লেখক : ফারহানা হুসাইন
একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে তার যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর। একটি সুষ্ঠ যোগাযোগ ব্যবস্থা কর্মীদের মধ্যে সুসম্পর্ক, আস্থা এবং জবাবদিহিতার পরিবেশ তৈরী করে। তথ্যের নিয়মিত এবং নিরবিচ্ছিন্ন আদান-প্রদান কর্মীদের কর্মদক্ষতা এবং সর্বোপরি প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এক্ষেত্রে যোগাযোগ ব্যবস্থার দুটো জনপ্রিয় মাধ্যম হলো Internal communication এবং Town hall .
কিন্তু প্রশ্ন হলো কোনটি বেশি কার্যকর? নাকি দুটোর গুরুত্বই সমান?
চলুন জেনে নেয়া যাক।
Internal Communication :
Internal communication বা অভ্যন্তরীন যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন দায়িত্বে থাকা সকল কর্মী ও লিডারদের মাঝে প্রতিদিনের কার্যক্রম, আপডেট, নোটিশ বা অন্যান্য তথ্যাদি আদান-প্রদান হয়ে থাকে। নোটিশ বোর্ড, ইমেইল, ইন্ট্রানেট, বিভিন্ন অ্যাপ, অনলাইন বা অফলাইন মিটিংসহ নানা মাধ্যমে এটি সম্পন্ন হয়ে থাকে।
গুরুত্ব :
Gallup এর এক গবেষণায় দেখা গেছে প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত মাত্র ২৮% কর্মী তাদের কাজে সক্রিয়ভাবে জড়িত(engaged), ১৬% কর্মচারী সক্রিয়ভাবে কর্মচ্যুত (disengaged) এবং প্রায় ৫৬% কর্মীই কাজের সাথে সম্পূর্ণ জড়িত নয় (not engaged)।
এর পেছনে অনেক কারণের মধ্যে রয়েছে অকার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা। অভ্যন্তরীন যোগাযোগ ব্যবস্থা সক্রিয় থাকলে কোম্পানির সকল বিষয়ে কর্মীরা অবগত থাকেন। ফলে তারা কোম্পানির প্রতি অধিক দায়িত্বশীল ও অনুপ্রাণিত হয়ে ওঠেন যা কর্মী ও কোম্পানি উভয়ের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। যেমন :
১. কর্মীদের কাজের স্পৃহা বৃদ্ধি পায় :
একটি কার্যকর Internal communication নিশ্চিত করে কোম্পানির সকল সিদ্ধান্ত, নীতিমালা বা গুরুত্বপূর্ণ আপডেট যেন সময়মতো সকল কর্মীদের কাছে পৌঁছে যায়। এতে কর্মীরা নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ও সম্পৃক্ত মনে করেন, যার ফলে তাদের দায়িত্ববোধ ও কাজের প্রতি উৎসাহ বৃদ্ধি পায়।
McKinsey & Company-এর এক গবেষণামতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীন যোগাযোগ ব্যবস্থা সক্রিয় থাকলে তা কর্মীদের উৎপাদনশীলতা ২০-২৫% পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারে।
২. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে :
প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব ও কর্মীদের মাঝে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে একটি জবাবদিহিতার পরিবেশ তৈরি হয় যা কর্মীদের কাজের স্বচ্ছতা ও উপযোগিতা বাড়ায়।
৩.সর্বোপরি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায় :
অভ্যন্তরীন যোগাযোগ ব্যবস্থা কর্মীদের কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, উৎসাহ ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করে যা প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
Grammarly’র এক সাম্প্রতিক রিপোর্ট 2024 State of Business Communication অনুযায়ী – জরিপে অংশগ্রহণকারী ২৫৩ জন ব্যবসায়ী নেতার মধ্যে ৬৪% বিশ্বাস করেন যে, কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা তাদের দলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করেছে। কর্মীদের ৫৫% এর সাথে একমত পোষণ করেছেন।
আরও পড়ুন : কেন এখন কর্পোরেট পেশাজীবীরা শিখছেন ChatGPT প্রম্পটিং?
