spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img

নতুন টাকা না ছেপে ডলার কেনার পথে বাংলাদেশ ব্যাংক

লেখকঃ কাজী গণিউর রহমান 

বর্তমান বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি একটি সাধারণ সমস্যা হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। আমদানিনির্ভর অর্থনীতি, ডলার সংকট, বৈদেশিক রিজার্ভে চাপ এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ—এই সকল ফ্যাক্টর একত্রে দেশের মুদ্রাস্ফীতিকে আরও জোরালো করেছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক এক নতুন কৌশল নিয়েছে: নতুন টাকা ছাপার পরিবর্তে মার্কিন ডলার কিনে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ।এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো— টাকার প্রবাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানো।

কীভাবে কাজ করে এই পদ্ধতি?

বাংলাদেশ ব্যাংক যখন মার্কিন ডলার কিনে, তখন তারা অর্থ সরবরাহ করে টাকার বিনিময়ে ডলার সংগ্রহ করে।

এর ফলে:

  • বাজার থেকে টাকা কমে যায়
  • সরবরাহ কম হলে চাহিদা নির্ভর জিনিসপত্রের দাম স্থিতিশীল থাকে
  • অতিরিক্ত লিকুইডিটি কমলে ব্যাংকগুলো ঋণ কম দেয় এবং সেটা খরচেও প্রভাব ফেলে
  • বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা হালকা হলেও শক্ত ভিত্তিতে ফিরতে থাকে

এই পদ্ধতিকে অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় “Sterilized Foreign Exchange Operation”।

কেন এই সিদ্ধান্ত এখন?

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ সিদ্ধান্তটি মূলত বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক শর্তের মিলিত প্রতিক্রিয়া। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট ছেপেছে। এর ফলে বাজারে অতিরিক্ত লিকুইডিটি বা তারল্য সৃষ্টি হয়েছে, যা সরাসরি মুদ্রাস্ফীতিকে ৯.৮৬%-এ পৌঁছে দিয়েছে (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, মে ২০২৪)। এই হারে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে এবং মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের আর্থিক চাপ তীব্রতর হয়েছে।

অপরদিকে, IMF-এর সঙ্গে স্বাক্ষরিত ঋণচুক্তির আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি “মোডারেট মনিটারি পলিসি” গ্রহণ করার শর্ত ছিল। কিন্তু অতিরিক্ত টাকা ছাপার কারণে এই নীতিমালা অনুসরণ করা সম্ভব হয়নি। তাই বাজারের অতিরিক্ত অর্থ সরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন রিজার্ভ থেকে ডলার কিনে টাকার প্রবাহ হ্রাস করার পথ বেছে নিয়েছে। এই পদ্ধতিকে বলা হচ্ছে “মার্কেট স্টেরিলাইজেশন” বা বাজার শৃঙ্খলায়ন নীতি—যা একদিকে রিজার্ভ বাড়াবে এবং অন্যদিকে মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন—

“এটি একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। তবে শুধুমাত্র এই ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদে মুদ্রাস্ফীতি ঠেকানো যাবে না। সাথে সাথে রাজস্ব আয় বাড়ানো, বাণিজ্য ভারসাম্য, ও কৃষি উৎপাদনকে টেকসই করতে হবে।”

ব্র্যাক ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান TBS-কে জানান—

“এই নীতি খুবই সেন্সিটিভ। কারণ, ডলার কেনা মানে রিজার্ভেও চাপ পড়বে। কিন্তু বিকল্প না থাকায় এটা এখন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।”

সুফল ও সীমাবদ্ধতা

 সম্ভাব্য সুফল

  • মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে ধীরে ধীরে
  • বাজারে অতিরিক্ত নগদ টাকার প্রবাহ কমবে
  • আমদানি ব্যয় কমাতে সহায়তা করবে
  • বন্ড মার্কেট বা বিনিয়োগে আস্থা বাড়তে পারে

সীমাবদ্ধতা

  • দীর্ঘমেয়াদে যদি উৎপাদন না বাড়ে, তাহলে এটি অস্থায়ী সমাধান হয়ে দাঁড়াবে
  • ডলার কেনার ফলে রিজার্ভ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা
  • ব্যংকিং লেনদেনে সংকট তৈরি হতে পারে
  • ডলার কিনতে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজের মূলধন ক্ষয়ে যেতে পারে

বৈদেশিক রিজার্ভের বর্তমান অবস্থা (বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী)

সময়কালবৈদেশিক রিজার্ভ (বিলিয়ন ডলার)
জুলাই ২০২৩৩১.০৫
জুন ২০২৪২৩.৫৬
লক্ষ্য (IMF শর্ত অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৪-এর মধ্যে)২৫.০০+

এই অবস্থায় টাকার প্রবাহ কমিয়ে রিজার্ভ বৃদ্ধির চেষ্টাকে অর্থনীতিবিদেরা অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু বাধ্যতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু টাকা তুলে বাজারের তারল্য নিয়ন্ত্রণ করলেই দীর্ঘমেয়াদে সমাধান আসবে না। প্রয়োজন একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনা। এর প্রথম ধাপে কর ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন, যাতে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করে সরকার অধিকতর স্বনির্ভরতা অর্জন করতে পারে।

এছাড়া আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। এতে করে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়বে এবং রিজার্ভ পুনরুদ্ধার সহজ হবে। বিশেষ করে কৃষিভিত্তিক পণ্য ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে উৎপাদন বৃদ্ধি দেশের রপ্তানি বাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

সেইসাথে, শিল্প ও সেবা খাতে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন প্রক্রিয়া গ্রহণ করলে উৎপাদন খরচ কমবে, যা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশকে টিকে থাকতে সহায়তা করবে।

সবশেষে, সরকারকে অবশ্যই মিড-টার্ম বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক মেনে চলতে হবে, যাতে আর্থিক পরিকল্পনা স্বচ্ছ, সময়োপযোগী এবং টেকসই হয়। এইসব পদক্ষেপ মিলেই অর্থনীতিকে একটি স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারে।

চূড়ান্ত বিশ্লেষণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত একটি অর্থনৈতিক সংকটে সাহসী পদক্ষেপ—এ নিয়ে সন্দেহ নেই। তবে একে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ভাবা যাবে না। বরং এটি এক ধরনের “stabilizing measure” যা দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের আগে সাময়িকভাবে বাজার স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হতে পারে।

সুতরাং, এই নীতির বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, বাজার বিশ্লেষণ ও সময়োপযোগী পুনর্বিবেচনা অত্যন্ত জরুরি।

অর্থনীতি সম্পর্কিত আরো তথ্য পেতে ক্লিক করুন – https://thedailycorporate.com/category/economy/ 

সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)

প্রশ্ন ১: কেন বাংলাদেশ ব্যাংক এখন মার্কিন ডলার কিনছে?

উত্তর: বাংলাদেশ ব্যাংক অতিরিক্ত টাকা ছাপার কারণে সৃষ্ট মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বৈদেশিক রিজার্ভ বাড়াতে বাজার থেকে টাকা টেনে নিতে রিজার্ভ থেকে ডলার কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি এক ধরনের স্টেরিলাইজেশন পলিসি।

প্রশ্ন ২: এই সিদ্ধান্তে বাজারে কী প্রভাব পড়বে?

উত্তর: বাজারে নগদ টাকার পরিমাণ কমে যাবে, যার ফলে খরচ কমবে এবং মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে সঠিক ভারসাম্য না থাকলে অর্থনীতিতে সংকোচনও দেখা দিতে পারে।

প্রশ্ন ৩: আইএমএফ (IMF) এর কী ভূমিকা আছে এই সিদ্ধান্তে?

উত্তর: IMF-এর ঋণচুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে একটি মোডারেট মনিটারি পলিসি অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। অতিরিক্ত টাকা ছাপা এ নিয়ম লঙ্ঘন করে, তাই এই সিদ্ধান্তে আইএমএফ-এর চাপ কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।

প্রশ্ন ৪: রিজার্ভ কত ছিল এবং কত হয়েছে?

উত্তর:

  • জুলাই ২০২৩: রিজার্ভ ছিল ৩১.০৫ বিলিয়ন ডলার
  • জুন ২০২৪: রিজার্ভ নেমে এসেছে ২৩.৫৬ বিলিয়ন ডলারে
    (সূত্র: Bangladesh Bank Official Reserve Data)

প্রশ্ন ৫: শুধু টাকা সরিয়ে কি মুদ্রাস্ফীতি কমানো সম্ভব?

উত্তর: না, একমাত্র অর্থনৈতিক সংস্কার, কর ব্যবস্থার উন্নয়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচ হ্রাসের মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পাওয়া সম্ভব।

আরও পড়ুনঃ 

তথ্যসূত্র 

১. বাংলাদেশ ব্যাংক – বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তথ্য (Official Source)
https://www.bb.org.bd/en/index.php/econdata/forex_reserve 

২. TBS | June 2024 | বাংলাদেশ ব্যাংকের মনেটারি পলিসি বিষয়ক রিপোর্ট
https://www.tbsnews.net/economy/bangladesh-bank-monetary-policy-june-2024-869258

More articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest article

“আমাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়নি, পারিবারিক কাজে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে ছুটি নিয়েছি”—দাবি ওমর ফারুক খাঁনের

ঢাকা, ১২ এপ্রিল ২০২৬: ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওমর ফারুক খাঁনকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠিয়েছে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ—এমন তথ্য উঠে এসেছে...

ছেঁড়া ও অযোগ্য নোট নিয়ে গ্রাহক হয়রানি বন্ধে কঠোর অবস্থানে বাংলাদেশ ব্যাংক

ঢাকা, ১২ এপ্রিল ২০২৬: দেশের সকল তফসিলি ব্যাংককে ছেঁড়া, ক্ষতিগ্রস্ত ও ময়লা নোট গ্রহণ এবং বিনিময়ে নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।...

EDF তহবিল ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা: ব্যবসায়ীদের আশ্বাস বাংলাদেশ ব্যাংকের

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ব্যবসায়ী নেতাদের আশ্বস্ত করেছেন যে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (Export Development Fund - EDF) ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ৫ বিলিয়ন ডলারে...

দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা এক মঞ্চে—৮ম বাংলাদেশ রিটেইল কংগ্রেস

লেখক: নিশি আক্তারঢাকা, ৫ এপ্রিল ২০২৬ । দেশের খুচরা (রিটেইল) খাতকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে আগামী ১৮ এপ্রিল ২০২৬...