লেখকঃ নাওমী ইসলাম
বাংলাদেশের রেমিট্যান্স খাত দীর্ঘদিন থেকেই বৈদেশিক আয় সংগ্রহে বড় ভূমিকা পালন করেছে। ২০২১ সালে প্রবাসীদের রফতানি থেকে প্রায় $22.1 বিলিয়ন এসেছে। তবে সাম্প্রতিককালে বিষয়টিতে ডিজিটাল রূপান্তর দৃশ্যমান হচ্ছে: MFS (মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস) প্ল্যাটফর্মগুলো রেমিট্যান্স রিসিভাল ও ব্যবহারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে এগিয়ে এসেছে। সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, MFS প্রোভাইডার ও প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ইকোসিস্টেম গড়ে উঠছে।
নতুন ফিনটেকগুলো কেমন চলছে বাংলাদেশ এ তা জেনে নেয়া যাক:
বাজারের বৃদ্ধি ও প্রভাব
১. MFS অ্যাকাউন্ট ও ট্রানজেকশন বৃদ্ধির ধারা: ফেব্রুয়ারি–২০২৫ পর্যন্ত, প্ল্যাটফর্মগুলোতে MFS অ্যাকাউন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩৯.৩ মিলিয়ন, যা ২০২৪ সালের একই সময়ে ছিল ২১৯.১২ মিলিয়ন—a ৯.২১% বৃদ্ধি; মোট ট্রানজেকশন ভলিউম ৩২.৬% বাড়ে, পৌঁছে ১.৭২ ট্রিলিয়ন টাকায় । এর মধ্যে রেমিট্যান্স জাতীয় কনট্রিবিউশনের অংশ বেড়েছে প্রধান ভূমিকায়।
২. রেমিট্যান্সে MFS-এর প্রবৃদ্ধি: ২০২৪ সালে bKash-এর মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ ৬৫% বেড়েছে, যা ৪ মিলিয়ন+ গ্রাহকের কাছে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরেই এসেছিল ৯৫%+ YoY বৃদ্ধির তথ্য—এক মাসেই MFS-এ রেমিট্যান্স ভলিউম ছিল ১,১০২.২২ কোটি টাকা।
৩. বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগ: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি অনুযায়ী এখন bKash, Rocket ও Upay ইত্যাদি সরাসরি আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স হ্যান্ডেল করতে পারছে, যা অবৈধ hundi নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করবে ।
এই পরিসংখ্যানগুলো প্রমাণ করে, ডোমেস্টিক ও ইনবাউন্ড রেমিট্যান্সে MFS প্ল্যাটফর্ম দ্রুত মূলধারায় প্রবেশ করছে—উদ্ভাবন ও বৃদ্ধি অনিবার্য হয়ে উঠছে।
প্রধান MFS প্ল্যাটফর্ম ও তাদের অবদান
bKash
- ২০১১ সালে BRAC Bank ও Money in Motion-এর মাধ্যমে চালু bKash বর্তমানে প্রায় ৮০ মিলিয়ন+ গ্রাহক, ৩৫০,০০০ এজেন্ট ও এক মিলিয়ন+ মার্চেন্ট নেটওয়ার্কের অধিকারী।
- ২০২৪ সালে রেমিট্যান্স মাধ্যামে ৬৫% বৃদ্ধির পাশাপাশি, ঈদেও ৮৬% বৃদ্ধি লক্ষণীয়; আন্তর্জাতিকভাবে ১৪০+ দেশের MTO ও ২৫টি ব্যাংকের সঙ্গে সংযুক্ত।
- TerraPay-এর সাথে অংশীদারিত্বে ৩০ সেকেন্ডে ট্রান্সফার করা সম্ভব হচ্ছে—এতে প্রতিটি লেনদেনে শত শত ট্রানজেকশন পার সেকেন্ড সক্ষমতা যোগ হয়েছে। এছাড়াও Payoneer ফাঁকা হয়ে bKash-এ সরাসরি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
Nagad
- বাংলাদেশ পোস্ট অফিসের আওতায় ২০১৯ সালে চালু Nagad বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল ব্যাংক, যা নাম মাত্রের DKYC প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলায় সময় সেভ করে—paperless এবং দ্রুত।
- সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা প্রোগ্রামগুলোতে Nagad-এর সমর্থন উল্লেখযোগ্য; EZ remittance ইনফ্লো সম্ভাবনাময় তবে অফিসিয়াল পরিসংখ্যান প্রয়োজন।
Rocket (DBBL)
- Dutch-Bangla Bank-এর MFS সুবিধা Cash-In/Out, ATM ব্রাঞ্চ সাপোর্ট ও রেমিট্যান্স সরবরাহ করে; গ্রামীণ ও শিল্প খাতে বেতন-ভাতার মাধ্যমে প্রবাহ বৃদ্ধি করছে।
Upay ও Others
