দ্য ডেইলি করপোরেট ডেস্ক
ঢাকা, ২৬ আগস্ট ২০২৬:
ঢাকার উত্তরাঞ্চলের জলাবদ্ধতা কমানো, তুরাগ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং গোরান চটবাড়ী রিটেনশন পন্ড এরিয়া (GRPA) সংরক্ষণে ৫৬৭ কোটি ৪ লাখ টাকার একটি বড় প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। প্রকল্পটির প্রায় ৭৫ শতাংশ অর্থ বিশ্বব্যাংকের ঋণ থেকে আসবে।
‘মেট্রো ঢাকা প্রকল্প—গোরান চটবাড়ী রিটেনশন পন্ড ও তুরাগ নদী সুরক্ষা ও সংরক্ষণ প্রকল্প, প্রথম পর্যায়’ নামের উদ্যোগটি পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (BWDB) বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ডিসেম্বর ২০২৮ পর্যন্ত।
প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ১৪২ কোটি ৩২ লাখ টাকা, আর বিশ্বব্যাংক থেকে প্রকল্প ঋণ হিসেবে আসবে ৪২৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
শুধু নদী খনন নয়, গুরুত্ব পাচ্ছে পুরো জলব্যবস্থা
প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য কেবল তুরাগ নদী খনন নয়; বরং নদী, জলাধার, খাল ও আশপাশের নগর এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনা।
প্রকল্পের আওতায় তুরাগ নদী ও GRPA-এর পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানো, অবৈধ দখল প্রতিরোধ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং নদীর পরিবেশগত কার্যকারিতা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে মিরপুর, পল্লবী, রূপনগর, কালশী, মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট, মিরপুর ডিওএইচএস, ইস্টার্ন হাউজিং, উত্তরা, বিমানবন্দর ও বাউনিয়া এলাকায়। এসব এলাকায় বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশনের ওপর তুরাগ ও সংশ্লিষ্ট জলাধারগুলোর সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রায় ৪০ লাখ ঘনমিটার পলি ও বর্জ্য অপসারণ
প্রকল্পের অন্যতম বড় অংশ হলো নদী ও জলাধার থেকে বিপুল পরিমাণ পলি, মাটি ও দূষিত বর্জ্য অপসারণ।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, তুরাগ থেকে প্রায় ২৬ লাখ ৯০ হাজার ঘনমিটার উপাদান গ্র্যাব ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে অপসারণ করা হবে। পাশাপাশি আরও প্রায় ১৩ লাখ ৩ হাজার ঘনমিটার মাটি ও পলি খনন বা ড্রেজিং করা হবে। এসব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্যও প্রকল্পে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
নদীর তীরবর্তী এলাকায় প্রায় ৫.০৩৫ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে এবং ২ কিলোমিটার ইকোসিস্টেম উন্নয়ন এলাকা তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি তুরাগ ও GRPA-এর চারপাশে পরিবেশগত বাফার জোন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
খাল ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও বিনিয়োগ
নদীতে কঠিন বর্জ্য প্রবেশ ঠেকাতে দ্বিগুণ খাল ও রূপনগর খালে দুটি স্বয়ংক্রিয় যান্ত্রিক ট্র্যাশ র্যাক স্থাপন করা হবে।
পানির গুণগত মান ও অক্সিজেনের মাত্রা উন্নত করতে স্থাপন করা হবে ৯১টি ফাউন্টেন-কাম-এয়ারেটর। একই সঙ্গে একটি পানি মান নিশ্চিতকরণ প্ল্যান্ট এবং তিনটি পাম্পহাউসের পুনর্বাসন ও সংস্কার করা হবে।
পাম্পহাউসগুলোর কার্যক্রম সচল রাখতে একটি পৃথক বিদ্যুৎ সুবিধাও নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
তুরাগের সংকট শুধু জলাবদ্ধতার নয়
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বংশী নদী থেকে তুরাগের উৎপত্তি। সাভারের বিরুলিয়ায় নদীটি দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে একটি শাখা কর্ণতলী নদীতে এবং মূল প্রবাহ আমিনবাজারে গিয়ে বুড়িগঙ্গায় মিশেছে।
প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ তুরাগ ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক নিষ্কাশনপথ। কিন্তু দীর্ঘদিনের শিল্পায়ন, নদী দখল, ভূমি ভরাট এবং অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্যের কারণে নদীটির পরিবেশগত সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তুরাগের পাশাপাশি বুড়িগঙ্গা, টঙ্গী খাল, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর ওপরও শিল্পবর্জ্য ও নগর সম্প্রসারণের চাপ রয়েছে। বিশেষ করে টেক্সটাইল, ডাইং ও অন্যান্য শিল্পকারখানা থেকে অপরিশোধিত রাসায়নিক ও ভারী ধাতব বর্জ্য জলাশয়গুলোর পানির মানকে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
ঢাকার ‘ব্লু নেটওয়ার্ক’ তৈরির বড় পরীক্ষা
বিশেষজ্ঞ দৃষ্টিতে প্রকল্পটির গুরুত্ব কেবল একটি নদী পুনরুদ্ধারে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ঢাকার ‘ব্লু নেটওয়ার্ক’ বা সমন্বিত জলব্যবস্থা পুনর্গঠনের বৃহত্তর ধারণার সঙ্গে যুক্ত।
প্রকল্প নথিতে নদীর পরিবেশ পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি জলসম্পদভিত্তিক নগর পরিকল্পনা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং খাল পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এসব উদ্যোগ সফল হলে জলাবদ্ধতা মোকাবিলার পাশাপাশি নগর পরিবহন, জনপরিসর এবং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে প্রকল্পটির বাস্তব সাফল্য নির্ভর করবে দখল উচ্ছেদ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যতে পুনরায় নদী ও জলাধার দখল ঠেকানোর সক্ষমতার ওপর। শুধু ড্রেজিং করে তুরাগকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়—নদীর প্রবাহ, পানির মান এবং আশপাশের ভূমি ব্যবস্থাপনাকে একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নেওয়া এই উদ্যোগ তাই ঢাকার জন্য একটি অবকাঠামো প্রকল্পের পাশাপাশি নগর পরিবেশ ও জলবায়ু সহনশীলতা পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। সফল বাস্তবায়ন হলে তুরাগ ও GRPA শুধু জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে নয়, ভবিষ্যৎ ঢাকার পরিবেশগত অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে নতুন ভূমিকা নিতে পারে।




