ঢাকা, ১৫ জুলাই ২০২৬: দেশের শীর্ষস্থানীয় ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম (BSRM) প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে বাংলাদেশের প্রথম ইন্টিগ্রেটেড হট-রোলড ফ্ল্যাট স্টিল উৎপাদন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রতিবছর প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার ফ্ল্যাট স্টিল আমদানির প্রয়োজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে আশা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রস্তাবিত কারখানাটি চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে নির্মিত হবে। এখানে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন হট-রোলড ফ্ল্যাট স্টিল, মাইল্ড স্টিল এবং স্টেইনলেস স্টিল উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলা হবে।
বর্তমানে দেশের শিল্প, অবকাঠামো, ভারী প্রকৌশল এবং উৎপাদন খাতে ব্যবহৃত এসব স্টিলের পুরো চাহিদাই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। বিএসআরএমের মতে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদন শুরু হলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমবে, সরবরাহ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে এবং দেশের স্টিল শিল্পে একটি নতুন শিল্পভিত্তি তৈরি হবে।
মিরসরাইয়ে শুরু হয়েছে জমি উন্নয়ন
বিএসআরএম জানিয়েছে, প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি ইতোমধ্যে বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে এবং সেখানে উন্নয়ন কাজ শুরু হয়েছে। সরকারি নীতিগত সহায়তা এবং অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত হলে জমি উন্নয়ন শেষে মূল কারখানার নির্মাণকাজ শুরু হবে।
কারখানাটিতে প্রচলিত গ্যাসনির্ভর প্রযুক্তির পরিবর্তে ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস (Electric Arc Furnace) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই প্রযুক্তি বিদ্যুৎ সাশ্রয়, উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়ক হবে।
২৫ হাজার কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা
বিএসআরএম গ্রুপের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর তপন সেনগুপ্ত বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
তার ভাষ্য, প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর প্রায় তিন বছরের মধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পটি প্রকৌশল, জাহাজ নির্মাণ, রেলপথ, অটোমোটিভ কম্পোনেন্ট এবং ভারী শিল্পের বিকাশেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
সরকারের কাছে নীতিগত সহায়তার আবেদন
এত বড় বিনিয়োগ বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা এবং অর্থায়ন নিশ্চিত করতে সরকারের কাছে বিশেষ সুবিধা চেয়েছে বিএসআরএম।
প্রতিষ্ঠানটি আগামী ১০ বছরের জন্য আমদানিকৃত হট-রোলড ফ্ল্যাট স্টিলের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের মতে, এতে দেশীয় উৎপাদন প্রতিযোগিতামূলক হবে এবং বড় আকারের শিল্প বিনিয়োগে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ বাড়বে।
তবে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রতিযোগিতামূলক বাজার ও ভোক্তা স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে শিল্পায়নে নতুন সম্ভাবনা
বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের স্টিল শিল্পে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে। দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণ খাতভিত্তিক লং স্টিল উৎপাদনে সীমাবদ্ধ থাকা শিল্প এখন উচ্চমূল্যের শিল্প কাঁচামাল উৎপাদনের দিকে এগিয়ে যাবে।
১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত বিএসআরএম বর্তমানে দেশের সংগঠিত নির্মাণ ইস্পাত বাজারের প্রায় ৩৪ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক স্টিল গলানোর সক্ষমতা ২৩ লাখ টন এবং রোলিং সক্ষমতা ১৬ লাখ টন। বছরে ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব অর্জনকারী প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক মানসম্মত বিভিন্ন স্টিল পণ্য উৎপাদন করে থাকে।



