লেখকঃ আফসানা তাসনীম
বিদেশে বিনিয়োগ শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মুনাফা অর্জনের উপায় নয় বরং এটি দেশের সাথে বৈশ্বিক সংযোগ স্থাপন করে এবং অর্থনৈতিক বৈচিত্রের দ্বার উন্মোচন করে। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে বিনিয়োগে বেশ কিছু বিধি নিষেধ থাকলেও বর্তমানে নতুন আইন এবং নীতিমালা তৈরীর মাধ্যমে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। যার মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা বিদেশে বিনিয়োগ করে প্রতিষ্ঠান এবং দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকার বৈদেশিক বিনিয়োগে কঠোরতা অবলম্বন করলেও এখন তার প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়েছে। বিশেষত ২০১৬ সালের পর থেকে পরীক্ষামূলকভাবে বৈদেশিক বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি এবং 2022 সালে আউট বাউন্ড ইনভেস্টমেন্ট গাইডলাইন্স এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বৈদেশিক বিনিয়োগের পথ আরো উন্মোচিত করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে মানতে হবে ১৯৪৭ সালের Foreign exchange Regulation Act (FERA) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত নীতিমালা গুলো। FERA আইন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার এর মাধ্যমে বিনিয়োগের গ্রহণযোগ্যতা এবং নীতিমালা গুলো উল্লেখ করা হয়ে থাকে। তবে অনুমোদন ব্যতীত অর্থ বিনিয়োগ করা কিংবা অবৈধ চ্যানেল ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ যা মানি লন্ডারিং আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত হবে।
বিনিয়োগ করতে হলে একটি কোম্পানির যে সকল যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন :
- বিনিয়োগকারী কোম্পানির গত তিন বছরের গড় রপ্তানি আয় থাকতে হবে।
- শেষ তিন বছরের অডিটেড রিপোর্ট জমা দিতে হবে যাতে কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা প্রমাণিত হয়।
- সম্ভাব্যতা যাচাই রিপোর্ট, ROI বিশ্লেষণ, Break-even analysis থাকতে হবে।
- বোর্ড রেজোলিউশন বা কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত থাকতে হবে বিদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে।
- Host Country-এর অনুমোদন ও আইনি সম্মতি অর্থাৎ যে দেশে বিনিয়োগ করা হবে সেখানে কার্যক্রম পরিচালনার আইনি সুযোগ ও ব্যবসার অনুমোদন থাকতে হবে।
- হোস্ট কান্ট্রির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি (Bilateral Investment Treaty) বা মুনাফা repatriation এর বিধান থাকতে হবে।
- ইতিহাসে কোনো ব্যাংক ঋণ খেলাপি থাকা যাবে না।
যে সকল নিয়ম অনুসারে বৈদেশিক বিনিয়োগ করা যাবে
১. বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি
বিদেশে কোনো ধরনের বিনিয়োগ করতে হলে সর্বপ্রথম বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমতি নিতে হবে । বিনিয়োগকারী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানিকে নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করতে হবে। BIDA (Bangladesh Investment Development Authority) ও BEZA (Bangladesh Economic Zones Authority) নির্দিষ্ট ক্ষেত্রগুলোতে বিদেশি বাজারে এক্সপানশনের জন্য কিছু প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দিতে পারে।
২. বিশেষ খাতভিত্তিক অনুমোদন
বাংলাদেশ ব্যাংক শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু খাত বা ক্ষেত্রের জন্যই বিদেশে বিনিয়োগের অনুমতি দিতে পারে, যেমন:
- উৎপাদনশীল খাতে (Manufacturing or Processing Industries)
- সার্ভিস সেক্টর (ICT, Hospitality etc.)
