spot_imgspot_imgspot_imgspot_img

রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোতে বাড়ছে খেলাপি ঋণ — সংকটে জনতা-রূপালি-অগ্রণী

লেখকঃ কাজী গণিউর রহমান 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুসারে চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের ক্লাসিফাইড  লোন (বেয়াদী/অবহিত) গত ছয় মাসে প্রায় ১০% বাড়ে এবং জুন ২০২৫ শেষে তা দাঁড়ায় ১,৪৬,৩৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১,৩২,৪৯৯ কোটি টাকা অর্থাৎ, ৯০%–এর অধিকই ‘ব্যাড/লস’ ক্যাটাগরিতে যেখানে প্রতিশ্রুতিমান অর্থ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা কম। এই পরিস্থিতি নিয়ে বাজার-বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, সরকারি ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন না হলে তাদের টেকসইতাই গুরুতর প্রশ্নবিদ্ধ হবে। 

কী ঘটেছে — সংক্ষিপ্ত চিত্র

বাড়তি ক্লাসিফাইড লোন ও উচ্চ অনুৎপাদনশীল ঋণের কারণে চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের আর্থিক সূচক সংকটগ্রস্ত। মোট ক্লাসিফাইড  লোনের মধ্যে বিশাল অংশ এখন ‘ব্যাড/লস’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় পুনরুদ্ধার-ভিত্তিক ফিরতি আশা কমে গেছে—ফলত: ব্যাংকগুলোর নিজস্ব ক্যাপিটাল ও ঝুঁকি শোষক ক্ষমতা ক্ষীণ হচ্ছে। 

ব্যাংকভিত্তিক অবস্থা 

নিচে প্রতিটি ব্যাংকের প্রধান সূচকের সংক্ষিপ্ত চিত্র —

জনতা ব্যাংক পিএলসি (Janata Bank PLC) — সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায়; মোট ঋণের প্রায় ৭৬% অনুৎপাদিত। অনুৎপাদিত ঋণের পরিমান টাকা ৭২,১০৭ কোটি। ব্যাংকের ক্যাপিটাল অ্যাডিকোয়েসি রেশিও (CAR) নেতিবাচক -৩.২৫%, যা বিধিবদ্ধ মাপকাঠির তুলনায় যথেষ্ট নীচে। একই সময়ে প্রথম ছয় মাসে ব্যাংক টাকা ২,০৭১ কোটি নেট ক্ষতি দেখেছে। অব্যাহত লভ্যাংশ ও ক্যাপিটাল ঘাটতির কারণে জনতা ব্যাংকের টেকসইতা প্রশ্নবিদ্ধ বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি (Agrani Bank PLC) — মোট ঋণের ৪০.৫% অনুৎপাদিত (প্রায় ৩২,২৫৭ কোটি টাকা), যার মধ্যে ৮৭% ‘ব্যাড/লস’ হিসেবে চিহ্নিত। জনগণনীয় দুর্বলতা থাকলেও ব্যাংক জুনের প্রথমার্ধে ১১৪ কোটি টাকা মুনাফা দেখিয়ে ক্ষুদ্রভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে; তবু ক্যাপিটাল অ্যাডিকোয়েসি মাত্র ১.৯৭%, যা ন্যূনতম মানের অনেক নিচে।

রূপালি ব্যাংক  (Rupali Bank PLC) — অনুৎপাদিত ঋণের হার প্রায় ৪৪%; জুনে অনুৎপাদিত ঋণ ২২,১৭৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯১% ‘ব্যাড/লস’ শ্রেণিতে। ব্যাংকের CAR মাত্র ২.৮৬%, এবং প্রথম ছয় মাসে নেট মুনাফা সংকুচিত হয়ে ৮.৩৪ কোটি টাকা এ নেমে আসে।

সোনালি ব্যাংক পিএলসি (Sonali Bank PLC) — অন্যান্যদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল: অনুৎপাদিত ঋণ মোট ঋণের ২০% পর্যায়ে, এবং CAR ১০.১০% যা কমপক্ষে বাজারের মাপদণ্ডে গ্রহণযোগ্য। প্রথম ছয় মাসে ব্যাংক ৫৯১ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। সোনালি-র এই অবস্থান সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে একটি ‘ঋণশোধন-যোগ্য’ কেন্দ্র হিসেবে প্রমাণিত হচ্ছে।

