লিখেছেনঃ মুসাররাত খান
বাংলাদেশ হলো নিম্নভূমি ভিত্তিক জলবায়ু সংবেদনশীল দেশগুলোর মধ্যে একটি দেশ, যা বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতিতে জলবায়ুর প্রভাব অনুভব করছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, লবণাক্ততা ও তাপমাত্রার ঊর্ধ্বগতি-এসব দুর্যোগ উৎপাদন ও ব্যবসায়ের বিরূপ প্রভাব ফেলছে।এটি এমন একটি দেশ যেখানে সামুদ্রিক স্তরের বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, বৃষ্টিপাত ইত্যাদির কারণে বার্ষিকভাবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঘটেই চলছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং ঋতু পরিবর্তনের তীব্রতা সরাসরি অর্থনীতি এবং ব্যবসায় প্রভাব ফেলছে।
কেন ঝুঁকিতে বাংলাদেশ?
বাংলাদেশে দক্ষিণ এশিয়ার একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। এদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, সমুদ্র সমতল থেকে নিচু ভূমি হওয়ার কারণে এটি বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম দেশ হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি এমন একটি দেশ যেখানে প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়, খরা, বন্যা ও লবণাক্ততা মারাত্মক হারে বেড়েই চলছে।
বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন শুধুমাত্র পরিবেশগত বা সামাজিক সমস্যা নয় বরং এটি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায় বাস্তবতার রূপ নিচ্ছে। বিশ্বব্যাংক এবং IPCC অনুযায়ী, 2050 সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্ত হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে ব্যবস্থায় খাত গুলো দিনে দিনে অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। বিশেষ করে শিল্প খাত, কৃষি খাত, ক্ষুদ্র ব্যবসায় ও মেনুফ্যাকচারিং সেক্টর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
আরোও পড়ুন: ব্যর্থতা মানেই শেষ নয় – এই ৫টি শিক্ষা আপনাকে সফল উদ্যোক্তা বানাবে
ব্যবসায় জলবায়ুর প্রভাব: বাস্তব উদাহরণ
নিচে টেবিলে কিছু বাস্তব প্রতিষ্ঠান ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ব্যবসায় কি প্রভাব পড়ছে এবং কিভাবে তারা মোকাবেলা করছে তা দেখানো হলো:
| প্রতিষ্ঠান | খাত | জলবায়ু প্রভাব | প্রতিক্রিয়া |
| PRAN Group | কৃষিভিত্তিক খাদ্য | অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও খরা ফসল উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটায় | সোলার ড্রায়ার, চুক্তিভিত্তিক কৃষক তৈরি |
| ACI | কৃষি ও ওষুধ | উচ্চ তাপমাত্রায় উৎপাদন ও সংরক্ষণ সমস্যায় পড়ে | ক্লাইমেট কন্ট্রোল গুদাম |
| Walton | ইলেকট্রনিক্স | বন্যার কারণে কারখানা কার্যক্রম ব্যাহত হয় | প্ল্যান্ট রিলোকেশন ও ইমারজেন্সি রেসপন্স ইউনিট |
| BRAC Dairy | খাদ্য প্রক্রিয়াজাত | লজিস্টিকস বিলম্ব | ডিজিটাল ইনভেন্টরি সিস্টেম |
| Bengal Group | প্লাস্টিক | কাঁচামালের দামে ওঠানামা | বিকল্প সোর্সিং ও রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট |
এই উদাহরণগুলো থেকে বুঝা যায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু গ্রামাঞ্চল বা কৃষি কেন্দ্রিক নয় বরং শহর ও বৃহৎ শিল্পে ক্ষেত্রেও গুরুতর প্রভাব আনছে।
প্রযুক্তির সহায়তায় অভিযোজন
বর্তমানে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তি ব্যবহার করে জলবায়ু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার চেষ্টা করছে:
স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারে ফসলের ক্ষয়ক্ষতি কমছে। ড্রন ও স্যাটেলাইট ইমেজিন ব্যবহার করে কৃষকরা আগে আগেই ফসলের অবস্থা বুঝতে পারছে।
সোলার এনার্জি ব্যবহার করে অনেক প্রতিষ্ঠান বৈদ্যুতিক সমস্যার সমাধান করছে এবং গ্রামীণ উদ্যোক্তারা নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছে।
বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান এখন ক্লাইমেট স্মার্ট প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। ওয়ালটন, জিপি ও ইউনিলিভার বাংলাদেশ তাদের কারখানায় সোলার প্যানেল স্থাপন করে কার্বন নিঃসরণ ও খরচ কমাচ্ছে।
এছাড়াওAI-ভিত্তিক পূর্বাভাস সিস্টেম থেকে ঝড়, বৃষ্টি, খরা ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম তথ্য জানা যাচ্ছে।
আরোও পড়ুন: ৭৫% ব্যর্থ ব্যবসার পেছনের কারণ একটাই — আপনি জানেন?
চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা
- দেশের অনেক অঞ্চল এখনও বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় প্রতিরোধে প্রস্তুত নয়, যার ফলে সেই অঞ্চলগুলোর ব্যবসা ক্ষতির মুখে পড়ে।
- পরিবেশবান্ধব ব্যবসা পরিচালনায় এখনো কোন স্পষ্ট ও কার্যকর গাইডলাইন নেই।
- অনেক ব্যবসায় ক্ষেত্রে শ্রমিক ও ম্যানেজাররা পরিবেশের ঝুঁকির বিষয় নিয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন।
ব্যবসা সম্পর্কে আরও তথ্য পেতে: https://thedailycorporate.com/category/business-talk/
সম্ভাবনা ও সমাধান
জলবায়ু পরিবর্তন ব্যবসায়ের জন্য যে মন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে তেমনি নতুন সম্ভাবনাও সৃষ্টি করেছে।
- পরিবেশবান্ধব পণ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে ভোক্তাদের।
- জলবায়ু সচেতনতা থাকা পণ্য দেশের পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
- আন্তর্জাতিক সবুজ তহবিল এখন টেকসই ব্যবসা খুঁজছে।
সমাধান হিসেবে
- রিক্স ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান তৈরি করা।
- সব ব্যবসা খাতে রিস্ক এনালাইসিস বাধ্যতামূলক করা।
- ব্যবসায়িক ইন্সুরেন্স কভারেজ বাড়ানো।
- সাসটেইনেবল সাপ্লাই চেইন গঠন করা।
- সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয় সবুজ প্রযুক্তি সহজলভ্য করা।
পরিশেষে বলা যায়, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতে হুমকি নয়, বরং এটি বর্তমান বাস্তবতা। তবে সঠিক কৌশল গ্রহণ করলে ব্যবসায় গুলো টিকে থাকতে পারবে। কারণ অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও সম্ভাবনা পথও তৈরি হচ্ছে যেখানে প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও নীতিগত সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এখনই সময় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভবিষ্যতে ঝুঁকি মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত হওয়া। যদি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন থেকে প্রস্তুতি নেয়, সঠিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে, কৌশল ও নীতির গ্রহণ করে তাহলে ভবিষ্যতে জন্য আরও টেকসই ও লাঞ্ছানো হতে পারবে।
প্রশ্নোত্তর পর্ব:
১. ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতি নিতে পারে?
উত্তর: প্রযুক্তি ব্যবহার, রিস্ক ম্যানেজমেন্ট পরিকল্পনা, সাসটেইনেবল সাপ্লাই চেইন গঠনের মাধ্যমে।
২. সাসটেইনেবল সাপ্লাই চেইন কি?
উত্তর: এমন একটি নেটওয়ার্ক যেখানে কোম্পানি এবং ব্যক্তিরা পণ্য বা পরিষেবার উৎপাদন এবং সরবরাহের সাথে জড়িত।
৩. জলবায়ু পরিবর্তন ব্যবসা কোনক্ষণ ক্ষেত্রে বেশি প্রভাব ফেলে?
উত্তর: কৃষি, উৎপাদন, স্বাস্থ্য, শিল্প, নির্মাণ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায় বেশি প্রভাব পড়ে।
৪. ব্যবসায়ীরা কিভাবে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলা করতে পারে?
উত্তর: ইনস্যুরেন্স গ্রহণ, প্রযুক্তি ব্যবহার, কর্মীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মোকাবেলা করা যায়।
৫. ক্ষুদ্র ব্যবসা গুলো কিভাবে অভিযোজন করতে পারে?
উত্তর: স্বল্প মূল্যের প্রযুক্তি, স্থানীয় উৎস থেকে সংগ্রহ এবং দুর্যোগ প্রস্তুতির জন্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে।
৬. কি ধরনের সরকারি সহায়তা পাওয়া যায়?
উত্তর: জলবায়ুর সহনশীল প্রকল্পে ঋণ সুবিধা, প্রশিক্ষণ এবং ট্যাক্সে ছাড়।
তথ্যসূত্র:





