লেখকঃ কাজী গনিউর রহমান
সরকার ও নিয়োগকর্তা প্রতিনিধি-সম্মিলিত ট্রাইপার্টাইট কমিটি দেশে শ্রম আইন সংস্কারের বেশিরভাগ স্পর্শকাতর বিষয়ে সমাধান পৌঁছে দিয়েছে, যা আনুষ্ঠানিক সেক্টরের কর্মীদের পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে বলে শ্রম মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। সাম্প্রতিক আলোচনা ও চূড়ান্তকরণের খসড়া অনুযায়ী আগামী বাংলাদেশ লেবার অর্ডিন্যান্স-২০২৫ (Bangladesh Labour Ordinance 2025) প্রণয়ন করতে প্রায় ১২৪টি ধারা সংশোধন বা সংযোজন করা হচ্ছে এবং এই প্রস্তাবনার অধিকাংশে (প্রায় ১২২টি নিয়ম) অংশী পক্ষগুলো একমত হয়েছে।
কোন কোন পরিবর্তনে ঐক্য হয়েছে?
কমিটির আলোচনায় যেসব মূল বিষয়ে ইতোমধ্যে সাধারণ সহমত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- ফ্যাক্টরিজ ও বড় প্রতিষ্ঠানে প্রভিডেন্ট ফান্ড (Provident Fund) বাধ্যতামূলক করার খসড়া বিধান;
- মিনিমাম বেতন নির্ধারণ প্রক্রিয়ার পুনর্বিবেচনা ও অনিয়মিতভাবে নয়, নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সিতে (প্রস্তাবিত: প্রতি ৩ বছর) এর পুনর্মূল্যায়ন;
- কর্মক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষা ও শ্রমিকদের কল্যাণ বর্ধনে অন্যান্য প্রশাসনিক পদক্ষেপ।
এই বিষয়গুলো নিয়ে নিয়োগকর্তা, সরকার ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শেষে মৌলিক সমঝোতা গড়ে উঠেছে।
বাকি বিরোধের দুইটি “গরম” বিল—সংঘটন ও CBA
যাহোক, সবকিছুতে সমঝোতা হয়নি। নোটযোগ্য দুইটি বিষয় যেখানে নিয়োগকর্তারা এখনও সম্পূর্ণ রাজী হননি:
১) ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের ন্যূনতম কর্মী সংখ্যা — শ্রমিকদের দাবি ছিল ইউনিয়ন গঠন সহজ করা হোক; খসড়া আলোচনায় ২০ জন কর্মী থাকা শর্তে ইউনিয়ন গঠনের প্রস্তাব উল্লেখ এসেছে, কিন্তু নিয়োগকর্তারা এর ব্যাপারে আপত্তি উত্থাপন করেছেন।
২) কনসেক্টিভ বাণিজ্যিক (CBA) এ নির্বাচনের বিধান — কোন সংখ্যাগরিষ্ঠতা স্বীকৃত হবে তা নিয়েও সমঝোতা অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। এই দুই দফায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য আরও বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে জানানো হয়েছে।
প্রতিক্রিয়া
শ্রম অধিদপ্তর, আইএলও ও বেসরকারি সামাজিক অংশী প্রত্যক্ষভাবে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে; দেশ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী শ্রমবিধি সমন্বয়ের দিকে আগাচ্ছে—আইএলও-র সঙ্গে সমন্বয়ও বাড়ছে বলে সূত্র জানায়।
অন্যদিকে নিয়োগকর্তা সংগঠনগুলো—বিশেষত Bangladesh Employers’ Federation (BEF)—সতর্কভাব ব্যক্ত করেছে যে অত্যাধিক বা অনানুষ্ঠানিক পরিবর্তন বাজার-স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি শ্রমিক সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা ও নিয়মালিপি খুব সহজ করে ফেলা হয়, তাহলে পারিশ্রমিক, উৎপাদন কাঠামো ও বৈদেশিক বিনিয়োগে উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।
সময়সীমা — কখন আইন বদলানো হবে?
সরকার আগেই কিছু সময়সীমা দেয়া আছে: গত কিনা এক পর্যায়ে সরকারের দিক থেকে জানানো হয়েছিল যে খসড়া সংশোধন প্রক্রিয়া পরে আগামী মার্চ পর্যন্ত শেষ করার লক্ষ্য আছে, আর কিছু বার্তা–আরও সাম্প্রতিক আলোচনায়—কয়েকটি সূত্রে অক্টোবরের মধ্যে খসড়া চূড়ান্ত করার কথাও এসেছে। অতএব চূড়ান্ত আইন গ্রহণের নির্দিষ্ট দিনজান এখনও শেষ হয়নি; সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরবর্তী বৈঠক ও কনসেনসাস অনুযায়ী রোডম্যাপ নির্ধারিত হবে।
পরিবর্তন হলে কী প্রভাব পড়বে?
- কর্মীদের স্বার্থে সুফলঃ সামাজিক সুরক্ষা (Provident Fund) বাধ্যতামূলক হলে ভবিষ্যৎ-নিরাপত্তা বাড়বে; নিয়মিত মজুরির পুনর্মূল্যায়ন হলে উপযুক্ত জীবনযাত্রার সুযোগ বাড়ানোর মার্গ তৈরি হতে পারে।
- নিয়োগকর্তার উদ্বেগঃ অতিদ্রুত বা অসংগত ভাবে প্রয়োগ করলে উৎপাদন খরচ বাড়তে পারে ও কর্মসংস্থান হ্রাস পেতে পারে—ফলে সরকারকে এখানে সূক্ষ্ম সমন্বয় বজায় রাখতে হবে।
- আইএলও-কমপ্লায়েন্সঃ আন্তর্জাতিক বাজার ও ব্র্যান্ডগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ ও রফতানি খাতে সুনাম রক্ষার জন্য ILO মানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতি রাখতে হবে—এটি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক দিক।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১। সরকার ঠিক কী বদলাতে চায়?
উত্তরঃ খসড়া-খাতে ১২৪টি ধারা সংশোধন/সংযোজনের প্রস্তাব রয়েছে; তাতে প্রভিডেন্ট ফান্ড বাধ্যতামূলককরণ, নিয়মিতভাবে মিনিমাম বেতন নির্ধারণ ও শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত।
প্রশ্ন ২। ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে কি সহজতা আসবে?
উত্তরঃ খসড়া আলোচনা অনুযায়ী ২০ কর্মীর অনুপাতে ইউনিয়ন গঠনের প্রস্তাব এসেছে—কিন্তু নিয়োগকর্তারা এ বিষয়ে এখনও পূর্ণ সম্মত না; এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাকি আছে।
প্রশ্ন ৩। আইনটি কবে কার্যকর হবে?
উত্তরঃ সরকারি পদক্ষেপের রোডম্যাপ ও অংশী পক্ষের সমঝোতা অনুসারে এটি ২০২৫-২০২৬ পর্যায়ে বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা আছে; নির্দিষ্ট তারিখ সংক্রান্ত চূড়ান্ত ঘোষণা বাকি।



