লেখাঃ ফারহানা হুসাইন
যেকোনো ব্যবসায় টাকা বিনিয়োগ করলে লাভ কেমন হবে তা নির্ভর করে ব্যবসার ধরণ, বাজার চাহিদা, প্রতিযোগিতা ও বিনিয়োগের আকারের উপর। ছোট বা মাঝারি আকারের ব্যবসায় যেহেতু পুঁজি তুলনামূলক কম থাকে, তাই আশানুরূপ ফলাফল পাওয়াটা অনেক সময় চ্যালেঞ্জিং হতে পারে, তবে অসম্ভব নয়।
ছোট ব্যবসা মানেই কম লাভ নয়
ছোট ব্যবসা মানেই যে লাভ কম হবে, তা নয়। ব্যবসার লাভ-ক্ষতি কিছু বিষয়ের উপর নির্ভর করে –
১. সঠিক পরিকল্পনা
যেকোনো ব্যবসার সফলতার মূল ভিত্তি হচ্ছে সঠিক পরিকল্পনা। বিশেষ করে ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে, যেখানে পুঁজি সীমিত, সেখানে একটি বাস্তবসম্মত ও স্পষ্ট পরিকল্পনার গুরুত্ব অনেক। কম পুঁজিতে সর্বোচ্চ লাভবান হতে হলে শুরু থেকেই কীভাবে ব্যবসা পরিচালিত হবে, বাজেট নির্ধারণ, কোন পণ্য বা সেবা বাজারে আনা হবে, লক্ষ্যমাত্রা কী হবে, সম্ভাব্য ক্রেতা ও প্রতিযোগী – এই বিষয়গুলো নিয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে।
২. ব্যবসার ধরন ও চাহিদা
বর্তমান বাজারে কোন পণ্যের চাহিদা বেশি সেটা বোঝা খুব জরুরি। অনেক সময় আমরা নিজের পছন্দ অনুযায়ী ব্যবসা শুরু করি, কিন্তু বাজারে তার চাহিদা না থাকলে তাতে লাভের পরিবর্তে লোকসানের সম্ভাবনাই বেশি থাকে। তাই ব্যবসা শুরুর আগে স্থানীয় ও অনলাইন মার্কেট ট্রেন্ড, ভোক্তাদের প্রয়োজন এবং প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
৩. বিনিয়োগের পরিমান
ছোট বা মাঝারি আকারের ব্যবসায় সাধারণত বিনিয়োগের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম থাকে। তবে এই কম পুঁজি দিয়েই লাভজনক ব্যবসা গড়ে তোলা সম্ভব, যদি তা সুপরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো যায়। আমাদের অনেকের ধারণা, বেশি টাকা না থাকলে ব্যবসা করা সম্ভব নয় – কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, অল্প পুঁজিতেও সফল হওয়া যায়, যদি তা সঠিক জায়গায় বরাদ্দ করা হয়। শুরু থেকেই অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে বিনিয়োগের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করলেই ছোট ব্যবসা ধীরে ধীরে লাভজনক হয়ে উঠতে পারে।
৪. মার্কেটিং ও প্রচারণা
ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যথাযথ মার্কেটিং ও প্রচারণা। অনেক সময় ভালো পণ্য বা সেবা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র প্রচারের অভাবে তা মানুষের দৃষ্টিগোচর হয় না।
কম খরচে ব্যবসার প্রচারণার জন্য উপযুক্ত মাধ্যম হতে পারে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মস যেমন – ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব ইত্যাদি। এক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ সংখ্যক ক্রেতা আকর্ষণের জন্য উপযুক্ত ডিজিটাল মার্কেটিং-এর কৌশল ব্যবহার করতে হবে।
আরও পড়ুন – অনলাইনে ব্যবসা করছেন কিন্তু বিক্রি বাড়ছে না? একটাই রাস্তা- কনটেন্ট মার্কেটিং
৫. দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা
ব্যবসার ধরণ অনুযায়ী পূর্বঅভিজ্ঞতা ও দক্ষতা থাকাটা খুব জরুরি নতুবা বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাই নতুন উদ্যোক্তাদের উচিত ব্যবসা শুরু করার আগে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি ও প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত থাকা।
এছাড়াও, ব্যবসাকে সবার চোখে ফুটিয়ে তুলতে বিভিন্ন ক্রিয়েটিভ আইডিয়া বাস্তবায়ন করাও জরুরি। নতুন ধরনের পণ্য, আকর্ষণীয় প্রচারণা এবং বিশেষ অফার বা সুবিধা দিয়ে ব্যবসায় পার্থক্য তৈরি করতে হবে, যা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সহায়তা করে।
আরও পড়ুন – ব্যর্থতা মানেই শেষ নয় – এই ৫টি শিক্ষা আপনাকে সফল উদ্যোক্তা বানাবে
ছোট ব্যবসার কিছু সুবিধা
১. কম পুঁজিতে শুরু করা যায় – বড় ব্যবসার মতো বিশাল বিনিয়োগ প্রয়োজন হয় না। অল্প মূলধনেই ব্যবসা শুরু করা সম্ভব।
২. ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম থাকে – বিনিয়োগের পরিমান কম হওয়ার কারণে আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিও কম থাকে।
৩. পরিচালনা সহজ – ছোট পরিসরে ব্যবসা হওয়ায় নিয়ন্ত্রণ রাখা সহজ হয়।
৪. দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় – বড় প্রতিষ্ঠানের মতো দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়।
৫. ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে ওঠে – গ্রাহকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি করা যায়।
৬. নমনীয়তা বেশি – বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া যায়।
আরও পড়ুন – লোকাল মার্কেট VS এক্সপোর্ট মার্কেট – নতুন স্টার্টআপের জন্য কোনটা স্মার্ট চয়েজ?
