লিখেছেনঃ আফরোজ মজহার পূর্ণতা
বর্তমানে অধিকাংশ সংবাদ পত্রিকার প্রধান শিরোনাম প্রতিবেদনে চোখ বুলালেই দেখা যায় আর্থিক দুর্নীতি বা জালিয়াতির ফাঁসকৃত তথ্য। প্রশ্ন আসতে পারে ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত করা হয় এই সকল আর্থিক অপরাধের রিপোর্ট সমূহ? এই প্রেক্ষাপটেই উৎপত্তি ঘটে ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং শব্দটির – আর্থিক প্রতারণামূলক কর্মকান্ডের তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি সংক্রান্ত একটি চ্যালেঞ্জিং প্রক্রিয়া।
ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে পরিচালিত যেমন Fraud examination, Financial analysis, Investigative accounting ইত্যাদি। ১৯৮০-৯০ এর দশক থেকে কর্পোরেট জগতে জালিয়াতি বাড়তে থাকায় ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং একটি পূর্ণাঙ্গ পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং শব্দটি বহুল প্রচলিত না হলেও দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি খাতের কর সংক্রান্ত জালিয়াতির তদন্তে এই ফরেনসিক একাউন্টিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
ফরেনসিক একাউন্টিং আসলে কি,কিভাবে পরিচালিত হয় এবং ক্যারিয়ার গড়ার উপযুক্ত অপশন কিনা ইত্যাদি বিস্তারিত আলোচনা থাকছে এখানে।
ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং আসলে কি?
অ্যাকাউন্টিং খাতের এর একটি নতুন আবিষ্কৃত টুল হলো ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং। পশ্চিমা দেশগুলোতে এর চলমান কার্যক্রমই সম্ভব করেছে অর্থনৈতিক খাতের দুর্নীতি দমন। মূলত আদালতের সাক্ষ্য প্রমানের কাজে ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং সর্বপ্রথম চালু হওয়ায় এখন পর্যন্ত এটিই ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং এর মূল উদ্দেশ্য হিসেবে বিদ্যমান। বিভিন্ন অডিট পর্যবেক্ষণ করে ব্যক্তি বা কোম্পানি সমূহের আর্থিক কেলেঙ্কারি,কর ফাঁকি ও প্রতারণামূলক অনিয়ম খুঁজে বের করার মাধ্যমে ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং আর্থিক দুর্নীতি প্রতিহত করে চলেছে।
- উদ্দেশ্য – দুর্নীতি প্রতিরোধ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত
- সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান – দুদক,রাজস্ব বোর্ড,আদালত এবং কর্পোরেট বা ব্যাংকিং অডিট
- প্রয়োজনীয় স্কিল – বেসিক অ্যাকাউন্টিং জ্ঞান,আইনি জ্ঞান,অডিটিং
ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং ব্যবহারিক পরিচালনা
আগেই বলা হয়েছে যেকোনো ধরণের আর্থিক অনিয়ম যাচাই করতেই ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং প্রয়োজন। এবার দেখা যাক ঠিক কোন কোন নির্দিষ্ট খাতে এটি পরিচালনা করা হয়ে থাকে।
- অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাব :
যা হতে পারে টোর্ট (আইনি ক্ষতি) বা চুক্তি ভঙ্গের কারণে।
- কোম্পানি অধিগ্রহণের পর বিরোধ :
যেমন আর্নআউটস (অতিরিক্ত লাভ ভিত্তিক মূল্য) বা ওয়ারেন্টি ভঙ্গ।
- সিকিউরিটিজ জালিয়াতি (বিনিয়োগ প্রতারণা) :
শেয়ার,বন্ড বা বিনিয়োগ মাধ্যমে প্রতারণামূলক তথ্য শনাক্তকরণ
- কর জালিয়াতি :
ভুয়া আয় সনদ দেখিয়ে কর ফাঁকি দেওয়া
- মানি লন্ডারিং (অবৈধ অর্থ বৈধ করা)
কোনো বিজনেস ফার্ম বা ব্যক্তি অবৈধ টাকাকে বিভিন্ন উপায়ে বৈধকরণ করতে চাইলে
এছাড়া রয়েছে ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি,স্কিমিং ,কম্পিউটার ফরেনসিক / ই-ডিসকভারি (ডিজিটাল প্রমাণ বিশ্লেষণ) ইত্যাদি।
আরো পড়ুন : কর ফাঁকিতে ২,২৬,০০০ কোটি টাকার ক্ষতি সিপিডি রিপোর্ট
ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং এর মেথডোলজি এবং প্রধান কার্যক্রম
একজন অডিটর এবং একজন প্রফেশনাল গোয়েন্দার সমন্বয়ে ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং এর মূল মেথড পরিচালিত হয়। একজন ফরেনসিক অ্যাকাউন্ট্যান্ট এর মূল উদ্দেশ্য থাকে ফ্রড স্কীম আইডেন্টিফাই করা। মূলত ২টি অংশে ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং পরিচালিত হয় –
১.পরিমাণগত বা quantitative – এই পদ্ধতিতে কমপ্লেক্স ফাইন্যান্স ডেটা এনালাইসিস এর মাধ্যমে দুর্নীতির প্যাটার্ন উদ্ঘাটন করা হয়।
২.গুণগত বা qualitative – এই পদ্ধতিতে ফ্রড স্কিমের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করা হয়।
| প্রধান কার্যক্রম | কার্যক্রম পদ্ধতি |
| জালিয়াতি শনাক্তকরণ | হিসাবপত্র বিশ্লেষণপূর্বক অনিয়মিত লেনদেন শনাক্ত করা |
| আর্থিক অপরাধ তদন্ত | ব্যালান্স শিট, ক্যাশ ফ্লো, ইনকাম স্টেটমেন্ট তদন্ত করা |
