লেখকঃ আফরোজ মজহার পূর্ণতা
বর্তমানে চাকরির বাজারে জব অ্যাপ্লিকেশন প্রক্রিয়া তুমুল প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে। অনেকাংশেই দেখা যাচ্ছে, কয়েকটি চাকরিতে একসাথে আবেদন করেও কোনোটি থেকেই ইতিবাচক রেসপন্স পাওয়া যাচ্ছে না ! এই এত শত আবেদনকারীর মধ্যে কিভাবে তাহলে কাঙ্খিত প্রার্থী বাছাই করা হয় ? এখানেই Automated Resume Screening বা ATS ( Application Tracking System ) মূল প্রভাবক,যা কিনা একটি বিশেষ প্রযুক্তি মাত্র। এটি সাধারণত রিত্রুইটার এর সময় সাশ্রয় এবং চাকরি আবেদনকারীদের ফিল্টারিং করতে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ একে AI Powered Resume Screening System বলা যেতে পারে।
প্রশ্ন আসে,এই Automated Resume Screening কি একজন চাকরি প্রার্থীর জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠবে?নাকি স্মার্টলি নিজেকে প্রস্তুত করে সহজেই চ্যালেঞ্জ পার করবেন তা নিয়ে থাকছে বিস্তারিত আলোচনা।
Automated Resume Screening আসলে কি
ধরুন একটি চাকরির ভ্যাকেন্সি পোস্ট এর জন্য শ কয়েক বা হাজারটি আবেদন আসলো । একজন রিত্রুইটার তখন তার সময় বাঁচিয়ে Best Candidate যাচাই করতে চাইবেন। এর জন্য তিনি এমন একটি AI Powered Software এর দ্বারস্থ হবেন যা অধিক সংখ্যক আবেদনকারীদের মধ্যে সঠিক প্রার্থীদের নির্বাচন করবে। এই সফটওয়ারটি হলো ATS বা অটোমেটেড রিজিউম স্ক্রিনিং। এক্ষেত্রে ATS বিশেষ কিছু Keywords বা ফরম্যাটিং ব্যবহার করে থাকে । কোনো সিভি যদি এই কীওয়ার্ড ম্যাচ করে তাহলেই রিজিউম স্ক্যান করে রিত্রুইটার এর কাছে পাঠানো হয়।
আরো পড়ুন : ক্যারিয়ার সুইচের জন্য স্কিল শেখার রোডম্যাপ – সফলতার সঠিক ধাপগুলো
ATS যেভাবে চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, গতানুগতিক ধারার ফিল্টারিং প্রসেস থেকে বের হয়ে এসে HR Board এখন অটোমেটেড রিজিউম স্ক্যানিং ব্যবহারে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। ইউএসএ ভিত্তিক শীর্ষ ৫০০টি কোম্পানির ওপর পরিচালিত সার্ভে থেকে জানা যায়,৯০ শতাংশের অধিক প্রতিষ্ঠান ATS System ব্যবহার করছে। এক্ষেত্রে চাকরি প্রত্যাশীদের অনেকেই এই প্রযুক্তি সম্পর্কে কিছুই না জেনে বাদ পরে যাচ্ছেন, যা নতুন ধরণের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে যেমন-
- সঠিক দক্ষতা থাকলেও বাদ পড়া : কিওয়ার্ড এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে নিজের স্কিল উপস্থাপন না করলে।
- রেজুমে কাস্টমাইজেশনের চাপ : যেহেতু ভিন্ন ভিন্ন চাকরির রিকোয়ারমেন্ট আলাদা,তাই নিজের সিভিকে কাস্টমাইজ করতে হয়। একটি সিভি দিয়ে সব প্রতিষ্ঠানে আবেদন করলে ATS প্রযুক্তিতে বাদ পরে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
- ATS সফটওয়্যার সম্বন্ধে অজ্ঞতা : Greenhouse , Lever ইত্যাদি সফটওয়্যার কিভাবে কাজ করে তা সম্পর্কে ধারণা না থাকলে সিভি ব্যাকডেটেড হয়ে যায়।
ম্যানুয়াল পরিশ্রম কমিয়ে সঠিক ক্যান্ডিডেট বাছাই করতে ATS ক্রমেই প্রতিষ্ঠানগুলোতে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তাই চাকরি প্রত্যাশীদের অতি সত্তর নিজেকে এই প্রযুক্তির সাথে মানিয়ে নিতে হবে।
আরো পড়ুন : ডিজিটাল সিভি বানানো থেকে AI বটের ইন্টারভিউ—আপনি কতটা প্রস্তুত?
