লিখেছেনঃ আফরোজ মজহার পূর্ণতা
কর্পোরেট অঙ্গনের বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক প্রেক্ষাপটে কর্মীর স্কিল ডেভেলপমেন্ট এখন টিকে থাকার একটি সফল কৌশল। বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তির আধিপত্য বেড়ে যাওয়ায় পরিবর্তিত বাজার পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে অনেক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান। অনেকেই বুঝতে পারছে যে এই মুহূর্তে Human Resource কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিকল্প নেই। তাই ইতিমধ্যে বিভিন্ন MNC বা স্টার্টআপগুলোতে নিজস্ব কর্মীদের জন্য প্রশিক্ষন কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। আজকের বিস্তারিত আলোচনায় থাকছে কি ধরণের প্রতিষ্ঠানগুলো স্কিল ডেভেলপমেন্ট উদ্যোগ নিয়ে থাকে তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা।
কেন কর্মীদের স্কিল ডেভেলপমেন্ট জরুরি?
কর্মীদের স্কিল ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে কোম্পানিগুলো প্রোডাক্টিভিটি,কানেক্টিভিটি, উদ্ভাবন এবং কর্মীদের সন্তুষ্টি বাড়াতে পারে। এর মাধ্যমে কর্মীদের মধ্যে চাকরির প্রতি আগ্রহ ও নিষ্ঠা বাড়ে, যা কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদী ধরে রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক।
- প্রোডাক্টিভিটি বৃদ্ধি : প্রয়োজনীয় বিভিন্ন স্কিল অর্জনের মাধ্যমে একজন কর্মী আগের চেয়ে যেকোনো কাজে আরো বেশি কন্ট্রিবিউট করতে পারে,অর্থাৎ প্রোডাক্টিভিটি বেড়ে যায় কয়েকগুন।
- আইডিয়া জেনারেশন : কোম্পানিকে আপডেটেড রাখতে এবং পরিবর্তিত বাজারে টিকিয়ে রাখতে নিত্যনতুন আইডিয়া সামনে আনতে হয়। এক্ষেত্রে একজন স্কিলড কর্মী বাকিদের থেকে এগিয়ে থাকে।
- গ্লোবাল কম্পিটিশনে টিকে থাকা : আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা থাকলে দেশ ছাড়িয়ে বাইরের দেশের বাজারেও প্রবেশ সম্ভব।
আরো পড়ুন : গুগলের সার্টিফিকেট কোর্সগুলো কিভাবে আপনার ক্যারিয়ার বদলাতে পারে?
কোন ধরণের কোম্পানি স্কিল ডেভেলপমেন্টে এগিয়ে?
ভিন্ন ভিন্ন সেক্টরে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে কর্মীদের স্কিল ডেভেলপমেন্টে জোর দেওয়া হয়। অনেকক্ষেত্রে বেসিক স্কিলগুলোর উপর ফোকাস কম দেওয়া হয় কারণ কর্মীরা চাকরিতে প্রবেশের পূর্বেই সেইসকল স্কিল অর্জন করে এসেছে।
১. মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি (MNCs) : Unilever, Grameenphone, BAT, Standard Chartered ইত্যাদি মাল্টিন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের কর্মীদের জন্য নিয়মিত training programs, leadership workshops, e-learning modules চালু করে। এই কর্মসূচির লক্ষ্য হলো কর্মীদের গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড লেভেলে নিয়ে আসা।
২. টেকনোলজি কোম্পানি : এই সেক্টরে কর্মীদের স্কিল ডেভেলপমেন্ট সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন কারণ আইটি ও টেলিকম সেক্টরের কোম্পানিগুলো নিয়োজিত পরিবর্তনের মধ্যে থাকে। তাই কর্মীদের AI, Data Analytics, Digital Marketing, Cybersecurity এর মতো স্কিলে ট্রেনিং দেওয়া হয়। যেমন Robi,bKash,Shohoz এ ধরনের প্রশিক্ষণে জোর দেয়।
৩. স্টার্টআপ কোম্পানি : স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের টিম সাধারণত সীমিত হয় এবং সবাইকে বহুমুখী স্কিল শিখতে হয়। এজন্য তারা on-the-job training, mentorship program, cross-functional learning এ বিনিয়োগ করে।
৪. শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান (Conglomerates) : দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান যেমন PRAN-RFL, Bashundhara, Square Groupতারা নিজস্ব training institute বা academy গড়ে তুলেছে। এর মাধ্যমে নিয়মিত টেকনিক্যাল, ম্যানেজেরিয়াল ও লিডারশিপ স্কিল প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আয়োজন করা হয়।
৫.ফিনটেক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান : আর্থিক খাতে ক্রমাগত নীতিগত ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ঘটছে। তাই ব্যাংক, ফিনটেক কোম্পানি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মীদের ডেটা অ্যানালাইসিস এবং নতুন আর্থিক প্রযুক্তির উপর প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।
কেন প্রতিষ্ঠানগুলো প্রশিক্ষণকে প্রাধান্য দেয়?
আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া একটি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের জন্য সময় ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। তবে স্কিল ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে একজন কর্মী দ্বিগুন হারে ইফেক্টিভ ভাবে কাজ করতে পারে যা দিনশেষে প্রতিষ্ঠানের জন্যই লাভমূলক। অর্থাৎ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের জন্য স্কিল ডেভেলপিং প্রোগ্রাম একটি ইনভেস্টমেন্ট যার রিটার্ন প্রফিট হলো কর্মীর সাফল্য। একটি সার্ভেতে জানা যায়, ৯০% প্রতিষ্ঠানের মতে তাদের পারফরম্যান্স উন্নত হয়েছে e-Learning ব্যবহারের ফলে।
আরো পড়ুন : Excel নাকি Power BI? কোন স্কিল আপনাকে ২০২৫ সালে এগিয়ে নেবে
কোন ধরণের সাপোর্ট পাওয়া সম্ভব ?
- E-learning প্ল্যাটফর্ম যেমন Udemy, Coursera, LinkedIn লার্নিং ইত্যাদি।
- ওয়ার্কশপ এবং সেমিনার
- মেন্টরশীপ প্রোগ্রাম
- Soft skill (কমিউনিকেশন, লিডারশিপ ইত্যাদি )
ভবিষ্যতে কি ধরণের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আসতে পারে ?
- হাইব্রিড : ইন হাউজ লার্নিং এর পাশাপাশি অনলাইনে প্রশিক্ষণ পরিচালনা।
- AI অপারেটেড : কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে কর্মসূচি বাস্তবায়ন।
- মাইক্রো লেসন : ছোট ছোট মডিউল আকারে প্রশিক্ষণ দেওয়া।
পরিশেষ
আজকের কর্পোরেট দুনিয়ায় স্কিল ডেভেলপমেন্টে সাপোর্ট দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো একটি স্মার্ট ইনভেস্টমেন্ট করছে যার ফলস্বরূপ Employer Branding এবং কর্মীদের সন্তুষ্ট আগের থেকে বেড়ে চলেছে। শুধুমাত্র দক্ষ কর্মীই নয়, দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজেদের টিকিয়ে রাখতেও স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের বিকল্প নেই। তাছাড়া কোম্পানির নিজস্ব স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করতে অবশ্যই কর্মীদের স্কিল সাপোর্ট দেওয়া প্রয়োজন,এতে কর্পোরেট ইমেজ বজায় থাকে।
প্রশ্নোত্তর (FAQ)
প্রশ্ন ১: বাংলাদেশে কোন সেক্টরে স্কিল ডেভেলপমেন্ট বেশি হয়?
উত্তর : IT, টেলিকম এবং FMCG সেক্টরে স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম তুলনামূলক বেশি।
প্রশ্ন ২: কর্মীরা কিভাবে নিজের স্কিল বাড়াতে পারে?
উত্তর : অনলাইন কোর্স, কোম্পানির ট্রেনিং, এবং মেন্টরশিপ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের মাধ্যমে।
প্রশ্ন ৩: স্কিল ডেভেলপমেন্টে বিনিয়োগ করলে কোম্পানির লাভ কী?
উত্তর : প্রোডাক্টিভিটি বৃদ্ধি, কর্মী ধরে রাখা এবং বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করা।
তথ্যসূত্র :
- International Labour Organization (ILO). (2020). Upskilling and reskilling for the future of work. Geneva: ILO.
- LinkedIn Learning. (2022). 2022 Workplace Learning Report: The skills companies need most. https://learning.linkedin.com/resources/workplace-learning-report
- Asian Development Bank (ADB). (2021). Skills for Employment Investment Program (SEIP): https://www.adb.org