| আইনি সহযোগিতা | আদালতে সাক্ষ্য রিপোর্ট উপস্থাপন |
| মানি লন্ডারিং প্রতিহতকরণ | AML (Anti Money Laundering) অনুসন্ধান |
ফরেনসিক অ্যাকাউন্ট্যান্ট যখন ক্যারিয়ার অপশন
ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং একটি বিশেষায়িত খাত হিসেবে বিকশিত হচ্ছে বিধায় ক্যারিয়ার অপশন হিসেবে এর চাহিদা ক্রমে বেড়ে চলেছে । যেকোনো বিবিএ গ্রাজুয়েট চাইলেই কিছু স্কিল অর্জনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কর্পোরেট ফরেনসিক অ্যাকাউন্ট্যান্ট হতে পারেন।
- শিক্ষাগত যোগ্যতা
- বিবিএ অথবা এমবিএ
- ফিন্যান্স বা একাউন্টিং মেজর
- রিকোয়ারমেন্ট স্কিল
- CA,CMA,ACCA ইত্যাদি পেশাদার ডিগ্রি
- সফটওয়্যার ব্যবহারের জ্ঞান (Excel, QuickBooks, IDEA, ACL)
- আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে জ্ঞান
কেন বাংলাদেশে প্রয়োজন ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং
বাংলাদেশে আর্থিক জালিয়াতি ও দুর্নীতি ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ব্যাংকিং খাতে জালিয়াতি কিংবা সরকারি প্রকল্পে অস্বচ্ছতা দূরীকরণে ভারী ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং গুরুত্ব বহন করে।
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহ
- দুদক (দুর্নীতি দমন কমিশন)
- বাংলাদেশ ব্যাংক
- জাতীয় রাজস্ব বোর্ড
প্রয়োজনীয়তা
- আর্থিক দুর্নীতির তদন্তে ফরেনসিক অডিট
- ব্যাংক জালিয়াতি ও মানি লন্ডারিং তদন্ত
- আর্থিক অপরাধে বিশেষজ্ঞ সাক্ষ্য প্রদান
- প্রকল্প অর্থের অপব্যবহার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান
উদীয়মান খাতে আসন্ন চ্যালেঞ্জসমূহ
বর্তমান প্রেক্ষাপটে যেহেতু ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং শব্দটি এখনো অনেকের কাছে অচেনা তাই এই সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ এবং তা উত্তরীকরণে পদক্ষেপ সমূহ খুব একটা জানা নয়। তবে বিশ্বের বাকি দেশ গুলো যা যা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে এবং তার ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞরা যেসব করণীয় গাইডলাইন দিয়ে থাকেন তার একটি অংশ দেখানো হলো।
| চ্যালেঞ্জ | করণীয় |
| আর্থিক তথ্যের জটিলতা | অ্যাডভান্সড data analysis টুল এবং সফটওয়ারের নিয়মিত ট্রেইনিং চালু রাখা |
| আইনি ও পলিসি জটিলতা | আইনি প্রফেশনালদের সাথে কোলাবরেটিভ সম্পর্ক রাখা এবং পলিসি নিয়ে আপডেটেড থাকা |
| অপর্যাপ্ত রিসোর্স | Cost – Effective রিসোর্স টুল সম্পর্কে অবগত থাকা |
| নৈতিকতা ও সততা বজায় রাখা | নৈতিক মানদণ্ড মেনে চলা যাতে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সংস্থার প্ররোচনা এড়ানো যায় |
পরিশেষ
ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং বর্তমানে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ে তোলার জন্য নিঃস্বন্দেহে প্রয়োজনীয় হাতিয়ার। আর্থিক জালিয়াতি বা প্রতারণা, দুর্নীতি ও আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধে এর ব্যবহার অত্যন্ত কার্যকর। এমনকি নতুন কর্মক্ষেত্র হিসেবেও খুব শীঘ্রই এটি নিজের স্থান করে নিবে প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে।বাংলাদেশের দুর্নীতিগ্রস্ত প্রেক্ষাপটে Forensic Auditing Solution কর্পোরেট স্বচ্ছতা, ব্যাংক ও এনজিও খাতে আস্থা, এবং বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের বিশ্বাস অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই “ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং” কনসেপ্টটিকে আরো বেশি তুলে ধরতে হবে সাধারণ মানুষের নিকট যাতে বিচারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও আস্থা ফিরে আসে
প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
১. ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং কী?
ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং হলো এমন একটি বিশেষায়িত অ্যাকাউন্টিং শাখা, যেখানে আর্থিক জালিয়াতি ও দুর্নীতির প্রমাণ অনুসন্ধান করে তা আদালতে উপস্থাপনযোগ্যভাবে উপস্থাপন করা হয়।
২. বাংলাদেশে ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং কোথায় ব্যবহৃত হয়?
বাংলাদেশে এটি ব্যাংক জালিয়াতি, কর ফাঁকি, এনজিও অর্থের অপব্যবহার ও সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতির তদন্তে ব্যবহৃত হয়।
৩. ফরেনসিক অ্যাকাউন্ট্যান্ট হতে কী যোগ্যতা প্রয়োজন?
একজন ফরেনসিক অ্যাকাউন্ট্যান্ট হওয়ার জন্য অ্যাকাউন্টিং বা ফাইন্যান্সে ডিগ্রি, তদন্ত দক্ষতা এবং পেশাদার সনদ (যেমন CA, ACCA বা CFE) প্রয়োজন।




