লেখক – ফারহানা হুসাইন
বর্তমান ডিজিটাল যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও শিক্ষাক্ষেত্র, চিকিৎসাক্ষেত্র সহ সবকিছুইতেই প্রযুক্তিনির্ভরতা দিন দিন বেড়ে চলছে। ব্যবসাক্ষেত্রও এর ব্যতিক্রম নয়। এখন তরুণ উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও ডিজিটাল মার্কেটিং, ফাইন্যান্স এন্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাপস, সিআরএম (কাস্টমার রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্ট) সিস্টেম, ক্লাউড কপম্পিউটিং সহ আরো নানা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম কে আরো কার্যকর, সময়সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য করে তুলছে। আজকে আমরা কথা বলবো – Cloud vs Local Server: কোনটিকে প্রাধান্য দিচ্ছে কর্পোরেট বাংলাদেশ এবং কেন? তার আগে চলুন জেনে নেই Cloud এবং Local Server আসলে কী এবং এদের কিছু সুবিধা ও অসুবিধাঃ
Local Server:
প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব ভবন বা ডাটা সেন্টারে সার্ভার স্থাপন করে তথ্য সংরক্ষণ ও পরিচালনাসহ নানা কাজ করে থাকে।
সুবিধা :
- নিজস্ব অফিসে সার্ভার স্থাপন করা হয় বলে তথ্য পরিচালনা ও সরবরাহ দ্রুততর হয়।
- কোম্পানি নিজে সার্ভার স্থাপন করে বিধায় এর উপর তাদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে।
- সার্ভারে শুধুমাত্র কোম্পানি বা কোম্পানি অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের এক্সেস থাকায় গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তা বেশি থাকে।
- ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়াও কিছু কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়।
অসুবিধা :
- Server স্থাপন করার জন্য আলাদা জায়গা, কুলিং বেবস্থা ও নিরাপত্তার প্রয়োজন হয়।
- সার্ভার স্থাপন ও রক্ষনাবেক্ষন একটি জটিল ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া।
- স্কেলিং (প্রয়োজনানুসারে সার্ভারের সক্ষমতা বাড়ানো বা কমানো) করা যায় না।
- হার্ডওয়্যারের ত্রুটি বা সিস্টেম এ গন্ডগোল দেখা দিলে তথ্য হারিয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে।
- রিমোট এক্সেস কষ্টসাধ্য, ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ।
Cloud Server:
এটি একটি ভার্চুয়াল সার্ভার, যা অন্য কোনো ক্লাউড সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান (Amazon, Google, Microsoft or local hosts ) হোস্ট করে থাকে। ব্যবহারকারিরা বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে এর এক্সেস নিতে পারেন।
সুবিধা :
- ইন্টারনেটের মাধ্যমে সহজেই যেকোনো সময় যেকোনো স্থান থেকে ব্যবহার করা যায়।
- Scalability – প্রয়োজানুসারে স্টোরেজ এবং রিসোর্সের ব্যবহার বাড়ানো বা কমানো যায়।
- Pay as you go – অর্থাৎ ঠিক যতটুকু সেবা গ্রহণ করবেন, সেই অনুযায়ী পে করতে হবে।
- server স্থাপন, রক্ষনাবেক্ষন ইত্যাদির ঝামেলা না থাকায় তুলনামূলক মূল্যসাশ্রয়ী।
- ব্যাকআপ সেবা প্রদান করায় তথ্য হারিয়ে যাবার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
অসুবিধা :
- দূরত্ব, একাধিক এক্সেস,ইন্টারনেটের গতি ইত্যাদি কারণে এতে তুলনামূলোক সময় বেশি লাগে ।
- প্রয়োজানুসারে সার্ভারের হার্ডওয়্যার বা কনফিগারেশন কাস্টোমাইজ করা যায় না।
- Online-base হওয়ায় হ্যাকিং,ডেটা লিক এবং ভাইরাস আক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে।
কোনটিকে প্রাধান্য দিচ্ছে কর্পোরেট বাংলাদেশ
বর্তমানে বাংলাদেশে কর্পোরেট সংস্থাগুলো Local এবং Cloud- উভয় সার্ভারই ব্যবহার করছে তবে ক্লাউড সার্ভারের জনপ্রিয়তা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মূল্য সাশ্রয়ী,সহজ রক্ষণাবেক্ষণ,Scalability ইত্যাদি বিভিন্ন সুবিধার জন্য দেশের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্লাউড সার্ভার ব্যবহারে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে , বিশেষ করে ছোট এবং মাঝারি আকারের (SME) ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো।
এছাড়াও লোকাল ক্লাউড সার্ভার প্রোভাইডারদের বিভিন্ন মূল্যসাশ্রয়ী প্যাকেজ, সহজলভ্যতা, কাস্টোমাইজশন সুবিধা, লোকাল সাপোর্টসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধাও ক্লাউড সার্ভারকে আরো জনপ্রিয় করে তুলছে।
The Daily Star এর এক প্রতিবেদন মতে – বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো ২০১৯–২০২২ সালের মধ্যে ক্লাউড কম্পিউটিং সেবা ব্যবহারে পিছিয়ে ছিল, যেখানে মাত্র ৭ শতাংশ স্থানীয় ব্যবসা এই সুবিধা ব্যবহার করেছে। যদিও এর সংখ্যা দিনদিন ব্যপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে ক্লাউড কম্পিউটিং ব্যবহারকারীদের সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়েছে।
The Business Standard এর ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদন অনুসারে – দেশীয় ক্লাউড স্টোরেজ বাজারের বর্তমান আকার প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলার, যেটি ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
Hybrid Cloud : দেশের অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান- Local এবং cloud – উভয় সার্ভার একসাথে ব্যবহার করে, যা হাইব্রিড ক্লাউড নামে পরিচিত।
২০১৯ সালে Nokia’র ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ডেটা মাইগ্রেশন হয় যেখানে গ্রামীনফোনের প্রায় ৭২ মিলিয়ন কাস্টমারের ডেটা Nokia’র UDC (User Data Convergence) ক্লাউড কোর প্লাটফর্মে স্থানান্তর করা হয় এবং এই প্রজেক্টের মাধ্যমে দেশে প্রথমবারের মতো হাইব্রিড ক্লাউড কোর নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়।
বিভিন্ন কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষত বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো এই সেবা নিয়ে থাকে –
- বিপুল সংখ্যক ডেটা ক্লাউড সার্ভারে ট্রান্সফার করার জটিলতা এড়ানোর জন্য।
- নিরাপত্তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে – অর্থাৎ সংবেদনশীল ডেটা লোকাল সার্ভার এর মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে রাখে, বাকি কম গুরুত্বপূর্ন অ্যাপস বা ডেটা ক্লাউড সার্ভার এ সংরক্ষণ করে।
- বড় প্রতিষ্ঠানগুলো সুষ্ঠূরূপে পরিচালনার জন্য লোকাল এবং ক্লাউড- উভয় সার্ভারের সুযোগ-সুবিধাগুলো ব্যবহারের লক্ষ্যে।
- খরচ সাশ্রয় – সব ডাটা ক্লাউড এ রাখলে খরচ বেশি হয়, হাইব্রিড মডেলে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় ডেটা গুলো ক্লাউড এ রেখে খরচ কমানো যায়।
- উভয় সার্ভার ব্যবহারের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণপ ডেটার ক্ষয়ক্ষতি বা হারানোর আশঙ্কা হ্রাস করার লক্ষ্যে।
ব্যবসায়িকপ্রতিষ্ঠানগুলোর ধরণ, আকার, কার্যক্রম, চাহিদা, এবং নিরাপত্তা বিবেচনায় Cloud এবং Local সার্ভার- উভয়েই নিজ নিজ স্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যবসা জগতে ডিজিটালাইজেশনের প্রসার, ইন্টারনেটের সজলভ্যতা এবং ক্লাউড সার্ভারের আকর্ষণীয় সব ফিচার- যেমন স্কেলেবিলিটি, রিমোট এক্সেস ও খরচ সাশ্রয়- এসব কারণে ক্লাউড সার্ভার দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করছে।বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানগুলো জন্য cloud server কার্যকর এবং উপযোগী পছন্দ হয়ে উঠেছে ।
কিন্তু যেহেতু বাংলাদেশে cloud সার্ভারের ব্যবহার এখনো শুরুর পর্যায়ে রয়েছে সেক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে হাইব্রিড ক্লাউড অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য আদর্শ হতে পারে।বিশেষত যেসব প্রতিষ্ঠানে খুব উচ্চ নিরাপত্তা দরকার বা ইন্টারনেট নির্ভরতা কম রাখতে চায়, তারা Hybrid Model-এর দিকে যাবে।




