লিখেছেনঃ আনজুম নাহার নিসা
দেশের ব্যবসায়িক অঙ্গনে প্রতিবছর অসংখ্য স্টার্টআপ দেখতে পাওয়া যায়। তবে তার একটি বড় অংশ খুব কম সময়ের মধ্যেই ধসে যায়। এর সবচেয়ে বড় কারণ যেটি – সঠিকভাবে অর্থ ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ হওয়া। এর কারণে অনেক নতুন উদ্যোক্তা দারুণ মানের সৃজনী আইডিয়া ও উদ্যম নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও সঠিক অর্থ ব্যবস্থাপনার অক্ষমতায় পিছিয়ে পড়ে, কোন ক্ষেত্রে চরম প্রতিযোগিতার মুখে হুমড়ি খেয়ে সফলতার বাতিঘর সম্পূর্ণভাবেই নিভে যায়। ব্যবসায় টিকে থাকা কোনও জটিল বিষয় নয় যদি না এর জন্য স্মার্টভাবে নির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ অনুসরণ করা হয়।
প্রথমেই আসা যাই, ফাইনেন্স ম্যানেজমেন্ট বলতে আসলে কী বোঝায়? এটি মূলত ব্যবসার আয়, ব্যয়, সঞ্চয় এবং বিনিয়োগকে পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা। একজন উদ্যোক্তার জন্য এটা একটা গাইডলাইনের মতো, যা তাকে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। সঠিক আর্থিক পরিকল্পনা ছাড়া একটি ব্যবসা দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা কঠিন।
স্টার্টআপে যারা ব্যর্থ হয় তাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় তারা বিক্রি, অফিসের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা ও বিজ্ঞাপনের দিকে অধিক মনোযোগী হলেও অর্থ ব্যবস্থাপনার দিকে খুব কমই মনোযোগ দেয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় ব্যবসায়িক অর্থ ও ব্যক্তিগত খরচ এক হয়ে যায়। এর জন্য যারা নতুন ব্যবসা শুরু করেছেন বা করছেন তাদের জন্য প্রথম পরামর্শই থাকবে, ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক অর্থ আলাদা রাখা। ব্যবসার শুরুতেই ব্যবসায়িক উদ্দেশে একটি আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে নিতে হবে এবং ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট আলাদা রাখতে হবে। এতে ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থের হিসাব রাখা সহজ হয়ে উঠবে।
দ্বিতীয়ত যে কাজটি করতে হবে তা হল, সঠিক ও সুষ্ঠু বাজেট নির্ধারণ করে ফেলা। যেকোনো উদ্যোক্তার জন্য আর্থিক ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কাজ শুরু করার আগে কাজের ফিল্ড কত বড় হবে তা নির্ধারণ করে এগোতে হয়। নয়তো শুরুতেই ব্যবসার ক্যাপিটাল, ফান্ডিং ও খরচগুলো হিসাবের বাইরে চলে যায়। এর ফলে ব্যবসার ম্যানেজমেন্টে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। তাই বাজেট নির্ধারণ করা অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সঠিক ও সুস্পষ্ট বাজেট পরিকল্পনা করা একটি ব্যবসার সফলতার জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি সুস্পষ্ট বাজেট উদ্যোক্তাকে জানায় কোথায় কত খরচ করা উচিৎ এবং কোথায় সংযমী হওয়া প্রয়োজন। বাজেট পরিচালনার মাধ্যমে একজন উদ্যোক্তা নিয়মিত আর্থিক স্টেটমেন্ট পর্যালোচনা করতে পারেন এবং তার ব্যবসার যাবতীয় খরচের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন। অনেক উদ্যোক্তা আছেন যারা কোন খাতে ব্যয় করা উচিৎ এবং কোন খাতে খরচ কমানো উচিৎ তা নির্ধারণ করতে পারেন না। এর ফলে তাদের পরবর্তীতে চাপের মুখে হিমশিম খেতে হয়। তাই একটি কার্যকর বাজেট ব্যবসার জন্য একটি রোডম্যাপের মতো কাজ করে।
তৃতীয় যে বিষয়টিতে সতর্ক থাকতে হবে তা হল ক্যাশ ফ্লো ম্যানেজমেন্টের দিকে। ক্যাশ ফ্লো ম্যানেজমেন্ট বলতে গেলে ব্যবসার প্রাণ। ব্যবসায় লাভ হচ্ছে মানেই ব্যবসা ভালো চলছে, এটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা। নিট মুনাফার চেয়েও জরুরী হল হাতে কতটুকু ফ্রি ক্যাশ ফ্লো আছে। অনেক ব্যবসা কাগজে-কলমে লাভজনক হলেও পর্যাপ্ত নগদ অর্থের অভাবে সমস্যায় পড়তে হয়। ব্যবসার ক্রান্তিকালে নগদ অর্থই মসীহের ভূমিকা পালন করবে আপনার জন্য। সফল ব্যসসায়ী সে যে জানে তার প্রতিটি পয়সা কোথায় কোথায় খরচ হচ্ছে এবং মুনাফা হচ্ছে কতটুকু এবং ব্যবসায় পুনরায় বিনিয়োগ করার জন্য পুঞ্জি আছে কতটুকু। তাই আয় ও ব্যয়ের সঠিক প্রবাহ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়মিত হিসাব রাখাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এতে ব্যবসার প্রকৃত অবস্থান সহজে বোঝা যায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয়।
এছাড়া, আরও গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি তা হল খরচ নিয়ন্ত্রণ করতে শিখতে হবে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় উদ্যোক্তারা শুরুতেই অফিসে বিলাসবহুল অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এটি সম্পূর্ণ ভুল প্রক্রিয়া। উদ্যোক্তাদের প্রথম টার্গেট হতে হবে ব্যবসার স্থিতিশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে প্রয়োজনীয় খাতে বিনিয়োগ করা ব্যবসার স্থিতিশীলতা বাড়ায়। তাই শুরুতেই বিলাসবহুল অফিসে বিনিয়োগ করার চেয়ে ব্যবসার মূল কার্যক্রমে খরচ করাতে বেশি মনোযোগী হতে হবে।
এছাড়া, সঠিক বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত একটি ব্যবসাকে সুদূর পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে। অর্জিত লাভের একটি অংশ পুনরায় ব্যবসায় বিনিয়োগ করলে তা দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করে। তবে এক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনা করা উচিৎ।
আমাদের দেশের সার্বিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায় হঠাৎ করে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাচ্ছে বা অপ্রত্যাশিত বন্যার কারণে সংকট দেখা দিচ্ছে, তাই এজন্য জরুরী তহবিল গঠন করে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে আছেন কেবল লাভের আশায় সবটুকু বিনিয়োগ করে ফেলেন এবং বিপদআপদের ব্যাপারটি মাথায় রাখেন না। এতে আপদকালীন সঞ্চয় না থাকায় সহজেই ব্যবসা টিকে থাকতে বেরথ হয়। ব্যবসার চাকা সচল রাখতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্যবসায় অনিশ্চয়তা থাকবেই – এ সত্যটা মাথায় রেখে জরুরী তহবিল হাতে রাখতে হবে এবং বিকল্প পরিকল্পনাও তৈরি করে রাখতে হবে। এটি অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে ব্যবসাকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে।
সবশেষে বলা যায়, ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট কঠিন কিছু নয়, বরং এটি কিছু সচেতন পদক্ষেপের সমষ্টি। স্মার্টভাবে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করলে ব্যবসাকে সুদূর পর্যন্ত টিকিয়ে রাখা সম্ভব।





