ঢাকা: দেশের স্বর্ণবাজারে চলছে ইতিহাসের সবচেয়ে দ্রুতগতির মূল্যবৃদ্ধি। ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি ইতোমধ্যে পৌঁছেছে প্রায় ২ লাখ ৫৭ হাজার টাকায়। সাম্প্রতিক প্রবণতা বিশ্লেষণ করে বাজার পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা—এই গতি বজায় থাকলে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই ভরি তিন লাখ টাকার মনস্তাত্ত্বিক সীমা ভেঙে যেতে পারে।
এটি শুধু বিয়ের মৌসুমে সাধারণ মানুষের ব্যয় বাড়ানোর বিষয় নয়; বরং অর্থনীতির গভীরে জমে থাকা অনিশ্চয়তা ও আস্থার সংকটের প্রতিফলন।
সংখ্যায় স্বর্ণের উত্থান
পরিসংখ্যান বলছে, ২০০০ সালে যেখানে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি ছিল মাত্র ৬ হাজার ৯০০ টাকা, সেখানে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এসে তা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৭ হাজার টাকায়—২৫ বছরে প্রায় ৩৬ গুণ বৃদ্ধি।
উল্লেখযোগ্য মাইলফলকগুলো হলো—
- ২০০০ সাল: ৬,৯০০ টাকা
- ২০১০ সাল: ৪২,১৬৫ টাকা
- ২০২০ সাল: ৭০,০০০ টাকা
- ২০২৩ সাল: ১,০০,০০০ টাকা
- জানুয়ারি ২০২৫: ১,৩৮,২৮৮ টাকা
- জানুয়ারি ২০২৬: ২,৫৭,১৯১ টাকা
সবচেয়ে বড় লাফটি এসেছে গত এক বছরে—প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার টাকা।
কবে ছুঁতে পারে তিন লাখ?
গত ১২ মাসের গড় হিসাব করলে দেখা যায়, স্বর্ণের দাম মাসে গড়ে প্রায় ৯,৫০০ থেকে ১০,০০০ টাকা করে বেড়েছে। এই হারে চললে ৩ লাখে পৌঁছাতে সময় লাগার কথা প্রায় ৪–৫ মাস, অর্থাৎ মে–জুন ২০২৬।
তবে বাস্তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দাম আরও দ্রুত বাড়ছে। যদি মাসিক বৃদ্ধি ১৫–২০ হাজার টাকায় পৌঁছে যায়—যা বর্তমান বাজারচাপ বিবেচনায় অসম্ভব নয়—তাহলে মাত্র ২.৫–৩ মাসেই ৩ লাখ অতিক্রম করতে পারে স্বর্ণ।
এই হিসাবে বাজারের সবচেয়ে সম্ভাব্য সময়সীমা দাঁড়াচ্ছে মার্চ থেকে এপ্রিল ২০২৬।
কেন এত দ্রুত বাড়ছে দাম?
বিশ্লেষকদের মতে, তিনটি প্রধান কারণ একসাথে কাজ করছে—
টাকার ওপর আস্থার অবনতি:
মানুষ ভবিষ্যতে ক্রয়ক্ষমতা কমার আশঙ্কায় নগদের বদলে স্বর্ণে ঝুঁকছে। এটিকে অর্থনীতিবিদরা মুদ্রার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ‘নীরব ভোট’ বলছেন।
মূল্যস্ফীতির চাপ:
নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য রক্ষা করতে স্বর্ণ হয়ে উঠছে এক ধরনের আর্থিক ঢাল।
বিকল্প বিনিয়োগের সংকট:
শেয়ারবাজারের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ও আবাসন খাতে মন্দার কারণে নিরাপদ বিনিয়োগের অপশন সীমিত। ফলে স্বর্ণই হয়ে উঠছে প্রধান আশ্রয়।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে গোল্ড র্যালি ও ডলারের চাপ, যা স্থানীয় বাজারে দ্বিগুণ প্রভাব ফেলছে।
ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—দুই পক্ষই বিপাকে
উচ্চ দামের কারণে স্বর্ণের বিক্রি গত এক বছরে প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। নতুন গহনা কেনা কমিয়ে অনেকেই পুরোনো স্বর্ণ দিয়ে কাজ চালাচ্ছেন। এতে কারিগরদের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়ছে, অন্যদিকে বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠানে বাড়ছে পারিবারিক চাপ।
অর্থনীতির আগাম সতর্কবার্তা
বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণের দাম কেবল একটি পণ্যের মূল্য নয়—এটি ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক বাস্তবতার আগাম সূচক। ইতিহাস বলছে, যখন স্বর্ণ দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হয়, তখন সাধারণত সামনে থাকে মুদ্রার অবমূল্যায়ন, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বর্ণের এই গগনচুম্বী যাত্রা নীতিনির্ধারকদের জন্য স্পষ্ট সতর্ক সংকেত। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বাজারে আস্থা ফেরানো এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি না হলে তিন লাখ শুধু প্রথম ধাপ হতে পারে—এর পরের উচ্চতাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।





