spot_imgspot_imgspot_imgspot_img

স্বাক্ষর জাল করে ব্যবসায়ীর নামে কোটি টাকার ঋণ, ইসলামী ব্যাংকের ৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্তে প্রমাণ

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img

দ্য ডেইলি করপোরেট ডেস্ক
ঢাকা, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬: গ্রাহকের অজান্তে স্বাক্ষর জাল করে তার প্রতিষ্ঠানের নামে কোটি টাকার ঋণ ও আমদানি দায় তৈরি করার অভিযোগ উঠেছে ইসলামী ব্যাংকের ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। চট্টগ্রামের আমদানিকারক নুরুল হুদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স আল ওয়ালিদ ট্রেডিংয়ের নামে প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা ঋণ সৃষ্টি করা হয়। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির নামে প্রায় ২ কোটি ৩৬ লাখ টাকার পণ্য আমদানির রেকর্ডও পাওয়া গেছে।

তবে নুরুল হুদার দাবি, এসব ঋণের অর্থ কিংবা আমদানিকৃত পণ্য—কোনোটিই তিনি পাননি। বরং এসব অনিয়মের কারণে তার প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে (সিআইবি) নেতিবাচক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ফলে ২০২২ সাল থেকে তার আমদানি ব্যবসা কার্যত বন্ধ হয়ে আছে।

ঘটনাটি নিয়ে করা মামলার তদন্তে প্রতারণা, দালিলিক জালিয়াতি, জাল দলিল ব্যবহার এবং হুমকির অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

সিআইডির চট্টগ্রাম ইউনিটের উপ-পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) মো. আব্দুল করিমের দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকের ছয় কর্মকর্তা যোগসাজশ করে গ্রাহকের অজান্তে তার স্বাক্ষর ব্যবহার করে ঋণ ও আমদানি-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন ইসলামী ব্যাংকের খুলশী শাখার সাবেক ম্যানেজার মোহাম্মদ মোরশেদুল আলম, তৎকালীন সেকেন্ড অফিসার মো. মহিউদ্দিন, ফরেন এক্সচেঞ্জ কর্মকর্তা মুহাম্মদ জুবায়ের আলম চৌধুরী, জুনিয়র অফিসার রাফায়েত সালাহ উদ্দিন, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুল মওলা এবং সাবেক চেয়ারম্যান ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ

খালি চেক রেখে যাওয়ার সুযোগকে কাজে লাগানোর অভিযোগ

তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নুরুল হুদা ২০২২ সালের ৯ আগস্ট ইসলামী ব্যাংকের খুলশী শাখায় মেসার্স আল ওয়ালিদ ট্রেডিংয়ের নামে একটি চলতি হিসাব খোলেন। আমদানি ব্যবসার প্রয়োজনে তিনি নিয়মিত ব্যাংকটির মাধ্যমে এলসি খুলতেন।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবার এলসি খোলার সময় ব্যাংক কর্মকর্তারা তার কাছ থেকে শুধু স্বাক্ষর করা খালি চেকসহ বিভিন্ন কাগজপত্র সংগ্রহ করতেন। এলসির বিপরীতে পণ্য দেশে আসার পর সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পণ্য খালাস এবং গ্রাহকের হিসাব থেকে অর্থ সমন্বয়ের কাজে এসব চেক ব্যবহারের কথা ছিল।

তদন্তে বলা হয়েছে, ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরবর্তী সময়ে এসব চেক ফেরত না দিয়ে নিজেদের হেফাজতে রেখে দেন। পরে ওই নথি ও চেক ব্যবহার করেই গ্রাহকের অজান্তে বিভিন্ন ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় বলে অভিযোগ।

২ কোটি ৩৬ লাখ টাকার পণ্য আমদানির রেকর্ড

সিআইডির হিসাব অনুযায়ী, মেসার্স আল ওয়ালিদ ট্রেডিংয়ের নামে চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে চায়না আপেল, চায়না আদাসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করা হয়। এসব আমদানির মোট মূল্য ছিল ১ লাখ ৯৩ হাজার ৫১৫ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা

তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, নুরুল হুদার অজান্তে রমিজ ও মনির নামে ব্যক্তিসহ অভিযুক্তদের প্রতিনিধিরা এসব পণ্য খালাস করেন। পরে পণ্যগুলো ব্যবহার করে ব্যবসা পরিচালনা, মুনাফা অর্জন এবং অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর পাশাপাশি ব্যাংকের কাছে থাকা নুরুল হুদার স্বাক্ষর করা খালি এলসি অনুমোদন ফরম ও অন্যান্য নথি ব্যবহার করে তার অজ্ঞাতে পাঁচটি মেয়াদি মুদারাবা পোস্ট ইমপোর্ট (এমপিআই) ঋণ হিসাব খোলার অভিযোগ রয়েছে।

১ কোটি ৩ লাখ টাকার ঋণ, এখনো বকেয়া ৮৭ লাখ

তদন্ত অনুযায়ী, ওই পাঁচটি ঋণ হিসাবের মাধ্যমে মোট ১ কোটি ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৩৪২ টাকা ঋণ সৃষ্টি করা হয়। এসব অর্থ আগের আমদানি দায় সমন্বয়ের কাজে ব্যবহার করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

পরবর্তী সময়ে অভিযুক্তরা কিছু অর্থ পরিশোধ করলেও বর্তমানে নুরুল হুদার প্রতিষ্ঠানের নামে ৮৭ লাখ ১৫ হাজার ২৮৩ টাকা বকেয়া রয়েছে।

