spot_imgspot_imgspot_imgspot_img

দেশের বাজারে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে র‍্যাপিড হার্ডেনিং সিমেন্ট

স্বল্প সময়ে অধিক দৃঢ়তা অর্জনের সক্ষমতার কারণে আধুনিক নির্মাণ ব্যবস্থায় এই বিশেষ ধরনের সিমেন্টের ব্যবহার বাড়ছে। বিশেষ করে ফাউন্ডেশন, কলাম, বীম ও ছাদ ঢালাইয়ের কাজে, সময়সীমা-নির্ভর প্রকল্পে এবং জরুরি নির্মাণকাজে এই ধরনের সিমেন্টের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

দেশের নির্মাণ সামগ্রী খাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে র‍্যাপিড হার্ডেনিং সিমেন্ট। সারা বিশ্বেই র‍্যাপিড হার্ডেনিং সিমেন্ট বর্তমানে বড় পরিসরে ব্যবহৃত হচ্ছে। নতুন দিনের নির্মাণ চাহিদা পূরণে এবং দ্রুততার সাথে কাজ সম্পন্ন করতে র‍্যাপিড হার্ডেনিং সিমেন্ট ব্যবহারের প্রচলন আমাদের দেশে এখনও তুলনামূলকভাবে নতুন। তবে বিগত কয়েক বছরে কিছু কিছু প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে এই ধরনের সিমেন্ট সফল বাজারজাতকরণের পর এর কার্যকারিতার কারণেই তা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। স্বল্প সময়ে অধিক দৃঢ়তা অর্জনের সক্ষমতার কারণে আধুনিক নির্মাণ ব্যবস্থায় এই বিশেষ ধরনের সিমেন্টের ব্যবহার বাড়ছে। বিশেষ করে ফাউন্ডেশন, কলাম, বীম ও ছাদ ঢালাইয়ের কাজে, সময়সীমা-নির্ভর প্রকল্পে এবং জরুরি নির্মাণকাজে এই ধরনের সিমেন্টের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

র‍্যাপিড হার্ডেনিং সিমেন্ট কী

র‍্যাপিড হার্ডেনিং সিমেন্ট হচ্ছে এমন এক বিশেষ ধরনের সিমেন্ট যা দ্রুত শক্ত হয় এবং সাধারণ সিমেন্ট-এর তুলনায় প্রাথমিকভাবে ও দীর্ঘমেয়াদে দ্রুত ও অধিক শক্তি অর্জন করে। এছাড়া র‍্যাপিড হার্ডেনিং সিমেন্ট প্রথম ৩ দিনেই অন্যান্য সিমেন্ট-এর ৭ দিনের শক্তি এবং ১৪ দিনেই কংক্রিট-এর ডিজাইন স্ট্রেন্থ অর্জন করতে পারে। এর রাসায়নিক গঠন এবং সূক্ষ্ম কণার জন্যই দ্রুত শক্তি অর্জন করার এই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।

র‌্যাপিড হার্ডেনিং সিমেন্ট-এর প্রয়োজনীয়তা

নির্মাণকাজে সময় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বর্তমান সময়ে নির্মাণ খাতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সময়মতো প্রজেক্ট-এর কাজ সম্পন্ন করা। দীর্ঘ সময় ধরে কংক্রিট শক্ত হওয়ার কারণে একদিকে যেমন কাজের গতি কমে যায়, অন্যদিকে ব্যয় বাড়ে। তাই সময়ের সাথে সাথে কাজের গতি ধরে রাখতে নতুন নতুন প্রযুক্তি ও নির্মাণ সামগ্রীর চাহিদা গড়ে ওঠাই স্বাভাবিক। সিমেন্ট-ও এর ব্যতিক্রম নয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে, সম্ভব হলে তার আগেই কাজ শেষ করতে পারলে সবার জন্যই ব্যবহারিক ও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকে। এই ভাবনা থেকেই র‍্যাপিড হার্ডেনিং সিমেন্ট-এর আবির্ভাব।