- Upay (UCB Fintech, ২০২১): QR, USSD-ভিত্তিক কাজ ও ব্যাংক ইন্টিগ্রেশন—রেমিট্যান্স অ্যাক্সেস সহজ করছে ।
- SureCash, mCash, MyCash: ব্যাংক-agnostic মডেলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ও ডোমেস্টিক ট্রান্সফার সহজ করছে ।
উদীয়মান প্ল্যাটফর্ম:
১. QuiqSend + BRAC Bank: অস্ট্রেলিয়ান স্টার্টআপ QuiqSend–এর সাথে BRAC Bank-এর অংশীদারিত্ব; Aussies থেকে real-time, API-integrated রেমিট্যান্স সেবা চালু। প্রবাসী অস্ট্রেলিয়ানদের জন্য সহজ, নিরাপদ ও দ্রুত ট্রান্সফার প্ল্যাটফর্ম গঠন।
২. Taptap Send: চলতি বছর পর্যন্ত টাইপ-ভিত্তিতে কোনো ফি আরোপ করে না—ব্যাঙ্ক/মোবাইল ওয়ালেট/ক্যাশ পিকআপ—ফলট ০% ফি হিসেবে বিবেচ্য। ৯০%+ লেনদেন ৫ মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন হয়। ব্যবহারকারীরা জানিয়েছেন, “excellent exchange rate and no charge” । Taptap Send bKash, Nagad, Rocket পুরোদমে সাপোর্ট করে। গ্রামীণ এলাকাতেও ক্যাশ-আউট সুবিধা সহজলভ্য, ~379k এজেন্টের মাধ্যমে Cash out করা যায়।
প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক মডেলের বিশ্লেষণ
| কোম্পানি | প্রযুক্তি/মডেল | মূল সুবিধা |
| bKash, Nagad, Rocket, Upay, SureCash | USSD, অ্যাপ, DKYC | গ্রাহক-বিনোদিত অভিগম্যতা ও দ্রুততা |
| MyCash | ওয়ালেট-টু-ওয়ালেট | সরাসরি ট্রান্সফার, কম ফী |
| QuiqSend | API-ইন্টিগ্রেশন, রিয়েল-টাইম | ব্যাংক-লেভেল সুস্থিতি |
| Taptap send | App-based MFS integration, Instant Routing | ০% ফি, ফাস্ট ট্রান্সফার, ২.৫% সরকারি ইনসেনটিভ |
ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাস
bKash, Rocket, Nagad–এর মাধ্যমে রেমিট্যান্স অভিজ্ঞতা গ্রাহকদের মাঝে ব্যাপক স্বস্তি দিয়েছে। তবে VPN বা বিদেশ থেকে Nagad ভেরিফিকেশন সহজ হলেও, bKash VPN ব্লকে কিছু সমালোচনা পেয়েছে । Nagad‑সংক্রান্ত সরকারি সংযোগ নিয়ে একাংশ আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। এই প্রতিক্রিয়াগুলো দেখায়: অভ্যন্তরীণ সুবিধা থাকলেও বিশ্বাস এবং নিরাপত্তা বিষয়ে আরও কাজ বাকি।
চ্যালেঞ্জ ও বাধা
১. রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক: যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক MFS-এর মাধ্যমে রেমিট্যান্স অনুমোদন দিয়েছে, কিন্তু প্রত্যেক প্ল্যাটফর্মকেই কঠোর KYC/AML নিয়ম মেনে লাইসেন্স পেতে হবে ।
২. ডিজিটাল বিভিন্নতা: গ্রামীণ অঞ্চলে এখনো ইন্টারনেট সিগন্যাল ও স্মার্টফোন কম; USSD বা এজেন্ট ভিত্তিক মডেল প্রয়োজন ।
৩. বিশ্বাস ও নিরাপত্তা: Nagad নিয়ে রয়েছে সন্দেহ—কিছু গ্রাহক আস্থা হারাচ্ছে।
৪. সাইবার নিরাপত্তা ও fraud: ব্যবহারকারীদের অনলাইনে প্রতারণা ও ডেটা লিক নানা উদ্বেগ বাড়িয়েছে; সক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জরুরি ।
৫. Cryptocurrency‑সমর্থিত প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে: Wind-এর মতো DeFi প্রকল্পে বৈধতা, VASP লাইসেন্স ও স্টেবিলিটি নিশ্চিত করতে হবে।
ভবিষ্যতের দৃষ্টিকোণ
- বৈদেশিক প্রবৃদ্ধি: MFS প্ল্যাটফর্মগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে প্রবাসীরা ব্যবহার করছেন—bKash সহজ করে তুলছে প্রবাসী অনুদান ও উৎসবের অর্থ পৌঁছে দেওয়া ।
- RegTech ও AI‑ভিত্তিক নিরাপত্তা: ভবিষ্যতে NLP/AI–নির্ভর AML সমাধান ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে—যেমন NLP‑ভিত্তিক adverse media screening।
- ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি: গ্রামীণ নারীদের জন্য পৌঁছানো, ডিজিটাল বিনিয়োগ ও Agent‑ভিত্তিক মডেল জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করছে।
- সরকার ও বেসরকারি সমন্বয়: Smart Bangladesh Vision 2041 এর অংশ হিসেবে প্ল্যাটফর্মগুলোর নিরাপত্তা ও বৈধতার উপর নজর রাখা হবে।
উপসংহার
বাংলাদেশে রেমিট্যান্সের MFS রূপান্তর যাচাইযোগ্য ও সুদূরপ্রসারী। bKash, Nagad, Rocket–এর মতো প্ল্যাটফর্ম শুধু টাকা আদান প্রদানে নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনৈতিক পরিবর্তন, মহিলা ক্ষমতায়ন, ও ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তিতে ভূমিকা রাখছে। Wind–এর মতো নতুন প্ল্যাটফর্ম ব্লকচেইন remittance–এ গতি আনছে। তবে KYC/AML বাধ্যবাধকতা, নিরাপত্তা, বিশ্বাস ও গ্রামীণ প্রবেশ সহজে ধরে রাখতে হবে। RegTech, Compliance, স্বচ্ছতা এবং DL/AI–ভিত্তিক নিরাপত্তা–মিশ্রণ রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সমন্বয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশকে রেমিট্যান্স প্রযুক্তি খাতে আন্তর্জালিক অবস্থানে পৌঁছে দেবে। এবং যদি বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকারি নীতি সহ ভবিষ্যত প্রযুক্তি একত্রীকৃতভাবে কাজ করে, তবে remittance প্ল্যাটফর্মগুলো কৃষি, শিক্ষা ও মেয়েদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ সহ দেশের অর্থনীতিকে অধিক গতিশীল করতে পারবে।
সাধারণ কিছু প্রশ্ন ও উত্তর (FAQs)
১. বাংলাদেশে কোন কোন জনপ্রিয় রেমিট্যান্স ফিনটেক প্ল্যাটফর্ম আছে?
উত্তর: bKash, Nagad, Rocket (Dutch Bangla Bank), Upay, SureCash, MyCash, etc., উদীয়মান: taptap send, QuiqSend।
২. রেমিট্যান্স ফিনটেক ব্যবহারে কী সুবিধা আছে?
উত্তর: দ্রুত টাকা পাঠানো ও উত্তোলন, মোবাইল থেকে সরাসরি গ্রহণযোগ্যতা, গ্রামীণ এলাকাতেও সহজে গ্রহণ, কম ট্রান্সফার ফি, নিরাপদ ও ট্র্যাকযোগ্য লেনদেন, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সংযোগ।
৩. ফিনটেক ব্যবহার করে কিভাবে প্রবাসী টাকা পাঠাতে পারে?
উত্তর: প্রবাসীরা আন্তর্জাতিক পার্টনার যেমন MoneyGram, Xpress Money, WorldRemit, Payoneer, TerraPay, ইত্যাদির মাধ্যমে টাকা পাঠিয়ে থাকেন। এই অর্থ বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর bKash, Nagad, বা অন্য MFS-এর মাধ্যমে সরাসরি গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে জমা পড়ে।
৪. রেমিট্যান্স ফিনটেক ব্যবহারে কোন ঝুঁকি আছে?
উত্তর: সাইবার নিরাপত্তা হুমকি, ভুয়া অ্যাপ বা ফিশিং লিংক, লাইসেন্সবিহীন অপারেটর, VPN ব্যবহারে geo-block ইস্যু, হুন্ডি চক্রে ব্যবহারের আশঙ্কা।
৫. সরকার কীভাবে রেমিট্যান্স ফিনটেককে সহযোগিতা করছে?
উত্তর: সরকার MFS অনুমোদন দিচ্ছে, লেনদেনের ওপর কর ছাড় দিয়েছে, রেমিট্যান্স ইনসেনটিভ (২.৫%) দিচ্ছে, ডিজিটাল ব্যাংক চালু করছে, ডিজিটাল বাংলাদেশ ও স্মার্ট বাংলাদেশ বাস্তবায়নে সহায়তা করছে।
তথ্যসূত্র:
- Bangladesh MFS accounts surge by 20 million in a year, transactions up 32pc
- bKash sees 65pc increase in remittances in 2024
- bKash facilitates financial access, uplifting communities across BD
- Preference on sending remittances thru bKash growing among expats
- Bangladesh MFS accounts surge by 20 million in a year, transactions up 32pc
- BRAC Bank partners with fintech QuiqSend to facilitate app-based remittance from Australia | The Financial Express
- Win bonuses by sending remittance to bKash thru ‘Taptap Send’





