ঢাকা, ১৬. ০২. ২০২৬: এলপি গ্যাসের ওপর ভ্যাট কাঠামোয় পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ের বিদ্যমান ভ্যাট প্রত্যাহার করে আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট আরোপের মাধ্যমে কর ব্যবস্থাকে পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি শুধু দাম কমানোর পদক্ষেপ নয়; বরং পুরো এলপি গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ করার একটি নীতিগত উদ্যোগ।
কর কাঠামোয় কী পরিবর্তন এলো
এতদিন স্থানীয় উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট এবং আমদানির সময় ২ শতাংশ অগ্রিম কর (AT) পরিশোধ করতে হতো। ফলে একই পণ্যের ওপর একাধিক ধাপে কর আরোপ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে মূল্য বেড়ে যেত।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী—
- উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ের ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে
- আমদানি পর্যায়ে ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে
- ফলে মাল্টি-স্টেজ ট্যাক্সেশন কমে একধাপভিত্তিক কর কাঠামো তৈরি হয়েছে
নীতিনির্ধারকদের মতে, এতে করের পুনরাবৃত্তি (tax cascading effect) কমবে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে অতিরিক্ত ব্যয় হ্রাস পাবে।
কেন এ সিদ্ধান্ত
এলপি গ্যাস বর্তমানে বাংলাদেশের শহর ও গ্রাম—দুই এলাকাতেই রান্নার জ্বালানি হিসেবে দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ সীমিত হওয়ায় এলপি গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। বাজার সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, বিদ্যমান কর কাঠামো ব্যবসা পরিচালনার খরচ বাড়াচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই বেশি দাম দিতে হচ্ছে।
সরকারের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপি গ্যাসের দামের ওঠানামার সঙ্গে অভ্যন্তরীণ কর কাঠামো সামঞ্জস্যপূর্ণ না থাকায় মূল্য অস্থিতিশীলতা তৈরি হচ্ছিল। নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হবে।
বাজারে সম্ভাব্য প্রভাব
বিশ্লেষকদের ধারণা, করের স্তর কমে যাওয়ায় আমদানি থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত সামগ্রিক খরচ কমবে। এর ফলে এলপি গ্যাসের দাম পূর্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কমার সুযোগ তৈরি হয়েছে। শিল্প সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, বাস্তবায়ন সঠিকভাবে হলে ভোক্তা পর্যায়ে দাম প্রায় ১৫–২০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, শুধু কর কমালেই দাম কমবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বাজারে প্রতিযোগিতা, আমদানিকারকদের মূল্য নির্ধারণ কৌশল এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
রাজস্ব ও নীতিগত ভারসাম্য
কর পুনর্বিন্যাসের ফলে সরকারের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কারণ, ভ্যাট পুরোপুরি তুলে দেওয়া হয়নি; বরং সংগ্রহের ধাপ পরিবর্তন করা হয়েছে। আমদানি পর্যায়ে কর আরোপ করলে রাজস্ব সংগ্রহ আরও সহজ ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য হয়, যা কর ফাঁকি কমাতেও সহায়ক হতে পারে।
ভোক্তাদের জন্য কী বার্তা
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি বাজার তদারকি জোরদার করা যায় এবং কর কমানোর সুবিধা সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছায়, তাহলে এটি মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য বড় স্বস্তি হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও শহরতলির পরিবারগুলো, যারা পাইপলাইন গ্যাসের বাইরে রয়েছে, তারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে।
সব মিলিয়ে, এলপি গ্যাসের ওপর ভ্যাট পুনর্বিন্যাসকে স্বল্পমেয়াদে মূল্য কমানোর উদ্যোগ এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি বাজারকে কাঠামোগতভাবে স্থিতিশীল করার একটি নীতিগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। এখন নজর থাকবে—এই সুবিধা বাস্তবে কত দ্রুত ভোক্তার রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছায়।





