লেখকঃ রাহানুমা তাসনিম সুচি
বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে ঘিরে নতুন করে আশার আলো জেগেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এই খাত থেকে এক লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে এবং অর্জিত হতে পারে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত রপ্তানি আয়। সঠিক পরিকল্পনা, পরিবেশবান্ধব কার্যক্রম এবং নীতি সহায়তা থাকলে এ সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে পারে।
অর্থনীতিবিদ ড. জায়েদি সাত্তার সম্প্রতি ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশ (IBFB) আয়োজিত এক সেমিনারে এ সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে টেকসই করতে হলে পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণ করতে হবে এবং একটি সহায়ক কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। তা হলে কেবল রপ্তানি আয়ই বাড়বে না, বরং বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী একটি প্রতিযোগিতামূলক Shipbuilding Hub হিসেবে পরিচিত হবে।”
কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত
বাংলাদেশের তরুণ কর্মশক্তি দিন দিন বাড়ছে। সঠিকভাবে দক্ষতা কাজে লাগাতে পারলে জাহাজ নির্মাণ শিল্প নতুন প্রজন্মের জন্য এক লাখের বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। প্রকৌশল, ডিজাইন, প্রযুক্তি, লজিস্টিকস থেকে শুরু করে বিপণন ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা—সবখানেই নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হবে।
এটি দেশের বেকারত্ব কমাতে যেমন ভূমিকা রাখবে, তেমনি বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে আরও শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে গ্রামীণ পর্যায়ে ক্ষুদ্র শিল্প ও আনুষঙ্গিক ব্যবসার প্রসার ঘটবে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করে তুলবে।
রপ্তানি আয়ের সম্ভাবনা
বিশ্বব্যাপী জাহাজ নির্মাণ শিল্পের বাজার বিশাল। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি আকারের জাহাজ তৈরিতে বাংলাদেশের সক্ষমতা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী ডিজাইন ব্যবহার করা গেলে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরে বাংলাদেশ এই খাত থেকে প্রায় এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত রপ্তানি আয় করতে পারবে।
এর ফলে পোশাকশিল্প নির্ভর রপ্তানি আয়ের ওপর চাপ কমবে এবং অর্থনীতিতে নতুন বৈচিত্র্য আসবে।
শিল্প উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ
বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে কিছু নীতি সহায়তা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে:
- নগদ সহায়তা (Cash Assistance): রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক প্রণোদনা প্রদান।
- শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি: উৎপাদন খরচ কমাতে ও মানসম্মত পণ্য তৈরি করতে সহায়ক হবে।
- সম্পর্কিত শিল্প খাতের উন্নয়ন: ইস্পাত, যন্ত্রাংশ, প্রযুক্তি সরবরাহকারী শিল্পগুলোকে শক্তিশালী করা।
- স্বল্পসুদে ঋণ সুবিধা: উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগ সহজ করা।
- মূলধন বিনিয়োগ বৃদ্ধি: বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে কর ও নীতি সহায়তা।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে শিল্পখাতে পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি হবে এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও বাড়বে।
আরও পড়ুন:৯টা-৫টা চাকরিতে ক্যারিয়ার এগোয় নাকি পুড়ে যায় স্বপ্ন?
পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের গুরুত্ব
বিশ্ব আজ টেকসই উন্নয়নের দিকে এগোচ্ছে। তাই পরিবেশবান্ধব জাহাজ নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও পরিবেশসম্মত প্রযুক্তি গ্রহণ করলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।
পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণ করলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশের দিকে আরও বেশি আস্থা রাখবে, যা রপ্তানি চুক্তি বাড়াতে সাহায্য করবে।
সেমিনারে বিশেষজ্ঞদের মতামত
সেমিনারে উপস্থিত শিল্প উদ্যোক্তা, নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা একমত হন যে, সরকারের সময়োপযোগী সহায়তা এবং বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এ খাতের উন্নয়ন সম্ভব নয়।
তারা বলেন, “বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই পোশাক খাতে বৈশ্বিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। এবার সময় এসেছে জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে একইভাবে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার।”
উপসংহার
বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পে রয়েছে বিশাল সম্ভাবনা। এটি শুধু রপ্তানি আয়ের নতুন ক্ষেত্র নয়, বরং কর্মসংস্থানের একটি শক্তিশালী উৎসও বটে। সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ প্রচেষ্টায় যদি পরিবেশবান্ধব কার্যক্রম, নীতি সহায়তা ও আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, তবে আগামী দিনে বাংলাদেশ বিশ্বমানের জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো





