লেখকঃ মুসাররাত খান
২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষিখাতে ইউরিয়া সারের বাড়তি চাহিদা মোকাবিলায় সৌদি আরব থেকে প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকার। শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের আলোকে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার উদ্দেশ্য হলো আসন্ন মৌসুমগুলোতে সার ঘাটতির আশঙ্কা দূর করা এবং কৃষি উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির চলতি বছরের প্রথম বৈঠকে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এই সিদ্ধান্তকে কৃষিখাতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আমদানি, নির্ভরযোগ্য উৎসে জোর
শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসএবিআইসি এগ্রি-নিউট্রিয়েন্টস (SABIC Agri-Nutrients Company) কোম্পানির সঙ্গে সরকার-পর্যায়ের চুক্তির আওতায় এই ইউরিয়া সার কেনা হবে। বাল্ক গ্র্যানুলার ইউরিয়া সার হিসেবে আমদানিকৃত এই চালানটি ১৫তম লট হিসেবে বিবেচিত হবে, যা দেশের কৃষকদের মধ্যে বহুল ব্যবহৃত।
এই আমদানির জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯১ কোটি ৪১ লাখ টাকা। প্রতি মেট্রিক টনের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৯০ মার্কিন ডলার, যা বর্তমান বৈশ্বিক বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। সরকারের মতে, নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে সরাসরি ক্রয়ের ফলে সরবরাহ ঝুঁকি যেমন কমবে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে ব্যয় ব্যবস্থাপনাও সহজ হবে।
আরোও পড়ুনঃ দুই দিনে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে নতুন আমানত ৪৪ কোটি টাকা
বোরো ও আমন মৌসুম ঘিরে চাহিদা বৃদ্ধি
কৃষি মন্ত্রণালয় ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের যৌথ মূল্যায়নে দেখা গেছে, বোরো ও আমন মৌসুম সামনে রেখে দেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশীয় উৎপাদনের পাশাপাশি পর্যাপ্ত আমদানি না হলে মাঠপর্যায়ে সরবরাহ সংকট তৈরি হতে পারে, যা সরাসরি খাদ্যশস্য উৎপাদনে প্রভাব ফেলবে।
বিশেষ করে গ্যাস সংকট, কারখানার রক্ষণাবেক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ অনিশ্চয়তার কারণে দেশীয় উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখা সবসময় সম্ভব হয় না। এ বাস্তবতায় সরকার আগাম প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কৃষি ও ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় প্রভাব
সরকারি সূত্র জানায়,
- নিরবচ্ছিন্ন ইউরিয়া সার সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ায় কৃষি উৎপাদন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি কমবে
- বোরো ও আমন মৌসুমে সময়মতো সার পাওয়ায় ফসল উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে
- সার সংকট না থাকায় কৃষকদের অতিরিক্ত দামে সার কিনতে হবে না
- কৃষকদের মোট উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকবে
- খাদ্যশস্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে
- কৃষিপণ্যের বাজারদর স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে
- আগাম রাষ্ট্রীয় চুক্তির মাধ্যমে সার ক্রয় করায় ভর্তুকি ব্যয়ের পূর্বাভাস নির্ধারণ সহজ হবে
- আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্থিরতার প্রভাব ভর্তুকি বাজেটে কম পড়বে
- সরকারের সার ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় আর্থিক চাপ তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকবে
- দীর্ঘমেয়াদে কৃষিখাতে টেকসই উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার হবে
আরোও পড়ুনঃ দক্ষতা উন্নয়নে বাংলাদেশ–চীনের সহযোগিতা জোরদার
বিশেষজ্ঞদের মতামত
অর্থনীতি ও কৃষি খাত-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সৌদি আরবের মতো পরীক্ষিত ও দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারী দেশ থেকে ইউরিয়া আমদানির ফলে সরবরাহ বিঘ্নের ঝুঁকি কমবে। পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারে দামের অস্থিরতা থাকলেও আগাম ক্রয় চুক্তির মাধ্যমে মূল্য স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হচ্ছে, যা সরকারের ভর্তুকি ব্যবস্থাপনাতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তরঃ
১. সরকার কেন আবার ইউরিয়া সার আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে?
উত্তরঃ চলতি অর্থবছরে কৃষিখাতে ইউরিয়া সারের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এবং ভবিষ্যৎ মৌসুমে সরবরাহ ঝুঁকি এড়াতে আগাম আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
২. কোন প্রতিষ্ঠান থেকে সার আমদানি করা হচ্ছে?
উত্তরঃ সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এসএবিআইসি এগ্রি-নিউট্রিয়েন্টস কোম্পানি থেকে ইউরিয়া সার আমদানি করা হবে।
৩. মোট কত টন সার আমদানি হবে এবং ব্যয় কত?
উত্তরঃ মোট প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার আমদানি হবে, এতে ব্যয় হবে ১৯১ কোটি ৪১ লাখ টাকা।
৪. প্রতি টনের মূল্য কত নির্ধারণ করা হয়েছে?
উত্তরঃ প্রতি মেট্রিক টনের মূল্য ৩৯০ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে।
৫. এই আমদানির ফলে কৃষকরা কীভাবে উপকৃত হবেন?
উত্তরঃ নিরবচ্ছিন্ন সার সরবরাহ নিশ্চিত হলে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং সময়মতো ফসল উৎপাদন সম্ভব হবে।
তথ্যসূত্রঃ





