লেখকঃ নাওমী ইসলাম
বাংলাদেশে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত প্রকল্পগুলোর দুর্নীতির হার অতীতের তুলনায় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর এক প্রতিবেদনে প্রকাশ পাওয়ার পরে এই তথ্য উঠে এসেছে যে, গত ১৪ বছরে দেশের জলবায়ু তহবিলের প্রায় অর্ধেক বা ৫৪ শতাংশ অর্থই দুর্নীতির শিকার হয়েছে। এ দুর্নীতির ফলে প্রায় ২ হাজার ১১ কোটি টাকার বেশি অর্থ অপচয় হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশে জলবায়ু তহবিল দুর্নীতির ইতিহাস ও পরিসংখ্যান
২০০৩ সাল থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সময়কালে বাংলাদেশে জলবায়ু তহবিলের আওতায় মোট ৮৯১টি প্রকল্পে দুর্নীতির প্রাক্কলিত পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪৮.৪ মিলিয়ন ডলার বা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২ হাজার ১১৬ কোটি টাকা. এই অর্থের অর্ধেকেরও বেশি দুর্নীতির মাধ্যমে অপচয় হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যা দেশের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সঙ্গে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
দুর্নীতির কারণ ও প্রভাব
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই দুর্নীতির পেছনে মূল কারণ হলো রাজনৈতিক প্রভাব, যোগসাজশ ও স্বজনপ্রীতি। প্রকল্প অনুমোদনে রাজনৈতিক বিবেচনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, যেখানে প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বিশেষ করে, ট্রাস্টি বোর্ড ও কারিগরি কমিটিতে যোগসাজশের মাধ্যমে বরাদ্দকৃত অর্থের অপচয় ঘটেছে।
এছাড়া, প্রকল্পের বাস্তবায়ন লম্বিত হওয়ার কারণে দীর্ঘায়িত হয়েছে, যা প্রকল্পের গুণগত মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রায় ৬২% প্রকল্পের সময়ের ব্যাপক বৃদ্ধি এবং কিছু প্রকল্পের বাস্তবায়ন ৪ বছরের পরিবর্তে ১৪ বছর পর্যন্ত বিলম্বিত হয়েছে। এর ফলে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় ব্যাপক অক্ষমতা সৃষ্টি হচ্ছে।
অর্থনৈতিক চাহিদা ও বাস্তবতা
বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি মোকাবিলার জন্য বার্ষিক প্রয়োজন অর্থের পরিমাণ হলো ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার, যেখানে সরকারের পক্ষ থেকে ২০১৫ থেকে ২০২৩ মানুষ বছরে মাত্র ৮৬.২ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এটি প্রয়োজনের প্রায় ০.৭ শতাংশ, অর্থাৎ খুবই অপ্রতুল। আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে আগামী অর্থায়নের পরিমাণও বৃদ্ধি পেলেও, তা এখনও দেশের চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়।
সার্বিক চিত্র ও সমাধানের পথ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই দুর্নীতি ও অপচয় রোধের জন্য গণব Rush, স্বচ্ছতা, এবং জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করতে হবে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত জরুরি ভিত্তিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, সরাসরি অর্থের গোপন ও অবিশ্বাস্য ব্যবহারে মনোযোগ দেয়া। এছাড়া, আন্তর্জাতিক সহায়তা ও তহবিলের ব্যবস্থাপনা আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
উপসংহার
বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলে সরকারের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও অর্থায়নে দুর্নীতির হার কমানোর জন্য ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক মনোযোগ বাড়ছে। প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জনজাগরণ সৃষ্টির মাধ্যমে দেশকে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব থেকে রক্ষা করে টেকসই উন্নয়ন অর্জনে আরও উদ্যোগী হতে হবে। অন্যথায়, দুর্নীতি বৃদ্ধির ফলস্বরূপ দেশের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ভবিষ্যত পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
বিশ্লেষণ ও গবেষণার ভিত্তিতে এই পরিস্থিতি দেশের জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে, যেখানে দুর্নীতির প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে না আসলে জলবায়ু ক্ষতি মোকাবিলার লক্ষ্যে গৃহীত উদ্যোগের ফলপ্রসূতা বজায় থাকবে না।
আরো পড়ুনঃ বিজনেস ইনসাইডারে বাংলাদেশের ডিজিটাল ফাইন্যান্স আইকন—বিকাশ
কিছু সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন: বাংলাদেশে জলবায়ু তহবিল থেকে কত টাকা দুর্নীতি হয়েছে?
উত্তর: গত ১৪ বছরে জলবায়ু তহবিল থেকে প্রায় ২ হাজার ১১০ কোটি টাকা (২৪৮.৪ মিলিয়ন ডলার) দুর্নীতি হয়েছে বলে টিআইবি রিপোর্টে জানানো হয়েছে
প্রশ্ন: কত শতাংশ প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে?
উত্তর: জাতীয় জলবায়ু তহবিলের ৫৪ শতাংশ বরাদ্দ দুর্নীতির শিকার হয়েছে এবং ৮৯১টি প্রকল্পের মধ্যে ৫৪৯টি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে
প্রশ্ন: দুর্নীতির সবচেয়ে বড় কারণ কী?
উত্তর: রাজনৈতিক প্রভাব, যোগসাজশ, স্বজনপ্রীতি এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে অকার্যকর ব্যবস্থা প্রধান কারণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে
প্রশ্ন: বাংলাদেশে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় কত অর্থের প্রয়োজন?
উত্তর: বাংলাদেশকে প্রতি বছর প্রায় ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন, কিন্তু ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত গড়ে মাত্র ৮৬.২ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ পেয়েছে, যা মাত্র ০.৭%
প্রশ্ন: প্রকল্প কত দিন সময় নেয় পূর্ণ করতে?
উত্তর: প্রকল্পের গড় সময় ৬৪৮ দিন থেকে বেড়ে ১,৫১৫ দিন হয়েছে, কেউ কেউ ৪ বছরের প্রকল্প ১৪ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছে
তথ্যসূত্র