৪. সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হয়
অভ্যন্তরীন যোগাযোগ ব্যবস্থা নেতৃত্ব ও কর্মীদের মাঝে সেতুবন্ধন তৈরী করে। এতে করে কোম্পানির যেকোনো আপডেট কর্মীদের কাছে পৌঁছানো যেমন সহজ হয়, তেমনি কর্মীদের প্রতিক্রিয়া বা মতামতও সহজেই উপরমহলে পৌঁছে যায়। ফলে কোম্পানির যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ আগের তুলনায় দ্রুততর ও সহজ হয়।
৫. আইডিয়া জেনারেশন ও কর্মীদের সৃজনশীলতা বৃদ্ধি :
অভ্যন্তরীন যোগাযোগ রক্ষা করার মাধ্যমে ম্যানেজার বা টীম লিডাররা তাদের কর্মীদের দৈনন্দিন কাজের আপডেট রাখেন ও ফিডব্যাক প্রদান করেন। এটি কর্মীদের ভুল-ত্রুটি সংশোধন করে ও তাদের কাজের দক্ষতা ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায়।
৬. প্রতিষ্ঠানের প্রতি কর্মীদের সন্তোষ বৃদ্ধি ও ইতিবাচক মনোভাব তৈরী :
কোম্পানির সকল খবরাখবর সম্পর্কে অবগত থাকায় ও লিডারদের নিয়মিত নির্দেশনা ও ফিডব্যাক কর্মীদের মনে সন্তোষ ও মূল্যবোধের তৈরী করে। তারা নিজেদের কাজের প্রতি অধিক মনোযোগী ও দায়িত্বশীল হয়ে ওঠেন।
Gallup অনুসারে, যেসব প্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরীন যোগাযোগ ব্যবস্থা সক্রিয়, তাদের কর্মী টার্নওভার কম হওয়ার সম্ভাবনা ৫০% বেশি।
সীমাবদ্ধতা :
১. অনেকসময় এই যোগাযোগ ব্যবস্থাটি একমুখী হয়ে পরে।
২. মতামত বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের এক পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সৃষ্টি হতে পারে।
৩. প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগে ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা থাকে।
Town Hall :
এটি একটি মিটিং বা সভা যেখানে কোম্পানির শীর্ষ নেতারা (যেমন CEO, পরিচালক, বিভাগীয় প্রধান) কর্মীদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় যেমন- ব্যবসায়িক ফলাফল, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, নীতি প্রণয়ন, কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করে থাকেন।
এ ধরনের মিটিং সাধারণত মাসে এক বা দুইবার আয়োজন করা হয়, তবে অনেক কোম্পানি ত্রৈমাসিক বা প্রজেক্ট-ভিত্তিক মিটিংও করে থাকে।
গুরুত্ব:
2024 Ragan Communications Benchmark Report অনুসারে, নেতা ও কর্মীদের মধ্যে যোগাযোগের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম হচ্ছে Town hall মিটিং, যেখানে ৬৮% প্রতিষ্ঠান এই মাধ্যমটি নিয়মিতভাবে ব্যবহার করে।
এর কিছু সুবিধা হলো:
১.নেটওয়ার্কিং বৃদ্ধির সুযোগ :
Town hall মিটিংয়ের মাধ্যমে কর্মীরা কোম্পানির নেতৃত্ব,শেয়ারহোল্ডার, বিজনেস পার্টনারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাথে সরাসরি পরিচিত হওয়ার এবং তাদের বক্তব্য শোনার সুযোগ পান।
২. কর্মীদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি :
Gallup এর গবেষণা অনুযায়ী, যেসকল প্রতিষ্ঠান নিয়মিত Town hall মিটিং আয়োজন করেছে, তাদের কর্মীদের কোম্পানির প্রতি সম্পৃক্ততা ২০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ ধরণের মিটিং এর মাধ্যমে কর্মীরা নিজেদের আরও বেশি কানেক্টেড ও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন যা তাদের কোম্পানির প্রতি সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করে।
৩. স্বীকৃতি প্রদান
Town hall মিটিং হলো কর্মীদের কাজের স্বীকৃতি প্রদান বা কোম্পানির কোনো সাফল্য উদযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।
প্রতিষ্ঠানের সকলের উপস্থিতিতে স্বীকৃতি বা পুরস্কার প্রদান সংশ্লিষ্ট কর্মীর মধ্যে সম্মান, গর্ব এবং দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলে। এটি অন্য কর্মীদের মধ্যেও প্রেরণা ও ইতিবাচক প্রতিযোগিতা তৈরি করে।
