সেপ্টেম্বরের সময়সীমা ঘনিয়ে এলেও ঋণদাতাদের মধ্যে এখনো ঐকমত্য হয়নি। ঋণ শ্রেণিকরণ স্থগিত রাখার মেয়াদ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি চেয়েছে ব্যাংকগুলো।
বাংলাদেশের খাদ্য ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপ ঋণ শ্রেণিকরণের ঝুঁকিতে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ৩৬টি ঋণদাতা ব্যাংক ঋণ ১২ বছরের জন্য পুনঃতফসিল এবং একই সঙ্গে অতিরিক্ত ৬ হাজার কোটি টাকা কার্যকরী মূলধন দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে এখনো একমত হতে পারেনি।
সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত সময়সীমা ঘনিয়ে আসায় ঋণ শ্রেণিকরণ ঠেকাতে স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি চেয়েছে ব্যাংকগুলো।
এই সময়সীমা বাড়ানো না হলে আগামী ১ অক্টোবর থেকে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ শ্রেণিকরণ হতে পারে। এর ফলে ব্যাংকগুলোকে বিপুল পরিমাণ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে, যা তাদের মুনাফার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।
একই সঙ্গে সিটি গ্রুপের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে রমজানের আগে ভোজ্যপণ্যসহ প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের সরবরাহে এর প্রভাব পড়তে পারে।
৬ হাজার কোটি টাকার নতুন অর্থায়নেই মূল বিরোধ
সিটি গ্রুপের প্রস্তাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অতিরিক্ত ৬ হাজার কোটি টাকা কার্যকরী মূলধন পাওয়া। তবে বিদ্যমান ঋণগুলোই যখন চাপের মধ্যে রয়েছে, তখন নতুন করে অর্থায়ন করতে ব্যাংকগুলো অনাগ্রহ দেখাচ্ছে।
ওয়ান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহিত রহমান বলেন, অতিরিক্ত কার্যকরী মূলধন দেওয়া হলে বিদ্যমান ঋণের সুদ এবং নতুন ঋণ—দুটিই ভবিষ্যতে সমস্যায় পড়তে পারে। এ কারণেই বিষয়টি এখনো আটকে আছে।
একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ঋণ শ্রেণিকরণ এড়াতে সিটি গ্রুপকে নতুন করে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ রয়েছে। তবে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান না করে নতুন অর্থায়ন করলে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে সংকট সমাধানের বিভিন্ন পথ নিয়ে আলোচনা করেন। এর মধ্যে অতিরিক্ত অর্থায়নের বিষয়টিও ছিল।
তবে বৈঠকে গভর্নর স্পষ্ট করেছেন, সেপ্টেম্বরের সময়সীমা আর বাড়ানো হবে না। ঋণ পুনর্গঠন করা হবে, নাকি অন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ব্যাংকগুলোকে ১০ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে বলে বৈঠকে অংশ নেওয়া ব্যাংকাররা জানিয়েছেন।
রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে যাতে বড় ধরনের বিঘ্ন না ঘটে, সে জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সম্ভাব্য বিকল্প ব্যবস্থাও বিবেচনা করছে।
ব্যাংকারদের মতে, এর একটি সম্ভাব্য বিকল্প হতে পারে সেনা কল্যাণের মাধ্যমে পণ্য আমদানি করে সিটি গ্রুপের বিতরণ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা। এ ছাড়া সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোও সিটি গ্রুপকে সহায়তার জন্য বিশেষ সুবিধা দিতে পারে।
সরবরাহ ইতোমধ্যে কমেছে
মার্চ থেকে পর্যাপ্ত ঋণপত্র বা এলসি খুলতে না পারায় সিটি গ্রুপের পণ্য সরবরাহ ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি বাজারের একটি অংশ হারিয়েছে।
সিটি গ্রুপের বহুল পরিচিত TEER ব্র্যান্ডের অধীনে ভোজ্যতেল, আটা, ময়দা, সুজি, চাল, ডাল, চিনি, গুঁড়া দুধ ও পশুখাদ্যসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাজারজাত করা হয়।
ঋণ পুনঃতফসিলের প্রস্তাবে সিটি গ্রুপ জানিয়েছে, গত বছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে তাদের বিক্রি কমে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকায় নেমেছে। এর আগে বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা।
গ্রুপটি আরও জানিয়েছে, আর্থিক সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোতে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার কার্যকরী মূলধন সীমা আটকে আছে, যা বর্তমানে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
ব্যাংকগুলোর অবস্থানও ভিন্ন
ওয়ান ব্যাংকের এমডি মুহিত রহমান বলেন, সিটি গ্রুপের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদ ও জামানত রয়েছে, যেগুলো বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব।
তার মতে, গ্রুপটির কিছু সম্প্রসারণ প্রকল্প এমন এলাকায় অবস্থিত যেখানে এখনো গ্যাস সংযোগ নেই। সরকার এসব এলাকায় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে ওই সম্পদগুলোর মূল্য ও বিক্রয়যোগ্যতা বাড়তে পারে।