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ছোট ও মাঝারি ব্যবসার অবদান
ছোট ও মাঝারি আকারের ব্যবসা (এসএমই) বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। দেশে মোট কর্মসংস্থানের একটি বিশাল অংশ আসে এসএমই খাত থেকে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৮৫% কর্মসংস্থান এই খাতে হয়ে থাকে। একাধিক সূত্র মতে, কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতে প্রায় ২ কোটির বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সিএমএসএমই খাতের মোট মূল্য সংযোজন দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এমএসএমই) মূল্য সংযোজন ছিল ২ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা, ২০২২-২৩ এ তা ১৬.৭২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ১৯ হাজার কোটিতে। একই সময়ে কুটির শিল্পেও মূল্য সংযোজন বেড়েছে ১৭.৫ শতাংশ হারে, যা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা।
বিসিএসের তথ্য অনুসারে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশের মোট জিডিপির ২৩.১০ শতাংশ এসেছে শিল্প খাত থেকে, যার মধ্যে এমএসএমই খাতের অবদান ছিল ৭.৩৫ শতাংশ এবং কুটির শিল্পের অবদান ৪.৫৪ শতাংশ।
( সূত্র – প্রথম আলো )
অর্থাৎ, দেশের ছোট ব্যবসার অবদান ক্রমেই বাড়ছে, যা প্রমাণ করে এই খাতটি শুধু কর্মসংস্থানই সৃষ্টি করছে না, বরং জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবেও গড়ে উঠছে।
ছোট ব্যবসা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সঠিক পরিকল্পনা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতার মাধ্যমে তা সফলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। এই খাতে পুঁজি কম হলেও সুযোগ ও সম্ভাবনা অনেক বেশি। বর্তমান সময়ে সরকার ও বিভিন্ন সংস্থাও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তায় নানা উদ্যোগ নিচ্ছে, যা এই খাতের সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করেছে।
তথ্যসূত্র –
অর্থনীতিতে বাড়ছে ছোটদের অবদান, বিবিএসের তথ্য
আন্তর্জাতিক এসএমই দিবস: ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
ছোট ব্যবসার বড় অবদান, অর্থনীতির প্রাণ সিএমএসএমই খাত
অর্থনীতির প্রাণ ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ
প্রশ্নোত্তর
১. ছোট ব্যবসা শুরু করতে কী পরিমাণ পুঁজি দরকার?
উত্তরঃ ছোট ব্যবসার জন্য পুঁজির পরিমাণ নির্ভর করে ব্যবসার ধরন ও স্কেলের উপর। সাধারণত ২০,০০০ টাকা থেকে শুরু করে কয়েক লক্ষ টাকা পর্যন্ত লাগতে পারে। তবে অনেক ব্যবসা অল্প পুঁজিতেও শুরু করা সম্ভব, যেমন—হোমবেইজড পণ্য তৈরি, অনলাইন রিসেলিং ইত্যাদি।
২. ছোট ব্যবসা কতটা লাভজনক হতে পারে?
উত্তরঃ সঠিক পরিকল্পনা, পণ্যের মান এবং বাজার বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে ছোট ব্যবসা খুবই লাভজনক হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ২০-৩০% পর্যন্ত লাভ হয়, আবার কিছু ব্যবসায় সময়ের সাথে মুনাফার পরিমাণ বাড়ে।
৩. কোন ধরণের ছোট ব্যবসা বর্তমানে বাংলাদেশে জনপ্রিয়?
উত্তরঃ বাংলাদেশে অনলাইন বুটিক, ফুড ডেলিভারি, হোম বেকারি, কসমেটিকস রিসেলিং, প্রিন্টিং ও ডিজাইন, মোবাইল সার্ভিসিং, ফ্রিল্যান্সিং সার্ভিস ইত্যাদি ব্যবসাগুলো বেশ জনপ্রিয় ও সম্ভাবনাময়।
৪. আমি যদি ব্যবসায় নতুন হই, তাহলে কোথা থেকে শুরু করব?
উত্তরঃ প্রথমে নিজের আগ্রহ ও দক্ষতা বুঝে ব্যবসার ধরন নির্ধারণ করুন। তারপর একটি ছোট পরিকল্পনা তৈরি করুন, বাজার যাচাই করুন, পুঁজি জোগাড় করুন এবং ধাপে ধাপে ব্যবসা শুরু করুন। চাইলে উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণেও অংশ নিতে পারেন।
৫. ছোট ব্যবসার জন্য সরকারি সহায়তা বা লোন পাওয়া যায় কি?
উত্তরঃ হ্যাঁ, বাংলাদেশে SME ফাউন্ডেশন, ব্যাংক ও বিভিন্ন এনজিও ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে থাকে। এছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ স্কিমও রয়েছে।
৬. SME কি?
উত্তরঃ SME অর্থাৎ Small and Medium Enterprises বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ হলো এমন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা শিল্প উদ্যোগ, যেগুলোর আকার, কর্মসংস্থান ও পুঁজি তুলনামূলকভাবে ছোট বা মাঝারি পর্যায়ের হয়ে থাকে।
৭. CMSME পূর্ণরূপ কি?
উত্তরঃ CMSME এর পূর্ণরূপ হলো: Cottage, Micro, Small and Medium Enterprises অর্থাৎ কুটির, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ





