লেখকঃ কাজী গণিউর রহমান
বাংলাদেশে সরকারি ঋণ এক নতুন মাইলফলক পেরিয়ে গেছে — জুন ২০২৫’র মাঝামাঝি সময়ে ঋণের পরিমাণ ২১.৪৪ ট্রিলিয়ন (প্রায় ২১ লাখ কোটি) টাকার দোরগোড়ায় পৌঁছেছে। হিসাব বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত বুলেটিন থেকে এমন তথ্য পাওয়া যায়। এই ঋণ বৃদ্ধি দেশের বাজেট ও অর্থনৈতিক স্থিতি-চিন্তার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত, কারণ ঋণ মাত্রা বৃদ্ধি পেলে দেশটির অর্থায়ন, ঋণ-পরিশোধ এবং ভবিষ্যৎ উদ্ভাবন প্রকল্পগুলোর জন্য চাপ সৃষ্টি করবে।
ঋণ বৃদ্ধির কারণ ও বিশ্লেষণ
রাজস্ব সংগ্রহে ঘাটতি
সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে রাজস্ব সংগ্রহে ধীরগতি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের আয় পর্যাপ্ত গতিবেগ পাচ্ছে না। এই রাজস্ব ঘাটতির কারণে বাজেটের ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে এবং পরিচালনা ও উন্নয়ন ব্যয় চালাতে সরকার বৈদেশিক ঋণের ওপর অনেক বেশি নির্ভর করছে। এই ঘাটতি “ফিসকাল স্পেস” অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির স্থিশীলতা বা অর্থনৈতিক সামাঞ্জস্যতার উপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলেই সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি বা কর হ্রাস করার ক্ষমতাকে সংকুচিত করে, ফলে নতুন উন্নয়ন-প্রকল্প নেওয়ার সুযোগ হ্রাস পাবে।
বড় মেগাপ্রকল্পে ব্যয়
উন্নয়ন-প্রকল্পগুলোতে বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা যায় ব্যয় খুব বেশি, বিশেষ করে অনেকগুলো “মেগা” প্রকল্পে, যেমন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ঢাকা মেট্রোরেল, মাতার বাড়ি কয়লা-বিদ্যুৎ প্রকল্প। এই প্রকল্পগুলোর অর্থায়নের জন্য সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ করেছে। প্রকল্পগুলোর সম্ভাব্য লাভ এবং সামাজিক প্রভাব থাকলেও, তাদের ব্যয় ও ঝুঁকির পরিধি ব্যাপক যা বাজেট ও ঋণের উপর চাপ যুক্ত করছে।
অভ্যন্তরীণ ঋণের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি
শুধু বিদেশি নয়, অভ্যন্তরীণ ঋণও গত এক বছরে প্রায় ১১ % বেড়েছে । জুন ২০২৫ এ অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১১.৯৫ ট্রিলিয়ন টাকায়। অভ্যন্তরীণ উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে ট্রেজারি বন্ড, ট্রেজারি বিল এবং স্থানীয় ব্যাংক যেগুলোর ওপর সরকার নির্ভর করছে যেন আভ্যন্তরীণ বাজেট ঘাটতি পূরণ করতে পারে।
ব্যাংক ঋণের ওপর চাপ
সরকার অত্যধিকভাবে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকেও ঋণ সহায়তা নিচ্ছে। FY25-এর প্রথম প্রায় ১১ মাসে ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ১,০৮,৩৭১ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ে তুলনায় প্রায় ৫৭% বেশি। এটি বোঝায় যে সরকার ব্যাংকিং সেক্টরকে ঋণ-চাহিদার একটি প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহার করছে।
তবে একটি হিসাব পরিবর্তনও হয়েছে; Ways and Means Advances (WMA) ও Bangladesh Bank-এর Overdraft (OD) এখন অভ্যন্তরীণ ঋণের হিসাবের মধ্যে গন্য করা হচ্ছে। এই পরিবর্তন স্বীকৃত কারণে অভ্যন্তরীণ ঋণে প্রায় ৫৬,৪৯৫ কোটি টাকা বৃদ্ধি দেখা গেছে।
সুদ পরিশোধ সৃষ্ট চাপ
যখন ঋণের পরিমাণ বাড়ে, সুদ পরিশোধের বোঝাও দ্রুত বৃদ্ধি পায়। গত অর্থবছরে (২০২৪–২০২৫) সরকারের মোট সুদ খরচ ছিল ১,৩২,৪৬০ কোটি টাকা — বর্তমানে যা প্রায় ১৭% বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈদেশিক ঋণের সুদ প্রায় ২১% ও অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ প্রায় ১৬% বেড়েছে । এই দ্রুত সুদ বেড়ে যাওয়া ভবিষ্যতে বাজেটকে ভারী ভাবে প্রভাবিত করতে পারে, কারণ বাজেটে নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের জায়গা কমে আসবে যখন সুদ পরিশোধের মাত্রা বৃদ্ধিপায়।
হিসাব-প্রক্রিয়া ও নীতিগত ব্যবস্থাপনায় প্রতিবন্ধকতা
অর্থ বিভাগের ঋণ ব্যবস্থাপনায় এখনই একাগ্রতা ও সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। বিভিন্ন দফতরে দায়িত্ব ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকায় তথ্য ঘাটতি এবং সমন্বয়হীনতা দেখা দিচ্ছে। এই সমস্যা মোকাবিলায় (Unified) Debt Management Office (DMO) গঠনের প্রস্তাব রয়েছে, যা ঋণের ধরন, ঝুঁকি এবং পরিশোধ পরিকল্পনাকে একত্রীকরণ করবে। এটি গঠনের মাধ্যমে যাতে ঋণের তথ্য সুসংগঠিত বিশ্লেষণ করা যায়, এবং ভবিষ্যতে নতুন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।
নীতিগত সুপারিশ (রোডম্যাপ)
