ঢাকা, ডেইলি কর্পোরেট রিপোর্ট
দীর্ঘদিনের আলোচিত পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের প্রথম ধাপের জন্য প্রায় ৳৩৪,৩৪৭ কোটি টাকার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। মঙ্গলবার (১৩ মে) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা তারেক রহমান।
মোট ৳৫০,৪৪৩.৬৪ কোটি ব্যয়ের এই বৃহৎ প্রকল্পটি রাজবাড়ীর পাংশায় বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পের আওতায় পদ্মা নদীতে একটি ব্যারেজ নির্মাণের মাধ্যমে প্রায় ২,৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে, যা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, নদী পুনরুদ্ধার ও পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পানি সংকট মোকাবিলায় বড় উদ্যোগ
প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হচ্ছে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীতে পানির প্রবাহ ধরে রাখা এবং ইছামতি-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী ব্যবস্থায় জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা।
এছাড়া এই পানি ব্যবহার করা হবে—
- গঙ্গা-কপোতাক্ষ (GK) সেচ প্রকল্পে
- গোদাগাড়ী পাম্প হাউজে
- Rooppur Nuclear Power Plant-এ পানি সরবরাহে
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই প্রকল্পের মাধ্যমে কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহীর প্রায় ২.৮৮ মিলিয়ন হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
জলবিদ্যুৎ, কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনে সম্ভাবনা
প্রকল্পের আওতায় ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। একইসঙ্গে ব্যারেজের ওপর সড়ক, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের জন্য বহুমুখী করিডোর গড়ে তোলা হবে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে অতিরিক্ত—
- প্রায় ২৩.৯ লাখ টন ধান উৎপাদন
- প্রায় ২.৩৪ লাখ টন মাছ উৎপাদন
বাড়তে পারে।
কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রভাব
প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় প্রায় ১২.২৫ কোটি মানব-দিন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে প্রায় ৪৭,৯৫০ জন শ্রমিক সরাসরি কাজের সুযোগ পাবেন এবং মোট ৯.২৭ লাখ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।
এছাড়া প্রায় ১.৫ লাখ পরিবারের জন্য ৩,৪৫০ একর জমিতে সাতটি স্যাটেলাইট টাউন ও আধুনিক গ্রামীণ টাউনশিপ গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রকল্পটি থেকে বছরে প্রায় ৳৮,০০০ কোটি অর্থনৈতিক সুফল আসতে পারে এবং দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে প্রায় ০.৪৫ শতাংশ অবদান রাখতে পারে।
সুন্দরবন ও পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকা
Sundarbans-সংলগ্ন সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে লবণাক্ততা কমাতে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; বরং দেশের পানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের অন্যতম কৌশলগত উদ্যোগ।
ফারাক্কা ব্যারেজের প্রভাব মোকাবিলার পরিকল্পনা
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ভারতের Farakka Barrage চালুর পর থেকে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী, খাল ও কৃষি ব্যবস্থায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নৌপথ, মৎস্য ও বনজ সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিশেষ করে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও ম্যানগ্রোভ বন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অবকাঠামোগত বৈশিষ্ট্য
প্রকল্পের আওতায় নির্মিত হবে—
- ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল ব্যারেজ
- ৭৮টি স্পিলওয়ে
- ১৮টি আন্ডারস্লুইস
- ফিশ পাস
- নেভিগেশন লক
- গাইড বাঁধ
এছাড়া গড়াই, চন্দনা ও হিসনা নদীর জন্য পৃথক অফটেক স্ট্রাকচার নির্মাণ করা হবে।
নদী ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে—
- গড়াই-মধুমতি নদী ব্যবস্থায় ১৩৫.৬ কিলোমিটার ড্রেজিং
- হিসনা নদী ব্যবস্থায় ২৪৬.৪৬ কিলোমিটার পুনঃখনন
কাজ পরিচালনা করা হবে।
দীর্ঘ ছয় দশকের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন
বাংলাদেশে গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণের ধারণা প্রথম উঠে আসে ১৯৬০-এর দশকে। ১৯৬১ সালে তৎকালীন ইপওয়াপডা (বর্তমান বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড) প্রথম সমীক্ষা শুরু করে।
২০০২ সালে পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা কুষ্টিয়ার ঠাকুরবাড়ি অথবা রাজবাড়ীর পাংশায় ব্যারেজ নির্মাণের সুপারিশ করে। পরবর্তীতে ২০০৯ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রকৌশল নকশা সম্পন্ন হয়।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পটির প্রথম ধাপ ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এর অর্থায়ন সম্পূর্ণ সরকারি তহবিল থেকে করা হবে।



