spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img

সবার জন্য ইনকাম—ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম কি আমাদের দেশে সম্ভব?

লেখক : ফারহানা হুসাইন 

ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম বা UBI হলো একটি প্রস্তাবিত ব্যবস্থা যেখানে একটি দেশের প্রত্যেক নাগরিক বিনা শর্তে নিয়মিত একটি নির্দিষ্ট পরিমান অর্থ সরকারের কাছ থেকে পাবে। এই অর্থ কোনো যোগ্যতা, কাজ, বা অন্য কোনো শর্তে নয়, বরং শুধুমাত্র নাগরিকত্বের ভিত্তিতে প্রদান করা হবে। 

লক্ষ্য : 

১. দেশকে দারিদ্র্যতা থেকে মুক্ত করা। 

২. সকল নাগরিকের জীবনমান উন্নত করা। 

৩. সামাজিক বৈষম্য দূর করে সবার সমানাধিকার নিশ্চিত করা। 

৪. শিশুশ্রম ও অবৈধ কাজকর্মের ( যেমন : চুরি, ডাকাতি,মানবপাচার ইত্যাদি ) হার হ্রাস করা। 

৫. উদ্যোক্তা ও সৃজনশীল কাজের প্রতি নাগরিকদের আগ্রহী করে তোলা।

কোন কোন দেশে এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে?

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বেশ কয়েকটি  দেশে পরীক্ষামূলক ভাবে ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এর  মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : 

১. ফিনল্যান্ড : 

ফিনল্যান্ড সরকার পরীক্ষামূলকভাবে  ২ বছর মেয়াদি( ২০১৭-১০১৮)  UBI প্রকল্প চালু করেন যেখানে ২০০০ হাজার বেকার নাগরিককে প্রতিমাসে বিনা শর্তে ৫৬০ ইউরো প্রদান করে। 

২. ব্রাজিল :

 ব্রাজিলের মারিসা শহরে ২০১৯ সাল থেকে  “The Citizen’s Basic Income Program” নাম একটি ব্যবস্থা চালু করা হয় যেখানে শহরের প্রায় অর্ধেক বাসিন্দাকে UBI প্রদান করা হয়। 

৩. চীন : 

২০০৮ সাল থেকে চীনের ম্যাকাও শহরে “The Wealth Partaking Scheme” প্রকল্পের আওতায় সকল নাগরিককে বিনাশর্তে অর্থ প্রদান করা হয়। এই সুবিধা গ্রহণের জন্য বাসিন্দাদের অবশ্যই ম্যাকাও পরিচয়পত্র থাকতে হবে। 

৪. কেনিয়া : 

২০১৮ সাল থেকে GiveDirectly নামক একটি সংস্থা কেনিয়ার গ্রামাঞ্চলে প্রায় ২০০ টিরও বেশি গ্রামে UBI প্রকল্প চালু করেছে। 

৫. ভারত : 

২০১১ সালে দিল্লি ও মধ্যপ্রদেশে কিছু গ্রামে পরীক্ষামূলকভাবে UBI চালু করা হয়েছিল। ২০১৭ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষায় ভারত সরকার জাতীয় পর্যায়ে UBI চালুর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করে। 

এছাড়াও, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, মঙ্গোলিয়া, নামিবিয়া, সিয়েরা লিওন, স্পেন এবং উগান্ডার মত দেশগুলোতেও UBI নিয়ে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষামূলক প্রকল্প চলছে। 

বাংলাদেশে UBI এর সম্ভাবনা

বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ যেখানে ,

  • প্রতি ১০ জন্যে প্রায় ২ জন দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। 
  • প্রায় ৩০–৩৫% পরিবার এখনো পুষ্টিকর খাদ্যের পর্যাপ্ততা থেকে বঞ্চিত, বিশেষ করে গ্রামীণ ও চরাঞ্চলে।
  • প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার বেশি হলেও, স্কুল ঝরে পড়ার হার এখনো ২০%-এর উপরে।
  • প্রায় ৪.৪–৪.৫% শিশু শ্রমের শিকার। 
  • সার্বিক বেকারত্বের হার প্রায় ৪.২% 

এমতাবস্থায় দেশের জন্য  ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম (UBI) একটি সূর্যসম্ভাবনা হতে পারে – যা দারিদ্র্যতা দূরীকরণ, নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত ও জীবনমানের উন্নতি ঘটাতে পারবে।  তবে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে দেশকে কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে।  

 আরও পড়ুন :বাংলাদেশে মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ: একটি বিশ্লেষণ

চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা

১. অর্থনৈতিক প্রভাব : 

UBI প্রকল্প চালু করার জন্য একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রয়োজন। দেশের সকলকে UBI আওতায় আন্তে হলে বিপুল পরিমানে বাজেট রাখতে হবে। 

The daily Star এর এক প্রতিবেদন মতে – প্রস্তাবিত হিসাবে, যদি দেশের প্রতিটি যোগ্য ব্যক্তিকে প্রতি মাসে ৪,৫৪০ টাকা করে অর্থ প্রদান করা হয়, তাহলে একটি জাতীয় UBI কর্মসূচির জন্য কোষাগারে প্রায় ৭৫,০০০ কোটি টাকা খরচ হবে। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত আট শতাংশ হওয়ায়, জাতীয় UBI কর্মসূচি বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জের মাত্রা ভয়াবহ হবে।

২. বাস্তবায়নে প্রতিকূলতা :

UBI প্রকল্প বাস্তবায়ন বাংলাদেশের জন্য একটি জটিল প্রক্রিয়া হতে পারে। দেশের সকলের নিকট এই সেবা পৌঁছে দিতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ ও আধুনিক প্রযুক্তিগত অবকাঠামো প্রয়োজন। 

৩. কাজের প্রতি অনীহা সৃষ্টি

যদি দেশের সকলে সরকারের কাছ থেকে নিয়মিত ভাতা পেতে শুরু করে তবে কিছু মানুষের মধ্যে কাজের প্রতি অনীহা বা উদাসীনতা সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে বেকারত্বের হার বৃদ্ধ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 

করণীয় ও প্রস্তাবনা

শুরুতেই পুরো দেশকে UBI প্রকল্পের আওতায় না এনে দেশের কিছু দরিদ্রপ্রবণ অঞ্চল (যেমন : চর ও পাহাড়াঞ্চল, হাওর ও উপকূলীয় এলাকা ) বাছাই করে সেখানে পরীক্ষামূলকভাবে UBI প্রদান করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে এর কার্যকরিতা ও অসুবিধাসমূহ চিহ্নিত করে পরবর্তীতে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। 

একইসাথে, এই সেবাটি সহজ ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং নাগরিকদের মধ্যে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া।

পরিশেষে, বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও নিম্নমধ্য আয়ের দেশে ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম (UBI) চালু করা একটি সময়সাপেক্ষ ও জটিল প্রক্রিয়া। কিন্তু উপযুক্ত পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ধাপে ধাপে এগোলে ভবিষ্যতে এটি দেশে দারিদ্র ও বেকারত্ব হ্রাস এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। 

আরও পড়ুন : প্রবাসী আয় না বাড়লে দেশের অর্থনীতি কীভাবে চলবে?

তথ্যসূত্র : 

Some thoughts on universal basic income in Bangladesh

13 countries with active universal basic income and guaranteed basic income programs

প্রশ্নোত্তর (FAQ):

১. ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম (UBI) কী?
উত্তর : UBI হলো এমন একটি প্রকল্প, যেখানে দেশের প্রতিটি নাগরিককে সরকার নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ নিয়মিত ও বিনা শর্তে প্রদান করে থাকে, যাতে তারা মৌলিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করতে পারে।

২. UBI কি সবাই পাবে, নাকি শুধু দরিদ্ররা?
উত্তর : UBI-এর ধারণা অনুযায়ী, এটি “ইউনিভার্সাল” – অর্থাৎ ধনী-গরিব সবাই পাবে। তবে অনেক দেশে পরীক্ষামূলকভাবে এটি শুধু দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য প্রাথমিকভাবে চালু করা হয়।

৩. বাংলাদেশে এটি চালু করা সম্ভব?
উত্তর : এখনই সম্পূর্ণরূপে চালু করা সম্ভব নয়। তবে ধাপে ধাপে পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে ভবিষ্যতে প্রয়োগ করা যেতে পারে।

৪. এতে কাজের প্রতি মানুষের অনীহা তৈরি হবে না?
উত্তর : কিছু ক্ষেত্রে এমন আশঙ্কা থাকলেও গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ মানুষ এই আয়কে নিরাপত্তা হিসেবে দেখে এবং চাকরি বা ব্যবসার প্রতি আরও আগ্রহী হয়। তবুও এটি বাস্তবায়নের আগে জনসচেতনতা ও মনোভাবের পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ।

More articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest article

“আমাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়নি, পারিবারিক কাজে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে ছুটি নিয়েছি”—দাবি ওমর ফারুক খাঁনের

ঢাকা, ১২ এপ্রিল ২০২৬: ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওমর ফারুক খাঁনকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠিয়েছে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ—এমন তথ্য উঠে এসেছে...

ছেঁড়া ও অযোগ্য নোট নিয়ে গ্রাহক হয়রানি বন্ধে কঠোর অবস্থানে বাংলাদেশ ব্যাংক

ঢাকা, ১২ এপ্রিল ২০২৬: দেশের সকল তফসিলি ব্যাংককে ছেঁড়া, ক্ষতিগ্রস্ত ও ময়লা নোট গ্রহণ এবং বিনিময়ে নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।...

EDF তহবিল ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা: ব্যবসায়ীদের আশ্বাস বাংলাদেশ ব্যাংকের

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ব্যবসায়ী নেতাদের আশ্বস্ত করেছেন যে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (Export Development Fund - EDF) ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ৫ বিলিয়ন ডলারে...

দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা এক মঞ্চে—৮ম বাংলাদেশ রিটেইল কংগ্রেস

লেখক: নিশি আক্তারঢাকা, ৫ এপ্রিল ২০২৬ । দেশের খুচরা (রিটেইল) খাতকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে আগামী ১৮ এপ্রিল ২০২৬...