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমান ঋণ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সুসংহত নীতিগত পদক্ষেপ জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি একক Debt Management Office (DMO) গঠন করা, যা ঋণ সংগ্রহ, পরিশোধ পরিকল্পনা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং তথ্য সমন্বয় এক জায়গায় পরিচালনা করবে। এতে ঋণের ধরন, সুদের হার, গ্রেস পিরিয়ড এবং পরিশোধ সক্ষমতা মূল্যায়ন করা সহজ হবে। পাশাপাশি রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং কর ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন অপরিহার্য। রাজস্ব ঘাটতি কমানো গেলে সরকারের ঋণের ওপর নির্ভরতা স্বভাবতই হ্রাস পাবে।
অর্থনীতিবিদরা আরও মনে করেন, নতুন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে বিস্তারিত খরচ-সুফল বিশ্লেষণ (Cost-Benefit Analysis) বাধ্যতামূলক করা উচিত। এতে প্রকল্পের আর্থিক ও সামাজিক রিটার্ন স্পষ্টভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হবে এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এড়ানো যাবে। রপ্তানি খাত শক্তিশালী করা ও প্রযুক্তিমুখী নতুন বিনিয়োগ উৎস তৈরি করে দেশের আয়ের ভিত্তি বৈচিত্র্যময় করতে হবে, যাতে বৈদেশিক ঋণের ঝুঁকি কমে। একই সঙ্গে ঋণ গ্রহণের সময় শুধুমাত্র অর্থের পরিমাণ নয়, বরং ঋণের শর্ত—সুদের হার, সময়সীমা, গ্রেস পিরিয়ড—অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
জুন ২০২৫ পর্যন্ত সরকারের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ২১.৪৪ ট্রিলিয়ন টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি। এই ঋণ বৃদ্ধির মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজস্ব ঘাটতি, বড় মেগা প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয়, এবং একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় উৎস থেকে ঋণ গ্রহণের প্রবণতা। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো বিদেশি নন-কনসেশনাল ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, যেখানে সুদের হার তুলনামূলক বেশি এবং পরিশোধ সময়ও সীমিত। এর ফলে সুদ পরিশোধের চাপ বাজেটকে ক্রমশ সংকুচিত করছে এবং নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের সুযোগ কমে আসছে। সবশেষে, একটি সমন্বিত ঋণ ব্যবস্থাপনা কাঠামো, DMO গঠন, এবং রাজস্ব সম্প্রসারণ ছাড়া দায়িত্বশীল ও টেকসই ঋণ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
পরিশেষে, বাংলাদেশের ঋণ গতানুগতিক মাত্রা পেরিয়ে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। এটি শুধু একটি পরিসংখ্যানগত ঘটনা নয় — এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। নীতিনির্ধারকরা ইতিমধ্যেই দৃষ্টিকোণ পরিবর্তন এবং গঠনমূলক পদক্ষেপ পরিকল্পনা করছেন, যেমন DMO গঠন এবং রাজস্ব সংগ্রহ উন্নয়ন। যাইহোক, এসব পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে রাজনৈতিক সংকল্প, দক্ষতা, এবং দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গা অপরিহার্য।
প্রাসঙ্গিক জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্নঃ ২১ ট্রিলিয়ন টাকার ঋণ কি খুব বেশি?
উত্তরঃ এটি একটি বড় পরিমাণ, এবং ঋণ-GDP এবং ঋণ-পরিশোধ বোঝার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি গুরুত্বপূর্ণ। যদিও IMF এখনও দেযোগ্য “সতর্কতার সীমানার” মধ্যে বলেছে, কিন্তু ঋণ বৃদ্ধির গতি এবং ঋণের গঠন উদ্বেগ তৈরি করছে।
প্রশ্নঃ সরকার কিভাবে ও কাদের থেকে এত ঋণ নিচ্ছে?
উত্তরঃ অভ্যন্তরীণ উৎস হিসেবে ট্রেজারি বন্ড, ট্রেজারি বিল এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি অংশে রয়েছে মেগা প্রকল্পের জন্য বহিরাগত ঋণ, যেগুলোর মধ্যে অনেকই নন-গ্রান্ট (কম অনুদান) প্রকৃতির।
প্রশ্নঃ এই ঋণ বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় কারণ কী?
উত্তরঃ রাজস্ব সংগ্রহ ধীরগতি, বড় প্রকল্পগুলোর জন্য ভারী ব্যয়, এবং বিদেশি ও অভ্যন্তরীণ উভয় উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার বেশি নির্ভরতা রয়েছে।
প্রশ্নঃ ঋণ বাড়লেও কি বাংলাদেশের জন্য এটা সমর্থনযোগ্য?
উত্তরঃ ভবিষ্যৎ ঝুঁকি রয়েছে — বিশেষ করে সুদ পরিশোধ ও নতুন ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে — তাই সতর্ক ও দৃষ্টিনির্ধারিত নীতি প্রয়োজন।
প্রশ্নঃ সরকারের ঋণ পরিচালনায় কোন পরিবর্তন আসছে?
উত্তরঃ হ্যাঁ, “Unified Debt Management Office (DMO)” গঠনের প্রস্তাব রয়েছে এবং রাজস্ব সংগ্রহ ও প্রকল্প যাচাই প্রক্রিয়া শক্তিশালী করার পরিকল্পনা চলছে।
তথ্যসূত্র
Amader Shomoy, ২১ ট্রিলিয়ন টাকার ঋণ: রাজস্ব ঘাটতি ও বড় প্রকল্পে চাপ বাড়ছে.