তিনি আরও জানান, সিটি গ্রুপের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে প্রায় ২৫ কোটি ডলার পর্যন্ত সাপ্লায়ার ফাইন্যান্সিং পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এর জন্য একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করতে হবে।
মুহিত রহমান বলেন, বড় অঙ্কের নতুন ঋণ দেওয়ার বিষয়টি রাতারাতি অনুমোদন করা সম্ভব নয়। এ জন্য ব্যাংকগুলোকে নিজ নিজ পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নিতে হচ্ছে।
তার মতে, এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো ব্যবসা সচল রাখার মতো পর্যাপ্ত কার্যকরী মূলধন নিশ্চিত করা।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সিটি গ্রুপের ঋণ শ্রেণিকরণ হলে ব্যাংকগুলোকে সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত প্রভিশন রাখতে হবে, যা ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় চাপ তৈরি করবে এবং মুনাফায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকগুলো পৃথকভাবে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করছে। পাশাপাশি নিরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য কাজও সম্পন্ন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো নিজ নিজ পর্যায়ে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করছে।
এদিকে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ঋণ শ্রেণিকরণের স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন জানিয়েছে। একই সঙ্গে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঠেকাতে সাময়িক কিছু ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
সম্পদ বিক্রির দাবি ব্যাংকগুলোর
ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হুসেইন বলেন, ঋণদাতারা সিটি গ্রুপের ঋণ পুনঃতফসিল করতে আগ্রহী। তবে প্রতিষ্ঠানটিকে কিছু সম্পদ বিক্রি করে সেই অর্থ দিয়ে বিদ্যমান দায় পরিশোধ করতে হবে।
তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো ঋণ পুনঃতফসিলে রাজি থাকলেও সম্পদ বিক্রি করে দায় কমানোর বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সিটি গ্রুপ অবশ্য বিদ্যমান দায় পরিশোধের জন্য সম্পদ বিক্রির পরিবর্তে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে অতিরিক্ত ৬ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে।
সোহেল জানান, অতিরিক্ত ঋণের বিপরীতে সিটি গ্রুপ ব্র্যান্ডমূল্যের সমপরিমাণ প্রায় ৩০ শতাংশ জামানত দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে ইতোমধ্যে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়া একটি প্রতিষ্ঠানে নতুন করে আরও ঋণ দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
তার মতে, প্রথমে একটি বিশ্বাসযোগ্য পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার ভিত্তিতে বিদ্যমান ঋণ পুনর্গঠন করতে হবে এবং সেই ঋণ পরিশোধের উৎসও স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে।
তিনি বলেন, গ্রুপটির যেসব সম্পদ বিক্রি করা সম্ভব, সেগুলোর মূল্যায়ন করে বিক্রির অর্থ দিয়ে ঋণ পরিশোধ করা উচিত। ঋণ পরিশোধের অর্থের উৎস অবশ্যই স্পষ্ট হতে হবে।
সোহেলের মতে, সিটি গ্রুপ আগামী দুই বছরে চার-পাঁচটি প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে বিদ্যমান দায় কমাতে পারে। বর্তমান ঋণের চাপ কমানোর পর ব্যাংকগুলো আলাদাভাবে গ্রুপটির কার্যকরী মূলধনের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করতে পারে।
সম্পদের মূল্যায়ন ও পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা
সিটি গ্রুপ তাদের আর্থিক অবস্থান পর্যালোচনা এবং পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার জন্য আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং (EY) এবং আরও একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিয়েছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রুপের বিভিন্ন কোম্পানির মূল্যায়ন করবে। এর মধ্যে যেসব ব্যবসায় অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ বা সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলোর সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্যও নির্ধারণ করা হবে।
এর আগে ব্যাংকারদের একটি বৈঠকে গঠিত কমিটিও এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় যুক্ত রয়েছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে প্রায় ছয় মাস সময় লাগতে পারে।
সিটি গ্রুপের প্রস্তাবিত পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা অনুযায়ী, হোসেন্দী ইকোনমিক জোনে থাকা ছয়-সাতটি বড় প্রকল্প বিক্রি করে ২০২৮ অর্থবছরের মধ্যে ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে।
এ ছাড়া জমি বিক্রি করে আরও প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে গ্রুপটি।
পাশাপাশি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে নতুন মূলধন সংগ্রহের পরিকল্পনাও জানিয়েছে সিটি গ্রুপ।




