লেখকঃ নাওমী ইসলাম
বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভূতপূর্ব গতিতে বিকশিত হচ্ছে। ২০২৫ সালের হিসাবে দেশটিতে ২,৫০০–এরও বেশি সক্রিয় স্টার্টআপ রয়েছে, যারা ফিনটেক, হেলথটেক, এডটেক, লজিস্টিকসসহ বিভিন্ন খাতে কাজ করছে। ১২০০–২৫০০ সক্রিয় স্টার্টআপ, ১.৫ মিলিয়নেরও বেশি কর্মসংস্থান—সবই দিশা দেখাচ্ছে। প্রায় ১৮ মাসের মধ্যে অনেক সাধারণ তরুণ ব্যবসা থমকে যাচ্ছে—একের পর এক উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কেন? যারা শুরু করতে সাহস পেয়েছে, সাথেই নামিয়ে আনছে অচীন বাধা। নিচে আমরা এসব সমস্যা খোলসা করি—চক্রের প্রতিটি ধাপ বিশ্লেষণে তুলে ধরা হবে কিছু উদাহরণ-সঙ্গে।
মূল সমস্যা ও বিশ্লেষণ
১. অর্থনৈতিক সংকট ও বিনিয়োগ হ্রাস: আন্তর্জাতিকভাবে বিনিয়োগ হ্রাস পাওয়া—বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ সাপ্লাই-চেইন চাপ এবং বিদেশি বিনিয়োগকারী সঙ্কুচিত থাকার ফলে বস্তুনিষ্ঠ পুঁজি সরবরাহ কঠিন হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালে কিউ৩–এর আংশিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ কমে হয়েছে ৫৭%। ফান্ড সঙ্কটের কারণে স্টার্টআপ প্রাথমিক অর্থ দিয়ে এগোতে না পেরে প্রায় ১৮ মাসের মধ্যে “runway” শেষ হয়ে যায়। বিশ্বের স্টার্টআপ বিস্তৃত ডেটা অনুযায়ী ৯০% স্টার্টআপ ফেইল করে ।
২. স্থানীয় বাজার সীমাবদ্ধতা ও প্রিম্যাচিউর স্কেল: বাংলাদেশের আয়তন থাকা সত্ত্বেও, ই-কমার্স ও ডেলিভারি ছাড়া অন্য খাত কম বিকশিত, এবং গ্রাহক ক্ষমতা সীমিত। অনেক স্টার্টআপ দ্রুত গ্রোথ দেখানোর জন্য প্রিম্যাচিউর স্কেল করে — কর্মী নিয়োগ এবং ব্যয় বাড়িয়ে — কিন্তু বাজার সেটলে ধার চলে যায়। বাংলাদেশের মজুদ বাজার (e‑commerce, fintech, mobility) প্রধান—অন্য খাতে গ্রোথ দেখা যায় না। Plabon Kumar Saha et al. (2022) গবেষণার ফল: বাজার যাচাই না করে পণ্য উন্নয়ন এবং অতিক্রম হতে গিয়ে স্টার্টআপ ব্যর্থ হয়।
৩. প্রশাসনিক জটিলতা ও দূর্নীতি: ESCAP (2022) অনুযায়ী, অনুমোদন প্রক্রিয়া ministry ভিত্তিক জটিল এবং সাপেক্ষ; WEF–সহ Ease-of-Doing-Business–এ বাংলাদেশের ১৬৮তম স্থান রয়েছে। UNESCAP রিপোর্ট সুপারিশ করে নবায়নযোগ্য স্টার্টআপ নীতি ও কর অব্যাহতি । দেশের কর্পোরেট রেজিস্ট্রেশন, লাইসেন্সিং অনেক দপ্তরের মধ্য দিয়ে যায়—টাইম, টাকা এবং ঝামেলার ভার থাকে। Transparency International–এর ২০২৪–এর দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশ ১৮০ দেশের মধ্যে ১৫১তম—দেশের প্রশাসনিক দুর্নীতি ভয়াবহ মাত্রায় রয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব ও পক্ষপাতপূর্ণ লেনদেন উদাহরণ হিসেবে ১০ মিনিট স্কুল সহ কিছু প্রতিষ্ঠান সরকারি তহবিল থেকে বাদ পড়েছে।
৪. তৃতীয়করণ ও অভিজ্ঞ ট্যালেন্ট সংকট: প্রতি বছর নির্ধারিত ১৫,০০০ আইটি স্নাতকের মধ্যেও অনেকেই নিরাপদ জবেই চলে যায়—স্টার্টআপের ঝুঁকি ও নিম্ন পারিশ্রমিক এড়িয়ে। দক্ষ হিউম্যান রিসোর্স–এর অভাবে, প্রতিষ্ঠানগুলো আইটি, প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট, বিজনেস স্ট্র্যাটেজি ইত্যাদি ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে । শিক্ষাবিদ জনস্বার্থে জানা যায়, ১৫,০০০ আইটি গ্র্যাজুয়েটের মধ্যে বুকিং স্কিল জবের বদলে স্টার্টআপে ঝুঁকে না পড়াকে সাব্যস্ত করছেন । Saha et al. গবেষণায় প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও মানের অবকাঠামো না থাকা স্টার্টআপের সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত ।
৫. অবকাঠামো ও স্থানীয় সাপোর্টে বাধা: ঢাকা-চট্টগ্রাম ছাড়া অন্যান্য শহরে ইন্টারনেট, লগিস্টিকস ও সার্ভিস সাপোর্ট খুবই দুর্বল। গ্রামে বা চট্টগ্রাম–ঢাকা আন্তর্জাতিক সংযোগ ও logistic অদক্ষতা, খরচ বেড়ে গিয়ে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। 4IR‑ভিত্তিক উপাত্ত থেকে জানা যায়, দেশে স্মার্ট প্রযুক্তি থাকার সুযোগ অনেক, কিন্তু transition‑এ প্রাধান্য নেই।
৬. ব্যবসা মডেল ও বিজনেস স্ট্রাকচারে ঘাটতি: উদ্যোক্তাদের ৭০% ফেইল হয় financial illiteracy, অপূর্ণ বাজার গবেষণার কারণে। মার্কেট–পণ্য–কমিটমেন্ট ফিক্স না থাকলে, স্টার্টআপ প্রিম্যাচিউর স্কেল–এ সরিয়ে যায় । প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোর অভাবী স্ট্রাটেজি, পণ্য–বাজার–মেলবন্ধন না পেয়ে একাদমা থেমে যায় । ISO/CMM Level এর মতো সফটওয়্যার স্ট্যান্ডার্ড অনুপদস্থ—মান ও প্রক্রিয়া দুর্বলতার কারণে উইন্ডস্ট্রিম হয় ।
৭. ভিসি–ফান্ড পার্থক্য ও “মিসিং মিডল”: স্টার্টআপ বিনিয়োগের ৯২% আসে বৈদেশিক উৎস থেকে, স্থানীয় ভিসি ফান্ড ও সিরিজ A–B রাউন্ড–এর প্রশস্ত সুযোগ নেই । বড় রাউন্ড মূলত ফিনটেক/লেট-পড়ের জন্য, তবে প্রাথমিক ও মধ্য পর্যায়ের জন্য প্রয়োজনীয় “patient capital” নেই, ফলে ১৮ মাসের মধ্যেই এগিয়ে যেতেই ফান্ড হ্রাস পায় । Startup Bangladesh Limited ও iDEA‑র উদ্যোগ সত্ত্বেও (৫০–৬৫০ কোটি টাকার ফান্ড), সেটা মাত্র প্রথম সারির জন্য। Grameenphone অ্যাক্সেলারেটর, Robi‑এর এগ্রোনিমিক কোওসব উদ্যোগ অলক্ষ সম্ভব না; সম্প্রসারিত Angels‑এর নিথতে সীমাবদ্ধ।
কেন ‘১৮ মাস’? কী ইঙ্গিত দেয়?
- প্রথম ফান্ডে runway নির্লজ্জ, MVP মূল কাঠামোগত।
- প্রিম্যাচিউর স্কেলিং শুরু হয় টিম/বাজেট বাড়িয়ে।
- প্রশাসনিক জটিলতা যোগ হলে—স্টার্টআপ আর অগ্রসর হতে পারে না।
এই সময়ে উদ্যোক্তা প্রায় হাকড়া হয়ে যায়—ফান্ড নেই, টিম নেই, বাজার সংকুচিত।
করণীয় পরামর্শ
- MVP–ভিত্তিক সঘন iteration: গ্রাহকের ‘ধারণা ভুল’ মিথ্যা করে, MVP দিয়ে রিসার্চ—এর মাধ্যমে পিভট ও স্কেল করা উচিত।
- নির্দিষ্ট মার্কেটে সময় দিন: ঢাকা-চট্টলার মধ্যে প্রয়োগ করে পছন্দমতো scale‑এর যাত্রা শুরু করুন (Escap সুপারিশ মত)।
- ট্যালেন্ট ও দক্ষতা তৈরি করুন: BCC‑এর partner‑এ AI/IoT/সফটওয়্যার কোর্স নিন—ফিলেট্র মানুষ তৈরি হয়; টিম মজবুত হয় ও স্থিতিশীল ব্যবসা গড়ে ওঠে ।
- প্রশাসনিক বোঝা হ্রাস: e‑license, এক‑উইন্ডো মাধ্যমে রেজিস্ট্রি/ট্যাক্স ব্যাবস্থা আধুনিক করতে হবে—ভিডের সহযোগিতায় ।
- Patient capital ও Angel‑VC উন্নয়ন: স্থানীয় Invest‑সংযোগ লাগবে—Start up Bangladesh, iDEA, Grameenphone Angel‑ইনিশিয়েটিভ ধারণা বাড়ান।
- পাবলিক–প্রাইভেট সহযোগিতা: ICT নীতি, hi‑tech parks সহযোগিতা—একযোগে অগ্রসর করুণ নতুন startup খাতের জন্য (4IR‑অবকাঠামো সময়মতো নেওয়া)।
বাংলাদেশে স্টার্টআপরা ১৮ মাসে থেমে যায় কারণ: অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি, ট্যালেন্ট, বাজার, ফান্ড, স্ট্রাটেজি, নেটওয়ার্ক–সব মিলে কাজ করে। কিন্তু—যদি বিনিয়োগ, নীতি, বিজনেস মডেল ঠিক থাকে, স্থানীয় ভিসি তৈরি হয়, প্রশাসনিক প্রসেস সহজ হয় এবং দক্ষ টেলারেন্ট আশ্রয় পায়—তবে এই সময় ব্যবসা ছাপিয়ে যেতে পারে। ঢাকা–চট্টগ্রাম উভয়ে ‘৫ ইউনিকর্ন’ অদূর ফুটবে এবং বাংলাদেশ হতে পারে Global Startup Map‑এ শক্তিশালী গন্তব্য।
তথ্যসূত্র
১. Present Situation of Tech Startups in Bangladesh: A Case Study
৩. Startup landscape in Bangladesh: Challenges and way forward
৬. Present Situation of Tech Startups in Bangladesh: A Case Study
৭. Bangladesh startup ecosystem assessment report
৮. Present Situation of Tech Startups in Bangladesh: A Case Study