একইভাবে কোম্পানির কোনো অর্জনকে শুধু উপরমহলে সীমাবদ্ধ না রেখে সকল কর্মীদের সঙ্গে একসাথে উদযাপন করলে তা কর্মীদের মধ্যে সন্তোষজনক ও উৎফুল্ল পরিবেশ তৈরী করে। এর ফলে কর্মীরা কোম্পানির ভবিষ্যৎ লক্ষ্য পূরণে আরো বেশি অনুপ্রাণিত ও দায়বদ্ধ হয়ে ওঠেন।
৪. মতবিরোধের আশংকা কমে যায়:
Town hall মিটিং এ মূলত কোম্পানির সকল গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হয়ে থাকে। সকলের উপস্থিতি এবং মতামতের উপর ভিত্তি করেই যেহেতু এই সিদ্ধান্ত গুলো নেয়া হয় তাই পরবর্তীতে সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ বা মতবিরোধের আশংকা অনেকাংশেই হ্রাস পায়।
৫. স্বচ্ছতা বৃদ্ধি :
Town hall মিটিংগুলোয় কোম্পানির সকল স্তর ও বিভাগের কর্মীরা একসঙ্গে উপিস্থিত থাকেন। কোম্পানির কোনো নীতিমালা, নির্দেশনা বা অন্য যেকোনো তথ্য তখন নেতৃত্ব থেকে সরাসরি কর্মীদের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে তথ্য বিকৃতি, বিভ্রান্তি, গুজব বা দ্বিধা-সংশয়ের কোনো সুযোগ থাকেনা। এটি প্রতিষ্ঠানের ভিতরে স্বচ্ছতা ও আস্থার পরিবেশ তৈরী করে।
সীমাবদ্ধতা :
১.Town hall মিটিং আয়োজন, প্রস্তুতি এবং পরিচালনা করতে অনেক সময়ের প্রয়োজন হয় যা দৈনন্দিন কাজকর্মে ব্যঘাত ঘটায়।
২. সকলের উপস্থিতিতে অনেক বড় পর্যায়ে এসব মিটিং অনুষ্ঠিত হয় বলে অনেকেই মন খুলে তাদের প্রশ্ন বা মতামত প্রকাশ করতে পারেননা।
৩. অনেকসময় যোগাযোগটি একমুখী হয়ে পরে।
৪. সময়ের সীমাবদ্ধতা থাকায় সকলের মতামত গ্রহণ সম্ভব হয়না।
কোনটি বেশি কার্যকর?
Internal communication এবং Town hall – এই দুটো যোগাযোগ পদ্ধতির মধ্যে কোনটি বেশি কার্যকর তা নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানের আকার, উদ্দেশ্য, তথ্যের ধরণ ও প্রয়োজনের উপর। যেমন :
কর্মীদের দৈনন্দিন কাজের খবর রাখা ও প্রয়োজানুসারে ফিডব্যাক দেয়া, কোম্পানির প্রতিদিনের আপডেট ও নির্দেশনা দ্রুত পৌঁছে দেয়া ইত্যাদি কাজের জন্য Internal communication হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম।
আবার বড় কোনো ঘোষণা দেয়া বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কর্মীদের পরামর্শ, সমস্যা বা অন্যান্য মতামত নেয়া এবং কোম্পানির সকলের মাঝে একতা ও আস্থা তৈরির ক্ষেত্রে আবার Town hall মিটিং বেশি কার্যকর হবে।
উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনানুযায়ী Internal communication নাকি Town hall – কোনটি বেশি কার্যকর হবে তা একটি ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো :
| উদ্দেশ্য | Internal Communication | Town Hall |
|---|---|---|
| দৈনন্দিন কাজের আপডেট রাখা ও ফিডব্যাক প্রদান | খুবই কার্যকর | তেমন কার্যকর নয় |
| তথ্য ও নির্দেশনা দ্রুত পৌঁছানো | খুবই কার্যকর | তেমন কার্যকর নয় |
| বড় কোনো ঘোষণা বা নীতিমালা প্রণয়ন | সীমিত কার্যকর | খুবই কার্যকর |
| কর্মীদের সুবিধা-অসুবিধা জানা ও পরামর্শ নেয়া | কার্যকর | অধিক কার্যকর |
| প্রতিষ্ঠানের সকল নেতৃত্ব ও কর্মীদের সাথে পরিচিত হওয়া | তেমন কার্যকর নয় | খুবই কার্যকর |
| সাফল্য উদযাপন ও স্বীকৃতি প্রদান | সীমিত কার্যকর | খুবই কার্যকর |
| দ্বিমুখী যোগাযোগ রক্ষা | খুবই কার্যকর | সীমিত কার্যকর |
| দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ | সীমিত কার্যকর | খুবই কার্যকর |
সুতরাং একটি কার্যকর ও ফলপ্রসূ যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে Internal communication ও Town hall – উভয় মাধ্যমকেই প্রতিষ্ঠানের চাহিদা ও লক্ষ্য অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে।
শুধুমাত্র কোনো একটি মাধ্যমের উপর নির্ভর করলে তা নেতৃত্ব ও কর্মীদের মাঝে একটি স্বচ্ছ ও সহযোগিতামূলক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হবে।
আরও পড়ুন : কর্পোরেট দুনিয়ায় ফ্রিল্যান্সার আর কন্ট্রাক্ট বেসড কর্মীর সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে কেন?



