২. সমাজে আর্থিক বৈষম্য বৃদ্ধি পায়
ভ্যাট ধনী-গরিব সবার জন্য সমান। অর্থাৎ ধনী ব্যক্তি যেখানে লাখ টাকার পণ্য কিনে ভ্যাট দেয়, গরিব মানুষ পাঁচশো টাকার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনেও সেই একই হারে কর দেয়। এতে করে সমাজে আর্থিক বৈষম্য আরও প্রকট হয়।
৩.জীবনযাত্রার মান হ্রাস
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ নিম্ন বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত হওয়ায় তারা এমনিতেই তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে হিমশিম খায়। তার মধ্যে বর্ধিত ভ্যাট তাদের জীবনযাত্রার মানকে আরও নিচে নামিয়ে দেয়।
৪. ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় প্রভাব
শুধু ভোক্তা নয়, ভ্যাট বৃদ্ধি পেলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়েন। ভ্যাট বৃদ্ধি পাওয়ায় পণ্যের সার্বিক মূল্য বেড়ে যায়, এতে করে অনেকেই পণ্য কেনার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। ফলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। চাকরি বা আয় না বাড়লেও ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই ঋণের ফাঁদে পড়ে যান।
আরও পড়ুন – সবার জন্য ইনকাম—ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম কি আমাদের দেশে সম্ভব?
সম্ভাব্য সমাধান
ভ্যাট বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ছে, ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকার যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে :
১. আয়কর ও সম্পদ কর বৃদ্ধি করা।
২. সবাই যেন নিয়মিত আয়কর প্রদান করে সেদিকে কঠোর দৃষ্টি রাখা।
৩. কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা আনা।
৪. সরকারের অপ্রয়োজনীয় বা কম গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় হ্রাস করতে হবে।
সরকারের হঠাৎ ভ্যাট বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য অভিশাপস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ, যাদের আয় সীমিত অথচ ব্যয় দিনদিন বেড়েই চলেছে, তাদের জীবনযাত্রা আরও দুর্বিষহ হয়ে পড়ছে। তাই সরকারের উচিত, ভ্যাট বৃদ্ধির মাধ্যমে রাজস্ব আয়ের উদ্যোগ নেওয়ার বদলে একটি ন্যায্য করনীতি গ্রহণ করা, যা ধনী-গরিবের বৈষম্য হ্রাস করবে এবং জনগণের ওপর অযৌক্তিক আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে না।
আরও পড়ুন – IMF ১৩০০ মিলিয়ন ডলারের তহবিল – বাংলাদেশ কীভাবে ব্যবহার করছে?
তথ্যসূত্র
ভ্যাট বাড়ানোর কারণ ব্যাখ্যা করলেন অর্থ উপদেষ্টা
‘বাংলাদেশে কর ফাঁকির প্রবণতা অনেক বেশি’
হঠাৎ কেন এই ভ্যাট বৃদ্ধি, কী অবস্থা অর্থনীতির
প্রশ্নোত্তর
১. ভ্যাট কী?
উত্তর : ভ্যাট (VAT বা মূল্য সংযোজন কর) হলো একটি পরোক্ষ কর, যা পণ্য ও সেবার প্রতি ধাপে ‘সংযোজিত মূল্যের’ উপর আরোপ করা হয়। এটি শেষ পর্যন্ত ভোক্তা বহন করে।
২. সরকার হঠাৎ ভ্যাট বাড়াচ্ছে কেন?
উত্তর : রাজস্ব ঘাটতি মেটানো, বৈদেশিক ঋণের চাপ সামলানো ও IMF-এর শর্ত পূরণের জন্য সরকার ভ্যাট বৃদ্ধির পথে হাঁটছে।
৩. ভ্যাট বাড়লে সাধারণ মানুষের কী প্রভাব পড়ে?
উত্তর : নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যায়। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ তাদের দৈনন্দিন খরচে চাপ অনুভব করেন। জীবনযাত্রার মান কমে যায়।
৪. আয়কর ও ভ্যাট—এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর : ১. আয়কর হলো প্রত্যক্ষ কর, যা আয় করা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের উপর আরোপিত হয়।
ভ্যাট হলো পরোক্ষ কর, যা পণ্য বা সেবা ক্রয়ের সময় পরিশোধ করতে হয়।
২. আয়কর ধনীদের বেশি দিতে হয়, কিন্তু ভ্যাট ধনী-গরিব সবার জন্যই সমান হারে প্রযোজ্য।
৫. বিক্রয় কর আর ভ্যাট কি এক জিনিস?
উত্তর : নয়। বিক্রয় কর কেবল পণ্য বিক্রির শেষ ধাপে নেওয়া হয়, কিন্তু ভ্যাট প্রতিটি উৎপাদন ও বিতরণ ধাপে “সংযোজিত মূল্যে” আরোপিত হয়।
৬. ভ্যাট বৃদ্ধির কোনো বিকল্প আছে কি?
উত্তর : হ্যাঁ। বিকল্পগুলো হতে পারে— উচ্চআয়ের ব্যক্তিদের জন্য করহার বৃদ্ধি, কর ফাঁকি বন্ধ করে করের আওতা বাড়ানো, দরিদ্রবান্ধব ভর্তুকি পুনর্বিন্যাস, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমানো
৭. ভ্যাট বৃদ্ধির ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কীভাবে প্রভাবিত হন?
উত্তর : পণ্যের দাম বেড়ে গেলে ক্রেতা কমে যায়, বিক্রি কমে যায়। এতে ছোট ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয় এবং অনেক সময় ঋণের ফাঁদে পড়তে হয়।
৮. এখন কর-জিডিপি অনুপাত কেমন?
উত্তর : বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত পৃথিবীর অন্যতম সর্বনিম্ন, প্রায় ৮-৯%। যদিও জিডিপি বেড়েছে, রাজস্ব আহরণ বাড়েনি। ফলে সরকার সহজপথ হিসেবে ভ্যাট বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
৯. রাজস্ব কি?
উত্তর : রাজস্ব (Revenue) বলতে বোঝায় রাষ্ট্র বা সরকারের আয়, যা বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত অর্থের মাধ্যমে গঠিত হয়। সরকার এই রাজস্ব ব্যবহার করে দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম, প্রশাসনিক ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ইত্যাদি খাতে অর্থ ব্যয় করে।





