২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বাংলাদেশ সরকার যে চিত্র উপস্থাপন করেছে, তা একদিকে যেমন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে, অন্যদিকে এটি জনমনে নানা প্রশ্নও তৈরি করেছে। সবচেয়ে দুঃখজনক ও আশঙ্কাজনক তথ্য হলো—পুরো বাজেট ঘাটতির অর্ধেকেরও বেশি খরচ হচ্ছে কেবল সুদ ও ভর্তুকির পেছনে।
অর্থাৎ, বাংলাদেশ এখন যতো আয় করছে, তার বড় একটা অংশই চলে যাচ্ছে পুরনো ঋণের সুদ শোধ আর জনগণের নানা খাতে দেওয়া ভর্তুকির পেছনে। এতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ থাকছে না।
১. বাজেট ঘাটতির কাঠামো
চলতি বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা শুধু সুদের পেছনে ব্যয় হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অপরদিকে, ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা।
অর্থাৎ, এই দুই খাত মিলে মোট বাজেট ঘাটতির প্রায় ৫০ শতাংশেরও বেশি। এটি অর্থনীতির জন্য একটি অ্যালার্মিং সংকেত, যেটা আমাদের দীর্ঘমেয়াদে ভাবিয়ে তোলা উচিত।
২. কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, বেশ কিছু কারণ একসাথে কাজ করছে। প্রথমত, গত কয়েক বছরে দেশি ও বিদেশি ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। সেই ঋণের সুদ এখন অর্থনীতির ঘাড়ে বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি খাতে বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ভর্তুকি অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকারকে নিজের কোষাগার থেকে বিশাল অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
তৃতীয় কারণটি হলো—কৃষি, সার, খাদ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা, যা জনসাধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাজেটের ভারসাম্য রক্ষায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
৩. এর প্রভাব কী হতে পারে?
এই ধরনের ব্যয়ের কারণে উন্নয়ন বাজেট কমে যেতে পারে, ফলে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় উন্নয়ন, কিংবা কর্মসংস্থান তৈরির প্রকল্পে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। সরকার বাধ্য হচ্ছে ঘাটতি পূরণে আবারও ঋণের দ্বারস্থ হতে, যা ভবিষ্যতে আরও বেশি সুদ পরিশোধের দায় তৈরি করছে।
এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক ধরনের “debt trap”-এ আটকে পড়তে পারে, যেখান থেকে বের হওয়া কঠিন।
৪. অর্থনীতিবিদদের মতামত ও আশঙ্কা
বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ভাষ্যমতে, এ ধরনের বাজেট কাঠামো টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। অনেকেই বলছেন, সরকারকে এখনই সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকি কমানো, আয় বাড়ানোর নতুন উৎস খোঁজা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে হবে।
৫. করণীয় কী হতে পারে?
ভর্তুকি পুরোপুরি তুলে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। তবে সেটা হতে হবে টার্গেটেড—যে মানুষ প্রকৃত অর্থেই দরিদ্র, শুধুমাত্র তাদের জন্য ভর্তুকি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি বড় বড় প্রকল্পে ঋণ নেওয়ার আগে তার রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট (ROI) বিশ্লেষণ বাধ্যতামূলক করা উচিত।
সরকার যদি ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে রাজস্ব আদায়ে দক্ষতা বাড়ায়, কর ব্যবস্থা ডিজিটাল করে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে—তাহলে ধীরে ধীরে ঘাটতি কমানো সম্ভব।
৬. ভবিষ্যৎ যে ভয় দেখাচ্ছে
বর্তমান বাজেটের যে চিত্র—যেখানে সুদ ও ভর্তুকিই গ্রাস করছে উন্নয়নের সম্ভাবনা—তা অর্থনীতির ভবিষ্যতের জন্য সুখকর নয়। দেশের প্রবৃদ্ধি যদি ঋণের বোঝায় থমকে যায়, তাহলে তা হবে শুধু সরকারের নয়, আমাদের সবার ক্ষতি। এখন সময় সচেতন হওয়ার, এবং সঠিক জায়গায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার।
উপসংহার:
বাংলাদেশের বাজেট এখন কেবল একটি অর্থনৈতিক দলিল নয়, বরং একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিশ্রুতির দলিলও। কিন্তু প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে গিয়ে যদি সুদের বোঝায় দেশ ডুবে যায়, তাহলে কারোই কোনো লাভ নেই। তাই সময় এসেছে বাজেট ঘাটতির বাস্তব চিত্র বুঝে, সুদ ও ভর্তুকি খাতে স্বচ্ছতা আনা এবং টেকসই অর্থনীতি গড়ার পথে এগিয়ে যাওয়ার।
সূত্র: জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট উপস্থাপন ২০২৫-২৬
আলোচিত বিষয়সমূহঃ
- বাজেট ঘাটতি ২০২৫
- সুদ ও ভর্তুকি খরচ
- বাংলাদেশের বাজেট বিশ্লেষণ
- বাজেট ঘাটতির প্রভাব
- বাংলাদেশ অর্থনীতি ২০২৫
- debt burden Bangladesh
- ভর্তুকি রিফর্ম বাংলাদেশ
- বাজেট নীতি পর্যালোচনা




