লেখকঃ আহমাদ জামীল হক
একসময় বাংলাদেশে কফি ছিল অভিজাত রেস্টুরেন্ট বা পাঁচতারকা হোটেলের পানীয়। চায়ের দেশ হিসেবে পরিচিত এই ভূখণ্ডে সকাল-সন্ধ্যার আড্ডা মানেই ছিল ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা। তবে সময় বদলেছে। শহর থেকে মফস্বল, সবখানেই এখন কফির কদর বাড়ছে দ্রুত। তরুণ প্রজন্মের জীবনধারা, ক্যাফে সংস্কৃতির বিস্তার এবং নতুন উদ্যোক্তাদের আগ্রহে দেশের পানীয় বাজারে তৈরি হয়েছে এক নতুন ধারা।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে দেশে কফির বাজারে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। একসময় যেটি ছিল শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক ব্যবসা, সেটি এখন ছড়িয়ে পড়ছে বিভাগীয় শহরগুলোতেও। পরিসংখ্যান বলছে ২০০৩ সালে যেখানে দেশে কফি আমদানি হতো মাত্র ১৩৯ টন, সেখানে ২০২৫ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী বার্ষিক চাহিদা দাঁড়িয়েছে ৪৮ হাজার ৬৬০ টনে। অর্থাৎ গত দুই দশকে কফির চাহিদা বেড়েছে অভাবনীয় হারে।
এনবিআরের তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মোট কফি আমদানি হয়েছে ১৪.৩৯ লাখ কেজি। বাজারে কফির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে বার্ষিক ৫৬ শতাংশ হারে। বর্তমানে কেবল ঢাকা শহরেই দৈনিক ৩ লাখ কাপের বেশি কফি বিক্রি হচ্ছে। অথচ মজার বিষয় হলো, দেশের মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ বাড়িতে কফি পান করেন। ফলে এই বাজারের সম্ভাবনা যে বিশাল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তরুণদের লাইফস্টাইল পরিবর্তন, ফ্রিল্যান্সিং ও করপোরেট সংস্কৃতির বিস্তার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “ক্যাফে কালচার” জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় কফির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এখন অনেকের কাছে কফি শুধু পানীয় নয়, বরং একটি সামাজিক অভ্যাস ও পরিচয়ের অংশ।
আমদানি বাজারে দীর্ঘকাল একক আধিপত্য ছিল নেসলে বাংলাদেশের। ২০০৩ সালে তাদের বাজার হিস্যা ছিল ৯৭ শতাংশ, যা বর্তমানে কমে দাঁড়িয়েছে ৪৭ শতাংশে। অন্যদিকে দেশীয় কোম্পানিগুলোর উত্থান চোখে পড়ার মতো। মাত্র ৩ বছরে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে আবুল খায়ের গ্রুপের ‘আমা কফি’। দুই বছর আগেও সপ্তম স্থানে থাকা আমা কফি এখন ১১ শতাংশ বাজার দখল করে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। এছাড়া প্রাণ গ্রুপ ও বেক্সিমকোর (বাত্ত্রিল) দখলে রয়েছে যথাক্রমে ৯ শতাংশ ও ৬ শতাংশ বাজার।
বিদেশি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে পাহাড়ি অঞ্চলে শুরু হয়েছে কফি চাষ। বান্দরবানে এখন স্থানীয় চাহিদার ৯০ শতাংশ কফি উৎপাদিত হচ্ছে। সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১০ হাজার হেক্টর জমিতে চাষাবাদের মাধ্যমে ৪ থেকে ৫ হাজার টন কফি উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া রংপুর, নীলফামারী ও টাঙ্গাইলের মতো সমতল জেলাগুলোতেও পরীক্ষামূলক চাষ শুরু হয়েছে।
কফি কালচারের এই পরিবর্তনে মূল কারিগর তরুণরা। ‘নর্থ এন্ড’ বা ‘ক্রিমসন কাপ’-এর মতো ব্র্যান্ডগুলো যেমন জনপ্রিয় হয়েছে, তেমনি পাড়া-মহল্লায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য ক্ষুদ্র কফি শপ। কৃষিতেও তৈরি হচ্ছে নতুন উদ্যোক্তা শ্রেণি। কেউ নিজস্ব রোস্টারি করছেন, কেউ আবার দেশীয় কফি বিন দিয়ে বিশেষ ফ্লেভার তৈরি করছেন। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এখন ছোট পরিসরের “স্পেশালটি কফি শপ” চোখে পড়ছে, যেখানে শুধু কফি বিক্রি নয়, বরং তৈরি হচ্ছে নতুন এক সামাজিক সংস্কৃতি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আগামী ৪ বছরে কফির বাজার মূল্য ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে। তরুণ ভোক্তাদের বড় একটি অংশ এখন নতুন স্বাদ ও আধুনিক জীবনধারার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে আগ্রহী। যদিও চা এখনো দেশের প্রধান পানীয়, তবুও কফির বাজার যে দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে—তা আর অস্বীকার করার উপায় নেই।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। উচ্চ আমদানি ব্যয়, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং ক্যাফে ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বাড়ায় অনেক উদ্যোক্তাকে চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে ও অনলাইন আলোচনায়ও কফি ও ক্যাফে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে।
তারপরও আশাবাদী উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ কফি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে পারবে। একইসঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান ও রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
চায়ের দেশে তাই এখন ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে কফির নতুন অধ্যায়, যেখানে বদলে যাচ্ছে বাজার, বদলাচ্ছে তরুণদের রুচি, আর জন্ম নিচ্ছে নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তা।