কেন এই পরিস্থিতি গুরুতর? — বিশ্লেষণ

  • ক্যাপিটাল ইমপায়ারমেন্ট: অনুৎপাদিত ঋণের উচ্চ অঙ্ক ব্যাংকের নিজের মূলধনকে ধ্বংস করে—কারণ পরিশোধযোগ্য নয় এমন ঋণের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে প্রভিশন গঠন করতে হয় এবং তা ব্যাংকের লাভকে খেয়ে নেয়। ফলত নিয়মিত ক্ষতি হলে CAR নিম্নে নেমে আসে এবং ব্যাংকিং কার্যক্রম ঝুঁকিতে পড়ে।
  • অর্থনৈতিক ঝুঁকি এবং ব্যর্থতা সঙ্কট: রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো সাধারণত বৃহৎ সরকারি প্রকল্প, ক্ষুদ্রঋণ ও রেমিট্যান্স-চ্যানেল পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে; এদের দুর্বলতা সমগ্র আর্থিক ব্যবস্থায় ধাক্কা বয়ে আনতে পারে।
  • পুনরুদ্ধার সম্ভাবনার সংকট: প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে ক্লাসিফাইড  পরিমাণের বৃহৎ অংশ ‘ব্যাড বা লস’ পর্বে চলে গেছে—যার অর্থ দীর্ঘমেয়াদে পুনরুদ্ধার-সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। এই প্রেক্ষিতে সরকারি তহবিলের মাধ্যমে ঢালনা না করলে ব্যাংকগুলোর টিকে থাকার প্রশ্ন উঠবে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা ও সম্ভাব্য সমাধান-পথ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন—দ্রুত পুনর্গঠন, শক্তিশালী কর্পোরেট গভর্ন্যান্স, কঠোর ঋণ প্রদান নীতি, এবং কার্যকর পুনরুদ্ধার কৌশল ছাড়া এই ব্যাংকগুলোর টেকসইতা নিশ্চিত করা কঠিন। সম্ভাব্য ব্যবস্থা হিসেবে বলা হচ্ছে — (ক) দুর্বল পোর্টফোলিও আংশিকভাবে সরকারিভাবে সংযুক্ত করে রিলিজটিং বা মার্জারের মাধ্যমে বড় একক ব্যাংক গঠন, (খ) অনুপস্থিতি ও দুর্নীতিমূলক চ্যানেল চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা, (গ) প্রভিডেন্ট-ফান্ড ও মুনাফা পুনরায় বিনিয়োগ না করে দ্রুত প্রভিশন বাড়ানো। এসব কথা ইতোমধ্যেই অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবেচনায় আসছে বলে সতর্ক সূত্রগুলো বলছে। 

চূড়ান্ত বিশ্লেষণ

চতুর্থার্ধে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ক্লাসিফাইড লোনের এই তীব্র বৃদ্ধি শুধুমাত্র ব্যাংকিং খাতের সমস্যা নয়—এটি জাতীয় অর্থনীতির একটি সংকেত। জনতা, রূপালি ও অগ্রণীর মতো বড় ব্যাংকগুলোর ক্যাপিটাল-শূন্যতা ও উচ্চ অনুৎপাদিত ঋণ দ্রুত সমাধান না করা হলে তা আর্থিক স্থিতিশীলতা ও সরকারি বাজেটের উপর লোড বাড়াবে। অন্যদিকে, সোনালি ব্যাংকের তুলনামূলক স্থিতিশীলতা দেখায়—সতর্কভাবে পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার নীতিমালা বাস্তবায়ন করলে কিছুটা শ্বাসরুদ্ধ অবস্থা সামলানো সম্ভব। নীতিনির্ধারকরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে পুনর্গঠন ও ব্যাংক-গভর্নেন্স শক্ত করার উদ্যোগ নিলে দেশীয় ব্যাঙ্কিং-খাত টেকসই হওয়ার পথ পাবে। 

প্রাসঙ্গিক জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১। চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মোট ক্লাসিফাইড  লোন কত?
উত্তরঃ জুন ২০২৫-এ চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ক্লাসিফাইড  লোন মোট ১,৪৬,৩৬২ কোটি টাকা (গত ছয় মাসে প্রায় ১০% বৃদ্ধি)। 

প্রশ্ন ২। জনতা ব্যাংকের অবস্থা কেন খারাপ বলে বলা হচ্ছে?
উত্তরঃ জনতা ব্যাংকের মোট ঋণের ৭৬% অনুৎপাদিত; অনুৎপাদিত ঋণের পরিমাণ ৭২,১০৭ কোটি টাকা, এবং CAP-ratio -৩.২৫%—এগুলো ব্যাংকের টেকসইতার জন্য অত্যন্ত সংকেতজনক। 

প্রশ্ন ৩। সোনালি ব্যাংকের পরিস্থিতি কেমন?
উত্তরঃ সোনালি ব্যাংকের অনুৎপাদিত ঋণ মোট ঋণের ~২০%; CAP-ratio ১০.১০% এবং প্রথম ছয় মাসে ৫৯১ কোটি টাকা নেট মুনাফা—অতএব অন্য তিনটির তুলনায় তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থা রেকর্ড করেছে।

তথ্যসূত্র 

The Business Standard — Four state banks in trouble as 90% of classified loans turn bad.

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ

বাংলাদেশ–মিয়ানমার–চীন অর্থনৈতিক করিডোরঃ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন দিগন্ত, নাকি নতুন চ্যালেঞ্জ?

লেখকঃ মুসাররাত খান চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনকে নিয়ে একটি অর্থনৈতিক করিডোর গঠনের প্রস্তাব নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত...

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত শক্তিশালী করতে, বিশ্বব্যাংকের ৪৫০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা

ঢাকা: বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে আরও স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে ৪৫ কোটি মার্কিন ডলার (৪৫০ মিলিয়ন ডলার) অর্থায়নের অনুমোদন দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এই অর্থায়ন ফাইন্যান্সিয়াল...

প্রথমবারের মতো স্বল্পমেয়াদি শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগ সুকুক চালু করল সরকার

ঢাকা: দেশের ইসলামী অর্থায়ন খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে প্রথমবারের মতো স্বল্পমেয়াদি শরিয়াহভিত্তিক বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুক (Short Term BGIS) চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ...

রপ্তানি আয় ১৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব: বাণিজ্যমন্ত্রী

ঢাকা: দেশের বার্ষিক রপ্তানি আয় বর্তমান প্রায় ৫০-৫৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ১৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী শেখ বশির উদ্দিন। মঙ্গলবার...