দ্য ডেইলি করপোরেট ডেস্ক
ঢাকা, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬:
দেশের অর্থনীতিতে দ্রুত গতি ফেরার সম্ভাবনা কম। সামনের দিনগুলোতে প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক দুর্বল থাকার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতিও উচ্চ পর্যায়ে থাকবে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের জন্য প্রকাশিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রথম ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি বিবৃতিতে (MPS) অর্থনীতির এই চিত্র উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, দেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর পথে থাকলেও সংকট-পূর্ব সময়ের প্রবৃদ্ধির ধারায় দ্রুত ফিরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।
বিশ্বব্যাংক চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬০ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) সম্প্রতি তাদের পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এসব পূর্বাভাস অর্থনীতির প্রত্যাশার চেয়ে দুর্বল গতিশীলতা এবং সামনে থাকা অনিশ্চয়তার বিষয়টি স্পষ্ট করছে।
বিনিয়োগ ও রপ্তানিতে দুর্বলতা
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বিভিন্ন উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সি সূচক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অর্থনীতিতে শক্তিশালী পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে হলে কয়েকটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি সরবরাহের উন্নতি, ব্যবসায়ীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, রপ্তানি চাহিদা বাড়ানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত করা।
বিশেষ করে উৎপাদন খাতে নতুন বিনিয়োগ বাড়ানোকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সরকারের নতুন প্রণোদনা প্যাকেজ এবং পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করতে পারে। তবে এর সুফল অনেকটাই নির্ভর করবে এসব কর্মসূচি কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ কতটা কার্যকরভাবে বিতরণ করা যায় তার ওপর।
কমলেও মূল্যস্ফীতির চাপ থাকবে
খাদ্য সরবরাহ পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমতে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে সুদহার ও বিনিময় হারসংক্রান্ত পদক্ষেপের মাধ্যমে চাহিদাজনিত ও ব্যয়জনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
তবে মূল্যস্ফীতি কমার গতি নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বিশেষ করে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি, মানুষের উচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশা, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ঊর্ধ্বগতি ও অস্থিরতা এবং সম্প্রতি সমন্বয় করা জ্বালানি দামের প্রভাব মূল্যস্ফীতিকে চাপে রাখতে পারে।
এ ছাড়া জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়ন হলে মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি সরকারের আর্থিক ব্যয়ের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যে টেকসইভাবে ফিরতে হলে সাময়িকভাবে মূল্যস্ফীতি কমানো যথেষ্ট নয়; এর জন্য অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যাপকভিত্তিক মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।
একসঙ্গে বাড়তে পারে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি
সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ঝুঁকির পাল্লা দুর্বল প্রবৃদ্ধি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির দিকেই বেশি বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বৈশ্বিক পরিস্থিতিও এ ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়া, হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্যিক বিঘ্ন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের দাম বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর মুদ্রানীতি—এসব কারণে একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কমে যেতে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে।
দেশীয় ক্ষেত্রেও রয়েছে বেশ কিছু ঝুঁকি। এর মধ্যে জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, আবহাওয়াজনিত কৃষি ঝুঁকি, সরকারের রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা, সরকারি ঋণ বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব ব্যয়ের চাপ এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে ধীরগতি উল্লেখযোগ্য।
এর সঙ্গে উচ্চ খেলাপি ঋণও অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
প্রবৃদ্ধি বাড়াতে কাঠামোগত বাধা কাটানোর তাগিদ
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানো, তবে একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়াকে যেন বাধাগ্রস্ত করা না হয়।
এ জন্য নতুন প্রণোদনা প্যাকেজ ও লক্ষ্যভিত্তিক পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর করার ওপর জোর দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বিশেষ করে জ্বালানি, অবকাঠামো ও সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা দূর না হলে টেকসই উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হবে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ ছাড়া সরকারি ব্যয় ও পুঁজিবাজারের বিভিন্ন কার্যক্রমের কারণে অর্থবাজারে যে চাপ তৈরি হচ্ছে, সেটিও নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন রয়েছে বলে মুদ্রানীতি বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।




