লেখক : ফারহানা হুসাইন
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের প্রভাব অনেক। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৬ থেকে ৭ শতাংশ। ২০২৪ সালে দেশে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠান প্রবাসীরা – প্রায় ২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি।
কিন্তু কী ঘটবে যদি এই প্রবাসী আয় বৃদ্ধি না পায়? কীভাবে চলবে বাংলাদেশের অর্থনীতি? আজ আমরা এ বিষয়টি নিয়েই কথা বলবো। তবে তার আগে চলুন জেনে নেই
প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স কী ?
প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স হলো সেই অর্থ যা বিদেশে কর্মরত ব্যক্তিরা তাদের আয় থেকে নিজ দেশে পরিবারের কাছে পাঠান। সাধারণত বিভিন্ন ব্যাংকিং চ্যানেল, মোবাইল মানি বা অন্যান্য বৈধ মাধ্যমে এই অর্থ দেশে আসে।
এই রেমিট্যান্স শুধু একটি পরিবারের জীবনমান উন্নত করে না, বরং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস, যা আমদানি ব্যয় মেটাতে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
কিন্তু এই রেমিট্যান্সের প্রবাহ বৃদ্ধি না পেলে দেশকে কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে যেগুলো হলো:
১. বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সংকট দেখা দেবে।
২. আমদানি ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়বে।
৩. মুদ্রাস্ফীতি বা টাকার মান কমে যাবে।
৪. অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
৫. ব্যাংকিং খাতে সংকট দেখা দিতে পারে।
৬. বেকারত্ব ও দারিদ্রতার হার বৃদ্ধি পাবে।
৭. সরকারি প্রকল্প ব্যাহত হতে পারে।
৮. বিনিয়োগ কমে যাবে।
আরও পড়ুন: রেমিট্যান্স প্রবাহে নতুন রেকর্ড: ১০ মাসে এসেছে ২৫.২৭ বিলিয়ন ডলার
তাহলে কীভাবে চলবে অর্থনীতি?
রেমিট্যান্স খাতে মন্দা দেখা দিলেও দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে আমাদের কিছু পন্থা অবলম্বন করতে হবে :
১. গার্মেন্টস বা পোশাকশিল্পে গুরুত্বারোপ:
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পের (RMG) অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেশের মোট জিডিপির প্রায় ১১-১২%। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে এই খাত থেকে ৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি পণ্য রপ্তানি করেছে – যা বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০% এর বেশি। (Source: RMG Industry Contribution to Bangladesh GDP)
রেমিট্যান্স খাতে যদি মন্দা দেখা দেয় তখন দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে গার্মেন্টস শিল্পের উৎপাদন ক্ষমতা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি আয় বাড়াতে হবে।
২. স্থানীয় শিল্প ও উৎপাদন বাড়ানো:
স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্য যেমন – পাটজাত দ্রব্য, চামড়াজাত সামগ্রী, খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ, এবং হস্ত ও কুটির শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। The Daily Star এর এক প্রতিবেদন মতে, জিডিপির প্রায় ৩৩ শতাংশ অবদান রাখে এই শিল্প খাত।
আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশের অভ্যন্তরীন উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করলে কর্মসংস্থান ও আয় দুটোই বাড়বে। এটি দেশের অভন্তরীন বাজারকে শক্তিশালী করবে।
৩. দক্ষ ফ্রিল্যান্সার তৈরী:
দেশের প্রবাসী আয় বৃদ্ধি না পেলে ডিজিটাল রেমিট্যান্স বা অনলাইন আয়ের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
বর্তমানে বাংলাদেশ ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বে ২য় এবং উপার্জনের দিক থেকে ৭ম অবস্থানে রয়েছে। (Source : প্রথম আলো )
ফ্রিল্যান্সিং এর এই সম্ভাবনাকে আরো বৃদ্ধি করতে যথাযথ টেকনিক্যাল ট্রেনিং, ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও সুযোগ বৃদ্ধির দিকে গুরুত্বারোপ করতে হবে।
৪. বিনিয়োগ বাড়ানো:
দেশে দেশি-বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট বিনিয়োগের হার জিডিপির প্রায় ৩১–৩২% (Source : Ceicdata)
বিনিয়োগের এই হারকে আরো বৃদ্ধি করতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে সহজ আইনি কাঠামো, ব্যাংক ঋণ প্রদান, ট্যাক্স ছাড় ইত্যাদি সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে মানুষকে বিনিয়োগে আগ্রহী করে তুলতে হবে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশে বিনিয়োগ “শূন্য”? বাস্তবতা জানলে চমকে যাবেন!
৫. রপ্তানি খাতে গুরুত্বারোপ :
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রপ্তানি খাতের গুরুত্ব অনেক। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি ছিল ৪৮.২৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৮.৫৮ শতাংশ বেশি। (Source: The Daily Star )
রপ্তানি পণ্য বহুমুখীকরণ, এই খাতে গবেষণা ও প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত, কর ছাড় ইত্যাদি পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এই খাতের আয় বৃদ্ধি করা সম্ভব।
৬. ট্যাক্স নেট বাড়ানো:
প্রবাসী আয়ের ঘাটতি পূরণ করতে সরকারের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করতে হবে। বেশি মানুষকে আয়কর ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। রাজস্ব আদায়ে দুর্নীতি বন্ধ করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
৭. বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা:
বাংলাদেশের অনেক পরিবার এখনো সম্পূর্ণ প্রবাসী আয়ের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু বিশ্বের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভিসা সংকট ও কর্মসংস্থানের অভাব রেমিট্যান্স প্রবাহকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
এই সমস্যা মোকাবেলায় পরিবারগুলোকে এখন থেকেই বিকল্প আয়ের পথ খোঁজার ব্যাপারে সচেতন করে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার, বিভিন্ন এনজিও এবং গণমাধ্যমগুলোকে একসাথে কাজ করতে হবে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা চলমান। এমতাবস্থায় প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের উপর অধিক নির্ভরশীলতা দেশের অর্থনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে।
তাই যেকোনো পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে রপ্তানি,বিনিয়োগ, স্থানীয় শিল্প ও উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির প্রতি জোর দিতে হবে।
আরও পড়ুন : মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে?





