spot_imgspot_imgspot_imgspot_img

কর্পোরেট কোম্পানির Wellness Budget—সাধারণ কর্মীরা কি আসলেই পাচ্ছে?

লেখকঃ মোহাম্মদ ইব্রাহিম 

আধুনিক কর্পোরেট জগতে কর্মীদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতাকে এখন আর বিলাসিতা হিসেবে দেখা হয় না, বরং এটিকে প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ধারণার উপর ভিত্তি করেই বহুজাতিক এবং বড় দেশীয় কোম্পানিগুলো প্রতি বছর ‘Wellness Budget’ নামে একটি বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখে। কিন্তু চকচকে কর্পোরেট অফিসের ভেতরে কান পাতলে একটি প্রশ্ন প্রায়ই শোনা যায়, এই বাজেটের সুফল কি সাধারণ কর্মীরা আসলেই পাচ্ছে? নাকি এটি কেবল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং কর্পোরেট ব্র্যান্ডিংয়ের কাজেই ব্যবহৃত হচ্ছে?

Wellness Budget-এর উদ্দেশ্য

Wellness Budget মূলত কর্মীদের সামগ্রিক well-being নিশ্চিত করার জন্য বরাদ্দকৃত একটি তহবিল। এর উদ্দেশ্য—

  • কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ কমানো
  • কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য রক্ষা
  • স্বাস্থ্যকর অভ্যাসে উৎসাহ দেওয়া
  • কর্মীদের প্রোডাক্টিভিটি ও সন্তুষ্টি বাড়ানো
  • প্রতিষ্ঠানে কর্মী ধরে রাখা (employee retention) নিশ্চিত করা

বৈষম্যের চিত্র: সাধারণ কর্মী বনাম উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা

বাস্তবে দেখা যায় এই বাজেটের ব্যবহার বেশ বৈষম্যমূলক। নিচের ছকটি দেখলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে:

বিষয়উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসাধারণ কর্মী
মানসিক স্বাস্থ্য সেবাব্যক্তিগত কাউন্সেলিং, অফ-ডেসীমিত সুবিধা, দীর্ঘ অপেক্ষা
জিম/ফিটনেস সুবিধাফ্রি মেম্বারশিপ, সময়মতো ব্যাবহারস্থানাভাবে সুযোগ পায় না
রিমোট ওয়ার্ক/ফ্লেক্সিবিলিটিসহজেই অনুমোদন পাওয়া যায়কঠোর শিডিউলে আবদ্ধ
স্বাস্থ্যকর খাবারঅফিস ক্যান্টিনে আলাদা মেনুসাধারণ খাবার, সীমিত অপশন

আরো পড়ুন: Employee Experience কীভাবে বাংলাদেশের শীর্ষ কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর ব্যবসার গতি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে?

কর্পোরেট ব্র্যান্ডিং বনাম বাস্তব কর্ম-সংস্কৃতি

অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের ওয়েবসাইট, এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ায় বলে—“We care for our people.” কিন্তু বাস্তবে তাদের বেশিরভাগ কর্মী জানেই না Wellness Budget কী, কোথায় ব্যবহার হয়, বা তারা আদৌ এর আওতায় আসে কি না। এতে কর্পোরেট ব্র্যান্ডিং ভালো হয় ঠিকই, কিন্তু বাস্তব সংস্কৃতিতে ফাঁক থেকেই যায়।

বিশেষজ্ঞ ও গবেষণা থেকে তথ্য

Harvard Medical School-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রে wellness প্রোগ্রাম চালু করলেও স্বল্পমেয়াদে তেমন ভালো ফল পাওয়া যায় না। ১৮ মাস পর কর্মীদের স্বাস্থ্যের দিক থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি দেখা যায়নি। তবে যেসব প্রতিষ্ঠানে উর্ধ্বতন কর্মকর্তা  নিজেরাই এসব প্রোগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়, সেখানে ৯১% কর্মী ইতিবাচক পরিবর্তন দেখেছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে কর্পোরেট ওয়েলনেস প্রোগ্রাম এখনো শুরু পর্যায়ে রয়েছে। Dhaka Flow-এর মতো কিছু সংগঠন কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসচেতনতা ও মানসিক সুস্থতা নিয়ে কাজ করছে। British American Tobacco Bangladesh তাদের ‘Probaho’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে ৩ লাখ ১০ হাজার মানুষকে নিরাপদ পানি সরবরাহ করছে, যা একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে অধিকাংশ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানেই ওয়েলনেস প্রোগ্রাম এখনো শুধুই মানবসম্পদ বিভাগের একটি “চেকবক্স” মানে নামমাত্র উদ্যোগ, যার বাস্তব সুফল কর্মীরা খুব একটা পাচ্ছে না।

চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা

  • বৈষম্য: সাধারণ কর্মীদের তুলনায় উচ্চপদস্থরা বেশি সুবিধা পান।
  • অসচেতনতা: অনেক কর্মী জানেন না তাদের কোম্পানির ওয়েলনেস প্রোগ্রাম আছে।
  • সীমিত বাজেট: কিছু কোম্পানি নামমাত্র বাজেট বরাদ্দ করে, যা কার্যকর প্রোগ্রামের জন্য যথেষ্ট নয়।
  • সাংস্কৃতিক বাধা: মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতে অনীহা এবং কর্মীদের মধ্যে সচেতনতার অভাব।

সফল উদাহরণ ও ভালো প্র্যাকটিস

United Rentals-এর ‘Live Well, Safe & Healthy’ প্রোগ্রামে ৯১% কর্মী তাদের বরাদ্দকৃত ওয়েলনেস ডে ব্যবহার করেছে, যা কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের দারুণ একটি উদাহরণ। অন্যদিকে, W.P. Carey Inc. তাদের সকল কর্মীর জন্য শতভাগ কোম্পানি-পেইড স্বাস্থ্য বীমা প্রদান করে। এসব উদ্যোগ দেখায়, যদি সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন থাকে, তবে ওয়েলনেস প্রোগ্রাম শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবেও সফলভাবে কার্যকর করা সম্ভব।

ভবিষ্যৎ করণীয় ও সুপারিশ

  • সমান অ্যাক্সেস নিশ্চিত করা: সব কর্মীদের জন্য সুবিধা সমানভাবে উন্মুক্ত করতে হবে।
  • সচেতনতা বৃদ্ধি: কর্মীদের মধ্যে ওয়েলনেস প্রোগ্রাম সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে প্রচারণা চালানো।
  • কর্মীদের মতামত গ্রহণ: প্রোগ্রাম ডিজাইনের সময় সাধারণ কর্মীদের মতামত নেওয়া।
  • স্থানীয় প্রেক্ষাপটে প্রোগ্রাম: বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে প্রোগ্রাম তৈরি করা।

কর্পোরেট কোম্পানির Wellness Budget বাস্তবে কতটা সবার জন্য সেটি এক বড় প্রশ্ন। শুধু উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সুবিধা দিলে, তা প্রকৃত ‘well-being culture’ গড়ে তুলতে পারবে না। এই বাজেট তখনই সফল, যখন তা ‘সবার জন্য’, ‘সহজে প্রাপ্য’ এবং ‘বাস্তবায়নযোগ্য’ হয়। কর্পোরেট বিশ্বে সত্যিকার অর্থেই যদি “People First” বলতে হয়, তবে Wellness Budget-এর ব্যবহারে সেই দৃষ্টিভঙ্গিও বাস্তবে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি।

আরো পড়ুন: CSR বনাম Profitability: BD কোম্পানিগুলো কীভাবে ব্যালান্স করছে?

FAQ: সাধারণ কিছু প্রশ্ন ও উত্তর

প্রশ্ন : Wellness Budget কি শুধু বড় কোম্পানিগুলোর জন্য?

উত্তর: না, ছোট-মাঝারি কোম্পানিও সীমিত বাজেটে কর্মীদের সুস্থতার জন্য কার্যকর প্রোগ্রাম চালু করতে পারে।

প্রশ্ন : সাধারণ কর্মীরা এই সুবিধা কিভাবে পাবে?

উত্তর: HR বা Admin টিমের মাধ্যমে যোগাযোগ করে বিস্তারিত জানা এবং অংশগ্রহণ করা সম্ভব। কোম্পানির পলিসি জানতে হবে।

প্রশ্ন : Wellness সুবিধা কি বাধ্যতামূলকভাবে দিতে হয়?

উত্তর: না, আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়; তবে কর্মীদের কল্যাণে সচেতন কোম্পানিগুলো স্বেচ্ছায় তা দেয়।

তথ্যসূত্রঃ 

More articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest article

কারখানা পুনরায় চালু ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা

ঢাকা, ২৪ মে ২০২৬ — দ্য ডেইলি কর্পোরেট ডেস্ক দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু, রপ্তানি কার্যক্রমে গতি আনা এবং বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য...

আইএফআইসি ব্যাংক ও ল্যাবএইড গ্রুপের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর

ঢাকা, ২০ মে ২০২৬ — দ্য ডেইলি কর্পোরেট ডেস্ক গ্রাহক ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা নিশ্চিত করতে আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসি এবং দেশের অন্যতম...

ব্যস্ত না, কার্যকর হোন, উদ্যোক্তাদের সময় ব্যবস্থাপনা

লিখেছেনঃ মালিহা মেহেজাবিন বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক বিশ্বে একজন উদ্যোক্তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ শুধু মূলধন, মানবসম্পদ বা প্রযুক্তি নয়; বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো সময়। অর্থ...

ব্যবসায় ব্যর্থতার প্রধান কারণগুলো কী?

লেখকঃ আরেফিন রানা পিয়াস বর্তমান সময়ে ব্যবসা ও উদ্যোক্তা কার্যক্রম বিশ্ব অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন অনেক মানুষ নতুন ব্যবসা শুরু করলেও বাস্তবে...