লেখকঃ মুসাররাত খান
রাশিয়া থেকে তেল আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের বিধান রেখে যুক্তরাষ্ট্রে একটি নতুন নিষেধাজ্ঞা বিল অনুমোদনের পথে এগোচ্ছে। একই সঙ্গে ভারত নেতৃত্বাধীন ইন্টারন্যাশনাল সোলার অ্যালায়েন্স (আইএসএ) থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই দুই সিদ্ধান্ত মিলিয়ে জ্বালানি ও কূটনৈতিক উভয় দিক থেকেই ভারতের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য হিন্দু জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপগুলো এমন এক সময়ে এসেছে যখন রাশিয়ার কাছ থেকে সস্তা তেল আমদানির কারণে ভারত ইতোমধ্যেই পশ্চিমা দেশগুলোর বাড়তি নজরদারির মুখে রয়েছে।
নতুন রাষ্ট্রদূত যোগদানের আগেই কড়া বার্তা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে সার্জিও গোর দায়িত্ব নেওয়ার আগেই এই কঠোর অবস্থানের বার্তা দিয়েছে ওয়াশিংটন। আগামী ১২ জানুয়ারি তিনি দিল্লিতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত এবং একই সঙ্গে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব শুরু করবেন।
এর আগে গত সেপ্টেম্বরে সার্জিও গোর প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছিলেন, ভারতের রুশ তেল আমদানি কমানো বা বন্ধ করাই হবে তার কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের শীর্ষে। নতুন নিষেধাজ্ঞা বিলকে সেই কৌশলেরই ধারাবাহিক বাস্তবায়ন হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
ইউরোপের সমর্থন, ভারতের কৌশলগত নীরবতা
এদিকে প্যারিসে অনুষ্ঠিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাদোসলোভ সিকোরস্কি রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি কমে আসায় প্রকাশ্যে সন্তোষ প্রকাশ করেন। সেখানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, ফ্রান্স ও জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও উপস্থিত ছিলেন।
সিকোরস্কির মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য ভারতের মতো কৌশলগত অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে তিনি একই সঙ্গে মন্তব্য করেন, রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমে যাওয়ার অর্থ হলো প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধযন্ত্রে অর্থের প্রবাহ সীমিত হওয়া।
এই বক্তব্যের বিপরীতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি না আসায় কূটনৈতিক মহলে এটিকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অনেকের মতে, এটি ভারতের নীরব ভারসাম্য কৌশলের অংশ।
আরোও পড়ুনঃ দক্ষতা উন্নয়নে বাংলাদেশ–চীনের সহযোগিতা জোরদার
৫০০ শতাংশ শুল্কের আইনি ভিত্তি
মার্কিন সিনেটর ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী লিন্ডসে গ্রাহাম এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপসংক্রান্ত বিলটিতে ইতোমধ্যে ‘সবুজ সংকেত’ দিয়েছেন। আগামী সপ্তাহের শুরুতেই এটি কংগ্রেসে ভোটে তোলা হতে পারে।
‘রাশিয়া স্যাংশনস অ্যাক্ট’ নামে পরিচিত এই দ্বিদলীয় বিলটি গত এপ্রিল মাসে সিনেটে উত্থাপন করা হয়। এখন পর্যন্ত সিনেটের ১০০ সদস্যের মধ্যে ৮৪ জন এবং প্রতিনিধি পরিষদের ১৫১ জন সদস্য এতে সমর্থন জানিয়েছেন। ফলে বিলটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই আইন কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট চীন, ভারত ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলোর ওপর সরাসরি অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের আইনি ক্ষমতা পাবেন, যাতে তারা রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করে।
ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যে সম্ভাব্য প্রভাব
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা কিছু ভারতীয় পণ্যের ওপর মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ রয়েছে। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ আগে থেকেই রাশিয়ার তেল কেনার কারণে আরোপিত। নতুন বিলটি পাস হলে এই শুল্ক হার কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে, যা ভারত যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে ভারতের টেক্সটাইল, ফার্মাসিউটিক্যালস, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য ও আইটি হার্ডওয়্যার খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে।
আরোও পড়ুনঃ বিদেশি মেধা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য সৌদি আরবের বিশেষ ‘গ্রিন কার্ড’ উদ্যোগ
আইএসএ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়ার তাৎপর্য
একই সময়ে ভারত-নেতৃত্বাধীন ইন্টারন্যাশনাল সোলার অ্যালায়েন্স (আইএসএ) থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়া কেবল প্রতীকী সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি ওয়াশিংটনের জ্বালানি কূটনীতিতে অগ্রাধিকারের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ভারতের জন্য এটি একটি কূটনৈতিক ধাক্কা হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য এখন রাশিয়ার জ্বালানি আয়ের পথ সংকুচিত করা সে লক্ষ্য পূরণে সৌর কূটনীতির মতো উদ্যোগও গৌণ হয়ে উঠছে।
ভারতের সামনে কৌশলগত চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্যিক চাপ সামাল দেওয়া; এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন ভারতের সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। রুশ তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা হঠাৎ কমালে দেশের জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যেতে পারে, আবার তা অব্যাহত রাখলে পশ্চিমা বাজারে প্রবেশাধিকার ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তরঃ
১. ৫০০ শতাংশ শুল্ক বলতে কী বোঝানো হচ্ছে?
উত্তরঃ রাশিয়া থেকে তেল কেনা দেশগুলোর পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে আমদানির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের বিধান রাখা হয়েছে এই বিলে।
২. এই সিদ্ধান্তে ভারতের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
উত্তরঃ ভারতের রপ্তানি খরচ বাড়বে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
৩. যুক্তরাষ্ট্র কেন আইএসএ থেকে সরে গেল?
উত্তরঃ ওয়াশিংটনের মতে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় জ্বালানি কূটনীতিতে নতুন করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ প্রয়োজন, যার অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত।
৪. বিলটি কি নিশ্চিতভাবে পাস হবে?
উত্তরঃ সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে ব্যাপক সমর্থন থাকায় পাস হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি।
৫. ভারত কি রুশ তেল আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করবে?
উত্তরঃ এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়নি ভারত সরকার।
তথ্যসূত্রঃ