ঋণের হিসাবের বিষয়ে গ্রাহককে অবহিত করার জন্য ব্যবহৃত এসএমএস অ্যালার্ট সেবাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে তার হিসাবে অর্থ জমা বা উত্তোলনের বিষয়ে কোনো নোটিফিকেশন তিনি পাননি।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ঋণ পরিশোধের নোটিশ পাওয়ার পর নুরুল হুদা প্রথমবারের মতো তার প্রতিষ্ঠানের নামে তৈরি হওয়া ঋণ ও আমদানি কার্যক্রমের বিষয়টি জানতে পারেন।

ফরেনসিক পরীক্ষায় মিলেনি স্বাক্ষর

মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে উঠে এসেছে নথির ফরেনসিক পরীক্ষা। আদালতের নির্দেশে ঋণসংক্রান্ত বিতর্কিত নথিগুলো সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়।

হস্তলিপি বিশেষজ্ঞের মতামত অনুযায়ী, ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত নথিতে থাকা স্বাক্ষরের সঙ্গে নুরুল হুদার স্বাক্ষরের স্পষ্ট অমিল পাওয়া গেছে।

এ বিষয়টিই গ্রাহকের স্বাক্ষর জাল করে নথি তৈরির অভিযোগের তদন্তে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

অভিযোগ জানানোর পর হুমকির অভিযোগ

নুরুল হুদার ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি জানার পর তিনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেন এবং পরে আইনি নোটিশও পাঠান। তার অভিযোগ, সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে তাকে গালিগালাজ, মামলা দিয়ে হয়রানি এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।

সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদনে মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাকে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতাও পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৫ সালের মার্চে মহানগর হাকিম আদালতে দায়ের করা মামলায় মোট নয়জনকে আসামি করা হয়। তদন্ত শেষে সিআইডি তিনজনকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছে। তারা হলেন ইসলামী ব্যাংকের আগ্রাবাদ জোনাল অফিস সাউথের সাবেক প্রধান মোহাম্মদ জহির উদ্দিন, মিয়া মোহাম্মদ বরকত উল্লাহ এবং মুহাম্মদ জুবায়ের আজম হেলালী

ব্যবসা বন্ধ, নেতিবাচক সিআইবি রেকর্ড

নুরুল হুদা জানান, তার প্রতিষ্ঠানের নামে অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ তৈরি হওয়ার পর তাকে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর ফলে তার আমদানি ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, নিজের নামে কতগুলো এলসি খোলা হয়েছিল এবং সেগুলোর বিপরীতে কত অর্থের লেনদেন হয়েছে, তা জানতে ব্যাংকের কাছে একাধিকবার স্টেটমেন্ট ও সংশ্লিষ্ট নথি চেয়েও সেগুলো পাননি। বরং তাকে এক শাখা থেকে অন্য শাখায় যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

সমস্যার সমাধানের জন্য শাখা, জোনাল অফিস ও প্রধান কার্যালয়ে দীর্ঘদিন যোগাযোগের পরও কার্যকর ব্যবস্থা না পাওয়ায় তিনি ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের আইনি নোটিশ দেন। পরে আদালতের শরণাপন্ন হন।

মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী নজরুল ইসলাম জানান, মামলাটি বর্তমানে চার্জ শুনানির পর্যায়ে রয়েছে। সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর মামলাটি বিচার শুরুর প্রাথমিক ধাপে পৌঁছেছে।

তবে তদন্ত প্রতিবেদনে তিনজনকে অব্যাহতির সুপারিশ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন বাদীপক্ষের আইনজীবী। তার দাবি, ওই ব্যক্তিরা সরাসরি জড়িত না থাকলেও পরোক্ষভাবে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।

এ বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে মামলার এক নম্বর আসামি মোহাম্মদ মোরশেদুল আলম মামলা বিচারাধীন থাকায় মন্তব্য করতে চাননি। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ইসলামী ব্যাংকের খুলশী শাখার বর্তমান ম্যানেজার মো. আবুল মনসুরও আদালতে বিচারাধীন বিষয় হওয়ায় এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

উল্লেখ্য, তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা অভিযোগগুলো আদালতে বিচারাধীন এবং অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টি আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।

সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (TBS)

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ

AI-এর যুগে কোন দক্ষতাগুলোর চাহিদা সবচেয়ে বেশি বাড়বে?

লেখকঃ মালিহা মেহেজাবিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা Artificial Intelligence (AI) ইতোমধ্যে শিক্ষা, ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যাংকিং, সফটওয়্যার ও সৃজনশীল কাজসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে।...

আমানত ফেরত দেওয়া শুরু সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের, গ্রাহকদের হাতে যাচ্ছে টাকা

দ্য ডেইলি করপোরেট ডেস্ক ঢাকা, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬: পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের একীভূতকরণে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি আনুষ্ঠানিকভাবে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।...

ব্যবসার আইডিয়া আছে? সর্তছাড়াই তরুণদের জন্য ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন করবে বাংলাদেশ ব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক ব্যবসা করার ইচ্ছা আছে, কিন্তু শুরু করার মতো পর্যাপ্ত মূলধন নেই—এমন তরুণদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ভালো ব্যবসায়িক ধারণা...

১ বিলিয়ন ডলারের ঋণ, ৩১ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প: তিন গুণ হবে ইআরএলের সক্ষমতা

দ্য ডেইলি করপোরেট ডেস্ক ঢাকা, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬: দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের আমদানিনির্ভরতা কমাতে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণে...