লেখকঃ কাজী গণিউর রহমান
দেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা বাড়াতে সিঙ্গাপুরের সঙ্গে চতুর্থ সাবমেরিন (অন্তসাগরীয়) কেবল নেটওয়ার্কে যোগদানের বিষয়ে আলোচনা করছে বাংলাদেশ—এ কথা জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফাইজ আহমদ তইয়ব (Faiz Ahmad Taiyeb)। ১২ অক্টোবর আগারগাঁওয়ের আইসিটি বিভাগ কনফারেন্স রুমে সাংবাদিকদের মুখে এই তথ্য জানান।
তাইয়েব বলেন, “আমরা চতুর্থ সাবমেরিন কেবলের স্থাপনা নিয়ে সিঙ্গাপুর সরকারের প্রতি আমাদের আগ্রহ জানিয়েছি এবং তারা আমাদের সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।” তিনি আরও জানান, বিষয়টি ইতোমধ্যে সিঙ্গাপুর দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহের কাছে জানানো হয়েছে।
তৃতীয় কেবল — বাস্তবায়ন ও ক্ষমতা
তাইয়েব নিশ্চিত করেছেন যে, তৃতীয় সাবমেরিন কেবলের জন্য বাংলাদেশের অংশীদারিত্বের চুক্তিটি ইতিমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে। ওই কেবলের মোট ক্ষমতা হবে ১৭,০০০ Gbps এবং এটি ২০২৬ সালের মধ্যভাগ বা শেষভাগের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে চালু হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
প্রকল্পটি ২০২১ সালে শুরু হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কেবলটির এক প্রান্ত হবে কক্সবাজার এবং অন্য প্রান্ত থাকবে সিঙ্গাপুর ও ফ্রান্স—ফাইবার মাধ্যেমে সরাসরি কনেক্টিভিটি থাকায় বাংলাদেশ সরাসরি সিঙ্গাপুর, ভারত, জিবুতি ও ফ্রান্সের সাথে ডেটা আদানপ্রদান সক্ষম হবে। প্রকল্পে মোট বিনিয়োগ ধরা হয়েছে ৬৯৩ কোটি টাকা । প্রকল্পটির আগে নির্ধারিত শেষ মেয়াদ ছিল জুন ২০২৪; বাস্তবায়নের বিলম্বের কারণে ডেডলাইন পুনর্কথিত করে সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঝুঁকি — সমুদ্রপথে বাধা ও বিকল্প পথ
তইয়েব অতিরিক্তভাবে বলেন, সাম্প্রতিক হুতি বিদ্রোহের কারণে কিছু সমুদ্র পথ দিয়ে কেবল পোঁতা (laying) করতে অনুমতি বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। তাই — “প্রথমবারের মতো কোনো অংশ সাবমেরিন না রেখে নযরাত্মকভাবে স্থল-উপনাগর (terrestrial) পথের মাধ্যমে সৌদি আরবের মরু অঞ্চলের ওপর দিয়ে পোঁতা হবে এবং তারপর রেড সাগর (Red Sea) স্পর্শ করবে”—এই অস্থায়ী বা স্থায়ী বিকল্প পথে কেবল চলাচলের বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন তিনি।
এই উদ্ভবিক জটিলতার কারণে প্রকল্পকালের কিছু অংশে পরিকল্পনা পরিবর্তন এবং সীমিত রুট-পরিবর্তন করা হয়েছে। কোনো কোনো সেকশনে সমুদ্রপথে কেবল না পুঁতিয়ে স্থল-পথ ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে যাতে নিরাপত্তা ও অব্যাহত সেবা নিশ্চিত করা যায়।
কেন তৃতীয় ও চতুর্থ কেবল দরকার? — বিশ্লেষণ
তৃতীয় কেবলের ১৭,০০০ Gbps ক্ষমতা বাংলাদেশের ইন্টারনেট ইনফ্রাস্ট্রাকচারে বড় এক স্টেপ। এতে করে —
- ব্যান্ডউইথ বৃদ্ধিতে সরাসরি সুবিধা — বৃহৎ ডেটা ট্র্যাফিক (ক্লাউড সেবা, ভি-টুভি, আন্তর্জাতিক কনফারেন্সিং) দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য হবে।
- রিডান্ডেন্সি ও রিসিলিয়েন্স — একাধিক কেবল থাকলে কোনো এক রুট ভেঙে গেলেও ব্যাকআপ রুট দিয়ে সার্ভিস চালানো যাবে।
- ল্যাটেন্সি হ্রাস — সরাসরি রুট (বাংলাদেশ–সিঙ্গাপুর–ফ্রান্স) হলে ডেটার গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় কমে আসে; উচ্চ-মানের রিমোট সার্ভিস ও আইটি পরিকাঠামোর জন্য এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
চতুর্থ কেবলে যোগ দেওয়ার সম্ভাব্যতা থাকায় আরো বেশি রিজার্ভ ও প্রতিযোগিতামূলক কানেকটিভিটি আসতে পারে—এতে আন্তর্জাতিক ডেটা রুটিংয়ে বাংলাদেশের মুল্যমান বাড়বে এবং স্থানীয় আইটি/টেক সেক্টরের আন্তর্জাতিক সংযোগ আরও মজবুত হবে।
সময়রেখা ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি
- প্রকল্পটি ২০২১ সালে শুরু; মূলত ২০২৪ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবায়ন বিলম্বে সময় বাড়ানো হয়েছে। এখন বাণিজ্যিক অপারেশন ২০২৬-এর মাঝামাঝি বা শেষে শুরুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
- সরকারি সূত্রে প্রকল্পের বিনিয়োগ নির্ধারিত ৬৯৩ কোটি টাকা।
সরকার ও আইসিটি বিভাগে পরবর্তী ধাপগুলো
আইসিটি বিভাগের কনফারেন্স-রুমে আলোচনায় তাইয়েব জানিয়েছেন—সিঙ্গাপুর ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে চতুর্থ কেবলে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক যোগাযোগ ইতোমধ্যে চালানো হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে কেবলের রুট, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত প্রভাব ও অর্থনৈতিক মডেল চূড়ান্ত করা হবে।
চূড়ান্ত বিশ্লেষণ
বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক বিষয় (যেমন হুতি বিক্ষোভ) ও রুট-রেশনের জটিলতার মধ্যেও তৃতীয় কেবলের প্রকল্প চলমান ও চতুর্থ কেবলে যোগ দেওয়ার আলোচনা বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামোকে শক্তিশালী করার ইঙ্গিত দেয়। দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক কানেকশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ অনলাইন ব্যবসা, ক্লাউড সেবা ও রিমোট-ওয়ার্কারদের জন্য আরো লাভজনক কেন্দ্র হিসেবে বিকাশের সুযোগ পাবে—তবে রুট নিরাপত্তা, কৌশলগত আলTERNেটিভ (উদাহরণ: স্থল-পথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে) ও সময়নিষ্ঠ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই বাস্তব চ্যালেঞ্জ।
প্রাসঙ্গিক জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১। তৃতীয় সাবমেরিন কেবলের ক্ষমতা কত এবং কখন বাণিজ্যিকভাবে চালু হবে?
উত্তরঃ ক্ষমতা ১৭,০০০ Gbps; বাণিজ্যিক চালু হওয়ার লক্ষ্য মধ্য/শেষ ২০২৬।
প্রশ্ন ২। বাংলাদেশ চতুর্থ কেবলে যোগ দিতে কাদের সঙ্গে কথা বলছে?
উত্তরঃ প্রাথমিকভাবে সিঙ্গাপুর সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে; বিষয়টি সিঙ্গাপুর দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে।
প্রশ্ন ৩। ৬৯৩ কোটি টাকা কী উদ্দেশ্যে বরাদ্দ করা হয়েছে?
উত্তরঃ প্রকল্পের সাপোর্ট, কেবল স্থাপন, প্রযুক্তিগত বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়নে মোট বিনিয়োগ হিসেবে ধার্য করা হয়েছে।