- সাপ্লাই চেইন রিলেটেড বিজনেস
- মেরিট-ভিত্তিক অন্যান্য ক্ষেত্র
গাইডলাইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ বিনিয়োগ: Paid-up Capital এর ২০% বা Bangladesh Bank নির্ধারিত সীমা।
৩. Joint Venture বা Wholly Owned Subsidiary
বাংলাদেশি কোম্পানি বিদেশে কোনো কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে ব্যবসা করতে পারবে (Joint Venture) অথবা এককভাবে সাবসিডিয়ারি গঠন করতে পারবে, কিন্তু অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের ভিত্তিতে।
৪. আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও ক্যাপ
বিদেশে বিনিয়োগের জন্য:একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে অর্থ পাঠানো যায়, যা বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারণ করে।
সাধারণত কোম্পানির গত কয়েক বছরের গড় রপ্তানি আয়ের একটি নির্দিষ্ট শতাংশের বেশি বিনিয়োগ করা যায় না।
৫. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
আবেদনের সাথে নিম্নোক্ত ডকুমেন্ট জমা দিতে হয়:
- ডিটেইল প্রজেক্ট প্রোপোজাল
- বোর্ড রেজোলিউশন
- অডিটেড ফিন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট
- রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট (ROI) বিশ্লেষণ
- হোস্ট কান্ট্রির আইন ও অনুমোদন
- সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সুপারিশপত্র
৬. বিনিয়োগের রিপোর্টিং ও রেগুলার মনিটরিং
অনুমোদিত বিনিয়োগের কার্যক্রম সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকে নিয়মিত রিপোর্ট দিতে হবে। যেমন:
১.আয়-ব্যয়ের হিসাব
২.ডিভিডেন্ড বা মুনাফা repatriation রিপোর্ট
৩.ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে লেনদেন
উপসংহার :
বৈদেশিক বিনিয়োগ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দ্বার উন্মোচন করলেও বেশ কিছু ঝুঁকি কিংবা জটিলতা থেকেই যায়। প্রথমত বাংলাদেশ সরকারের বৈদেশিক বিনিয়োগে কঠোরতা অবলম্বন। ২০২২ সালে আউট বাউন্ড ইনভেস্টমেন্ট গাইডলাইন্স এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বৈদেশিক বিনিয়োগ এর অনুমতি প্রদান করা হলেও ২০২৩ সালের পর থেকে ডলার রিজার্ভ সংকটের কারণে বিনিয়োগের সুযোগ আবারো সীমিত করা হয়েছে।এক্ষেত্রেও বিনিয়োগের প্রক্রিয়া জটিল এবং দীর্ঘ। নীতিমালাগুলো অনেক ক্ষেত্রে স্পষ্ট নয় বা জটিল, যা উদ্যোক্তাদের জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।
অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের অনভিজ্ঞতা ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত জটিলতাও বাধা সৃষ্টি করতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজার সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা না থাকায় অনেক ব্যবসায়ী বিদেশে কার্যকরভাবে বিনিয়োগ করতে পারেন না।
বৈদেশিক সম্পর্ক, বিনিয়োগকৃত দেশের রাজনৈতিক অবস্থা, যুদ্ধবিগ্রহ ইত্যাদি কারণেও কোম্পানি ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।ডলার সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রা স্থানান্তরে কড়াকড়ি ও নিয়ন্ত্রণের কারণে বিনিয়োগকারীদের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়।বাংলাদেশের মানুষ স্বভাবতই অধিক ঝুঁকি গ্রহণে অনাগ্রহী হওয়ায় এ সকল বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে।
বিদেশে বিনিয়োগ করতে চাইলে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। রাখতে হবে প্রয়োজনীয় ব্যাকআপ প্ল্যান যাতে ঝুঁকি হ্রাস করে মুনাফা ও মূলধন ফিরিয়ে আনা যায়। মনে রাখতে হবে বৈধ উপায়ে সঠিক খাতে বিনিয়োগ করতে পারলে কোম্পানির পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিও লাভবান হবে।
প্রশ্নোত্তর (FAQ)
১.বাংলাদেশ থেকে বৈদেশিক বিনিয়োগ করতে কী কী শর্ত পূরণ করতে হয়?
উত্তর :বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমতি নিতে হয়। কোম্পানির গত তিন বছরের গড় রপ্তানি আয়, অডিটেড ফাইনান্সিয়াল রিপোর্ট, ROI বিশ্লেষণ, সম্ভাব্যতা যাচাই রিপোর্ট এবং কোম্পানির বোর্ড রেজোলিউশন থাকতে হবে। পাশাপাশি হোস্ট দেশের অনুমোদন ও আইন মেনে চলতে হয়।
২. বৈদেশিক বিনিয়োগের জন্য কোন কোন খাত অনুমোদিত?
উত্তর : সাধারণত উৎপাদনশীল খাত, সার্ভিস সেক্টর (যেমন আইসিটি, হসপিটালিটি), সাপ্লাই চেইন সম্পর্কিত ব্যবসা এবং মেরিট-ভিত্তিক অন্যান্য খাত অনুমোদিত। তবে বিনিয়োগের ধরন অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ অনুমতি দিতে পারে।
৩. বিনিয়োগের জন্য সর্বোচ্চ সীমা কত?
উত্তর : বাংলাদেশ ব্যাংক বিনিয়োগের জন্য সীমা নির্ধারণ করে। সাধারণত বিনিয়োগের পরিমাণ কোম্পানির Paid-up capital-এর ২০% বা গত কয়েক বছরের গড় রপ্তানি আয়ের একটি নির্দিষ্ট শতাংশের বেশি হতে পারে না।
৪. বৈদেশিক বিনিয়োগের আইনি কাঠামো কী?
উত্তর :Foreign Exchange Regulation Act (FERA) 1947, ২০২২ সালের Outbound Investment Guidelines, এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার ও নীতিমালা অনুযায়ী বৈদেশিক বিনিয়োগ পরিচালিত হয়। এছাড়া হোস্ট দেশের আইন ও Bilateral Investment Treaty (যদি থাকে) মেনে চলতে হয়।
তথ্যসূত্র
1. বাংলাদেশ ব্যাংক: https://www.bb.org.bd
2. বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA): https://bida.gov.bd
3. Export Promotion Bureau (EPB): https://epb.gov.bd
4. অর্থ মন্ত্রণালয়: https://mof.gov.bd
5. World Bank – Doing Business Reports: https://www.doingbusiness.org