যেভাবে Automated Resume Screening অনুযায়ী নিজেকে প্রস্তুত করবেন
নিজের সিভিকে ATS ফ্রেন্ডলি করার কোনো বিকল্প নেই;এক্ষেত্রে জনপ্রিয় চাকরি আবেদনের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম INDEED কিছু টিপস প্রোভাইড করে,যা নিচে বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হলো –
- দিকনির্দেশনা মেনে চলুন – অনেক ক্ষেত্রে রিত্রুইটার প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা বা Instruction Guideline দিয়ে রাখেন। চেষ্টা করতে হবে এগুলো মেনে সিভি টেইলরিং করা যাতে ATS Filtering সফলভাবে পাশ করা যায়। এছাড়া, microsoft document ফর্মে সিভি আপলোড করুন যাতে ATS সহজেই আপনার সিভি যাচাই করতে পারে।
- কিওয়ার্ড সামঞ্জস্য বজায় রাখুন – জব ডেস্ক্রিপশনে যে ধরণের স্কিল বা দক্ষতা প্রত্যাশা করে ঠিক সেই শব্দ সমূহ আপনার সিভিতে উল্লেখ করুন। ফলে ফিল্টারিং পর্ব পার করা সহজ হয়।
- সিম্পল ফরম্যাটিং এবং Acronyms ব্যবহার – টেবিল,হেডার বা চার্ট ব্যবহারে ট্র্যাকিং সিস্টেম বাধা পেতে পারে। তাই সহজ ফরম্যাটিং মেইনটেইন করে সিভি তৈরী করুন। তাছাড়া সিভিতে কিছু শব্দের শর্ট ফর্ম অর্থাৎ acronym ব্যবহার করলে ATS তা ফিল্টার করে আপনার সিভি সিলেক্ট করে ফেলবে।
- কাস্টমাইজড সিভি – প্রত্যেকটি চাকরি পদের জন্য আলাদা রিকোয়ারমেন্ট থাকে, তাই ATS সফটওয়্যার সেই অনুযায়ী সিভি বাছাই করে। অবশ্যই দিকনির্দেশনা পরে উপযুক্ত সিভি তৈরী করতে হবে এবং একটি সিভি সব চাকরিতে আবেদন করতে ব্যবহার করা পরিহার করতে হবে।
- পূর্ব অভিজ্ঞতাকে উপস্থাপনা – পূর্ব উপস্থাপনাকে ক্রমিকভাবে সাজিয়ে উপস্থাপনা করুন,এতে ATS এর যাচাইকৃত সিভির মধ্যে আপনারটিও থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
ATS কি চাকরি কঠিন করে তুলছে?
আমরা বলতে পারি ATS চাকরি আবেদনকে চ্যালেঞ্জিং করেছে আগের থেকে বহুগুন। একসময় একটি সিভি কয়েকটি চাকরির জন্য এপ্লিকেবল হলেও এখন সেই সুযোগটি নেই। তবে এটিও সত্যি যে বর্তমানে অধিকাংশ তরুণ এই প্রযুক্তি সম্পর্কে অজ্ঞ,যার ফলে নিজেকে প্রস্তুত করলে খুব দ্রুত চাকরির জন্য সিলেক্টেড হয়ে সম্ভব। যেহেতু এটি একটি সফটওয়্যার,তাই আপনি যদি টিপস মেনে আবেদন করে থাকেন,তবে আগের থেকেও সহজেই ইন্টারভিউ কল পেয়ে যেতে পারেন।
বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ATS
দেশে এখনো ম্যানুয়াল সিভি যাচাই অধিক জনপ্রিয়। তবে বহির্বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এখন Automated Resume Screening ধীরে ধীরে ব্যবহার শুরু হচ্ছে। নিচে যেসকল প্রতিষ্ঠান ATS ব্যবহার ছোট পরিসরে চালু করেছে তা দেওয়া হলো
- বহুজাতিক কোম্পানি (MNC) – যেমন Unilever, Nestlé, Grameenphone ইত্যাদি
- ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান – BRAC Bank, Standard Chartered, Eastern Bank ইত্যাদি
- টেক কোম্পানি – Pathao, Shohoz, bKash, Daraz ইত্যাদি
- NGO ও উন্নয়ন সংস্থা – BRAC, Save the Children ইত্যাদি।
ধারণা করা হচ্ছে আগামী দশ বছরের মধ্যে ATS Software আরো বড় পরিসরে ব্যবহৃত হবে, তাই প্রার্থীদের জন্য ATS-friendly resume তৈরি শিখে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে।
পরিশেষ
কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা এখন সকল ক্ষেত্রে নিজের কদর বাড়িয়ে তুলেছে,কমিয়েছে মানুষের ম্যানুয়াল পরিশ্রম। প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলো তাই ঝুঁকি এড়িয়ে ঝামেলাবিহীনভাবে যোগ্য প্রার্থীকে নিজেদের একজন করতে আটশ বা অটোমেটেড ব্যবহার শুরু করেছে। সকল প্রতিযোগিতা পেরিয়ে সফলভাবে চাকরির কল পেতে তাই নিজের সিভি ATS Friendly করা শিখতে হবে এখনই। প্রযুক্তি যতই অ্যাডভান্সড হোক, নিজের স্কিল এবং অভিজ্ঞতাকে প্রফেশনালভাবে উপস্থাপন করলে কয়েক ধাপ আগানো সম্ভব।
প্রশ্নোত্তর (FAQ)
১. Automated Resume Screening বা ATS আসলে কী?
ATS একটি সফটওয়্যার যা হাজারো আবেদন থেকে সঠিক প্রার্থী ফিল্টার করতে সাহায্য করে। এটি মূলত নির্দিষ্ট কীওয়ার্ড, স্কিল এবং ফরম্যাটের ভিত্তিতে রেজুমে স্ক্যান করে।
২. কেন অনেক প্রার্থী ATS-এ বাদ পড়ে যায়?
কারণ তারা প্রায়ই চাকরির বিজ্ঞাপনের সঙ্গে মিল রেখে সঠিক কীওয়ার্ড বা ফরম্যাট ব্যবহার করেন না কিংবা গ্রাফিক্স-ভিত্তিক জটিল রেজুমে তৈরি করেন যা ATS সহজে পড়তে পারে না।
৩. কীভাবে রেজুমেকে ATS-friendly করা যায়?
সহজ ফরম্যাট ব্যবহার করুন, চাকরির বিবরণ অনুযায়ী প্রাসঙ্গিক কীওয়ার্ড যুক্ত করুন এবং প্রতিটি চাকরির জন্য রেজুমে কাস্টমাইজ করুন।