উদাহরণস্বরূপ, র‍্যাপিড হার্ডেনিং সিমেন্ট-এ তৈরিকৃত কংক্রিট-এর দ্রুত ও অধিক শক্তির কারণে ডিশাটারিং-এর সময় কম লাগে এবং দ্রুততম সময়ে প্রজেক্ট-এর কাজ শেষ করা যায়। সামগ্রিকভাবে বলা যায়, র‌্যাপিড হার্ডেনিং সিমেন্ট ব্যবহারে দ্রুত শাটারিং অপসারণ, কম সময়ে বিল্ডিং-এর ভারবহন ক্ষমতা অর্জন এবং দ্রুত পরবর্তী নির্মাণ ধাপে অগ্রসর হওয়া যায়।

বিশ্ববাজারে র‌্যাপিড হার্ডেনিং সিমেন্ট-এর জনপ্রিয়তা

বাংলাদেশে র‌্যাপিড হার্ডেনিং সিমেন্ট-এর প্রচলন তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও, বিশ্বব্যাপী অনেক আগে থেকেই নির্মাণ কাজে এই সিমেন্ট-এর ব্যবহার হয়ে আসছে। দ্রুত নগরায়ণ, বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প, আকাশচুম্বী দালান নির্মাণ, এবং শ্রম ও সময়ের দক্ষ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার কারণে এই সিমেন্ট বৈশ্বিক নির্মাণ শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে। বস্তুতপক্ষে, উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে বর্তমানে র‍্যাপিড হার্ডেনিং সিমেন্ট ছাড়া কোন ধরনের স্থাপনা নির্মাণ কল্পনাই করা যায় না। বুর্জ খলিফা (দুবাই), দ্য শার্ড (লন্ডন), দ্য গার্কিন (লন্ডন), সাংহাই টাওয়ার (সাংহাই), ফ্রিডম টাওয়ার (নিউ ইয়র্ক), লোটে ওয়ার্ল্ড টাওয়ার (সিউল), হিথরো এয়ারপোর্ট টার্মিনাল ৫ (লন্ডন), লস অ্যাঞ্জেলস মেট্রো (লস অ্যাঞ্জেলস) সহ বিশ্বখ্যাত প্রায় সকল মেগাপ্রজেক্টেই র‌্যাপিড হার্ডেনিং সিমেন্ট ব্যবহৃত হয়েছে বলে জানা যায়। অর্থাৎ মহাসড়ক, সেতু, বিমানবন্দরের রানওয়ে, মেট্রো রেল এবং শিল্প স্থাপনায় দ্রুত নির্মাণ সম্পন্ন করার জন্য এটি আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত।

বাংলাদেশে র‌্যাপিড হার্ডেনিং সিমেন্ট-এর জনপ্রিয়তা বাড়ার কারণ

উন্নত বিশ্বের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও চলমান মেগাপ্রজেক্ট, দ্রুত নগরায়ণ এবং অবকাঠামো সম্প্রসারণের ফলে র‌্যাপিড হার্ডেনিং সিমেন্ট-এর ব্যবহার বাড়ছে। সীমিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের চাপ, শীত বা বর্ষাকালজনিত প্রতিকূল আবহাওয়ায় দ্রুত কাজ শেষ করার প্রয়োজনীয়তা এই সিমেন্টকে প্রতিনিয়ত জনপ্রিয় করে তুলছে। রিয়েল এস্টেট বা ব্যক্তিগত পর্যায়ে নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী বাণিজ্যিক ও আবাসন প্রজেক্ট হস্তান্তর করার লক্ষ্যমাত্রা থাকায় র‌্যাপিড হার্ডেনিং সিমেন্ট-এর ব্যবহার বেড়েছে।

বাংলাদেশে সাধারণত দুই ধরনের সিমেন্ট কয়েক দশক ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে- অর্ডিনারি পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট (ওপিসি) এবং পোর্টল্যান্ড কম্পোজিট সিমেন্ট (পিসিসি)। ওপিসি সিমেন্ট দিয়ে কাজ করলে হিট অব হাইড্রেশন বেশি হওয়ায় কংক্রিট-এ ক্র্যাক বা ফাটল ধরার প্রবণতা থাকে। আবার পিসিসি সিমেন্ট-এর প্রাথমিক শক্তি সাধারণত কম হয়ে থাকে। যেহেতু পিসিসি-এর স্ট্রেন্থ ক্লাস ৪২.৫ MPA (মেগাপ্যাসকেল) এবং ওপিসি-এর ৫২.৫ MPA, এই উভয় সমস্যা মোকাবেলায় বাংলাদেশে পিসিসি ক্যাটাগরির র‌্যাপিড হার্ডেনিং সিমেন্ট ব্যবহারের চাহিদা তৈরি হচ্ছে, যেন একই সাথে ওপিসি সিমেন্ট-এর মতো দ্রুত দৃঢ়তা অর্জন এবং এর পাশাপাশি হিট অব হাইড্রেশন কম থাকায় ফাটলের ঝুঁকি কমে।

বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই কয়েকটি সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান র‍্যাপিড হার্ডেনিং সিমেন্ট বাজারে এনেছে। তাদের মধ্যে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই) সর্বপ্রথম ‘ঢালাই স্পেশাল সিমেন্ট’ নামে R Category-এর র‍্যাপিড হার্ডেনিং সিমেন্ট বাজারে নিয়ে আসে, যা দ্রুত গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এই স্পেশাল সিমেন্ট-এ ওপিসি ও পিসিসি-এর বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ বিদ্যমান থাকে। অর্থাৎ, এই স্পেশাল সিমেন্ট একদিকে যেমন র‌্যাপিড হার্ডেনিং হওয়ায় ওপিসি-এর মতো দ্রুত দৃঢ়তা অর্জন করে, তেমনি সময়ের সাথে সাথে পিসিসি সিমেন্ট-এর মতো দীর্ঘমেয়াদে স্থাপনাকে করে আরও সুদৃঢ়। এই সিমেন্ট গঠনগতভাবে পিসিসি এ.এম. হওয়ায় এর হিট অব হাইড্রেশন এমনিতেই ওপিসি-এর চাইতে কম থাকে। ফলে ক্র্যাক-এর প্রবণতাও থাকে না। র‌্যাপিড হার্ডেনিং সিমেন্ট প্রথম ২ দিনেই ওপিসি সিমেন্ট-এর সমান, অর্থাৎ ২০ এমপিএ দৃঢ়তা অর্জন করতে সক্ষম হয় এবং সেক্ষেত্রে প্রায় ১৪ দিন পরেই শাটারিং খুলে ফেলা সম্ভব হয়, যা প্রচলিত সিমেন্ট-এর ক্ষেত্রে সাধারণত ২১-২৮ দিন পর্যন্ত হয়ে থাকে। ঢালাই স্পেশাল সিমেন্ট ব্যবহারে নির্মাণকাজের সময় ২৫% পর্যন্ত ও খরচ ১৮% পর্যন্ত সাশ্রয় করা সম্ভব।

নির্মাণ বিশেষজ্ঞ, বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ার-রা মনে করেন, সঠিক প্রকৌশল নকশা ও মাননিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে র‍্যাপিড হার্ডেনিং সিমেন্ট দেশের নির্মাণ খাতে আরও বড় ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণে এটি এখন একটি কার্যকর এবং দক্ষ নির্মাণ সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

More articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest article

মোটরসাইকেল ও ব্যাটারি চালিত অটোরিকশায় বার্ষিক কর আরোপের পরিকল্পনা করছে সরকার

দ্য ডেইলি কর্পোরেট সরকার প্রথমবারের মতো মোটরসাইকেল এবং ব্যাটারি চালিত অটোরিকশাকে অগ্রিম আয়কর (Advance Income Tax) ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত...

বাজার থেকে আরও ৪৫ মিলিয়ন ডলার কিনলো বাংলাদেশ ব্যাংক

দ্য ডেইলি কর্পোরেট ডেস্ক Bangladesh Bank বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে আরও ৪৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কিনেছে। রোববার (১১ মে) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের...

উদ্যোক্তা হওয়ার আগে যেসব বিষয় জানা জরুরি

লেখক: আরেফিন রানা পিয়াস বর্তমান সময়ে উদ্যোক্তা হওয়া শুধু একটি পেশা নয়, বরং এটি নিজের স্বপ্ন পূরণ, নতুন কিছু সৃষ্টি এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার...

বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটের সম্ভাবনা

লেখকঃ মালিহা মেহেজাবিন ফ্রিল্যান্সিং কী? ফ্রিল্যান্সিং হলো এমন একটি কাজের পদ্ধতি যেখানে একজন ব্যক্তি কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী চাকরি না করে স্বাধীনভাবে বিভিন্ন ক্লায়েন্টের জন্য কাজ...