ঢাকা, ২৪ মে ২০২৬ — দ্য ডেইলি কর্পোরেট ডেস্ক
দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু, রপ্তানি কার্যক্রমে গতি আনা এবং বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।
২৩ মে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানান, “উৎপাদন ও কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার” কর্মসূচির আওতায় নেওয়া এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
এই প্যাকেজের আওতায় ৪১ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন হিসেবে ব্যবহৃত হবে এবং বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে সরবরাহ করবে।
প্রণোদনা প্যাকেজের কাঠামো
এই প্যাকেজটি মূলত দুইটি অংশে বিভক্ত:
পুল–১: পুনঃঅর্থায়ন তহবিল (৪১,০০০ কোটি টাকা)
| খাত | বরাদ্দ (কোটি টাকা) | উদ্দেশ্য |
|---|---|---|
| বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত | ২০,০০০ | কারখানা পুনরায় চালু |
| ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) | ৫,০০০ | স্বল্প সুদে অর্থায়ন |
| কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি | ১০,০০০ | উৎপাদন বৃদ্ধি |
| কৃষি হাব | ৩,০০০ | সরবরাহ চেইন উন্নয়ন |
| রপ্তানি বৈচিত্র্য | ৩,০০০ | নতুন বাজার সম্প্রসারণ |
পুল–২: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল (১৯,০০০ কোটি টাকা)
| খাত | বরাদ্দ (কোটি টাকা) |
|---|---|
| প্রি-শিপমেন্ট অর্থায়ন | ৫,০০০ |
| ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প | ৫,০০০ |
| প্রবাসী কর্মসংস্থান | ১,০০০ |
| বেকারদের কর্মসংস্থান | ১,০০০ |
| গ্রামীণ কার্যক্রম | ১,০০০ |
| সবুজ পণ্য | ১,০০০ |
| স্টার্টআপ | ৫০০ |
| চিংড়ি ও মাছ রপ্তানি | ২,০০০ |
| চামড়া ও জুতা শিল্প | ২,০০০ |
| সৃজনশীল অর্থনীতি | ৫০০ |
সুদের হার কাঠামো
এই প্যাকেজে উদ্যোক্তাদের জন্য তুলনামূলকভাবে কম সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে:
- সাধারণ শিল্প খাত: সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ
- বৃহৎ শিল্প: ৭ শতাংশ
- নতুন উদ্যোক্তা (স্টার্টআপ): ৪ শতাংশ
কেন এই প্রণোদনা?
বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের কাঠামোগত সমস্যা দেখা দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে:
- খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি
- বিনিয়োগে অনাগ্রহ
- বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া (৪.৭ শতাংশে নেমে আসা)
- কিছু ব্যাংকে অতিরিক্ত তারল্য থাকলেও তা ব্যবহার না হওয়া
এই পরিস্থিতিতে অব্যবহৃত অর্থকে উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত করাই এই প্যাকেজের মূল লক্ষ্য।
কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এই প্যাকেজের মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- কৃষি ও গ্রামীণ খাত: প্রায় ৯ লাখ
- এসএমই খাত: প্রায় ৫ লাখ
- বন্ধ শিল্প: প্রায় ২ লাখ
- ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প: প্রায় ২ লাখ
- প্রবাসী কর্মসংস্থান: প্রায় ১ লাখ
ব্যাংকারদের মতামত
শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই স্কিম ব্যাংকগুলোর জন্য আকর্ষণীয় হলেও ঋণ পুনরুদ্ধারের ঝুঁকি বিবেচনায় রাখতে হবে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, কেবল অর্থায়ন দিয়ে শিল্প খাত সচল করা সম্ভব নয়; নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ
ফাহমিদা খাতুন বলেন, বড় অঙ্কের অর্থ প্রবাহ স্বল্পমেয়াদে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করতে পারে, তবে কর্মসংস্থান বাড়লে এর ইতিবাচক প্রভাবও দেখা যাবে।
মুস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করে বলেন, সব বন্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করা সম্ভব নয়। তাই সম্ভাবনাময় খাত ও প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
৬০ হাজার কোটি টাকার এই প্রণোদনা প্যাকেজ দেশের শিল্প ও কর্মসংস্থান খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে সঠিক বাস্তবায়ন, তদারকি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিবেশ উন্নয়নের ওপর।



