লেখকঃ বাহারিন আক্তার অন্তরা
বই পড়া একটি সুন্দর গুণ। বই পড়ে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানা যায়। বই বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। যেমন:গল্পের বই, সাইন্সফিকশন, ধাঁধা, ভ্রমণ, নেতৃত্ব, ব্যবস্থাপনা, আত্মউন্নয়ন বিষয়ক প্রভৃতি।
এর মধ্যে যদি বিশেষভাবে নেতৃত্ব শিখতে চাই তবে নেতৃত্ব বিষয়ক বই পড়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে নেতৃত্ব সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা যায় এমন বই বাছাই করতে হবে। যেমন- জন সি. ম্যাক্সওয়েলের বই,
জিম কলিন্সের ‘Good to Great’ বা পিটার ড্রাকারের ‘The Effective Executive’ এর
মতো বইগুলো নেতৃত্বের মূল নীতিগুলি বুঝতে সাহায্য করতে পারে।
বই থেকে কিভাবে নেতৃত্ব শেখা যায়?
বই পড়া এবং তার গভীর মর্ম উপলব্ধি করার মাধ্যমে একজন ভালো নেতা হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টি অর্জন করাকে বোঝায়। এটি মূলত তাত্ত্বিক জ্ঞানকে বাস্তবসম্মত উপায়ে প্রয়োগ করার প্রস্তুতি।
১. সঠিক বই বাছাই করতে হবে
পৃথিবীতে অনেক ধরনের বই আছে। তার মধ্যে থেকে আমাদের পছন্দ ও প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক বই বাছাই করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তির নেতৃত্বস্থানীয় বই প্রয়োজন কিন্তু সে নিয়ে আসলো হুমায়ুন আহমেদ এর ‘হিমু’ তাহলে কিভাবে সে নেতৃত্ব সম্পর্কে শিখতে পারবে? তাই –
- প্রয়োজন নির্ধারণ করতে হবে।
- প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক বই বাছাই করতে হবে।
- একই বিষয়ে অনেক লেখকের বই রয়েছে।
তার মধ্যে বিখ্যাত লেখকের বই বেছে নিতে হবে।
২. মনোযোগী হতে হবে
পছন্দ অনুযায়ী বই বাছাই করার পর সে বইটি ভালো মতো পড়তে হবে, বুঝতে হবে, অনুধাবন করতে হবে।
তাহলেই সঠিক ভাবে জানা ও শিখা যাবে।
- বইটি পড়ার জন্য সঠিক সময় নির্ধারণ করতে হবে। যাতে সময় নিয়ে পড়া যায় এবং মনোযোগ ধরে রাখা যায়।
- বই পড়ার সাথে সাথে অন্য কাজ করা যাবে না। এতে মনোযোগ নষ্ট হয়।
৩.গুরুত্বপূর্ন বিষয়গুলি হাইলাইট করা
বই পড়ার সময় একটি ভালো অভ্যাস হলো গুরুত্বপূর্ণ
পয়েন্ট বা বিষয় হাইলাইট করা। এতে করে ওই লাইন বা পয়েন্ট টি মনে রাখতে সুবিধা হয় এবং পরবর্তীতে আবার বইটি পড়ার সময় ওই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নজরে পরে।
- ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে।
- গভীরতা বুঝতে এবং মূল ধারণাগুলি ধরে রাখতে সাহায্য করে।
- প্রয়োজন হলে বিষয়গুলোকে নোট করে নেওয়া যায়।
৪. বাস্তব জীবনের উদাহরণের সাথে মেলানো
বইগুলিতে যে নেতৃত্বের কৌশল বা উদাহরণগুলি দেওয়া আছে, সেগুলোকে নিজের জীবনের বা কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা বা পরিচিত নেতাদের আচরণের সাথে তুলনা করা যেতে পরে।
- এতে করে বিষয়গুলো বুঝতে সুবিধা হয়
- সহজেই স্পস্ট হয়ে ওঠে।
- দ্রুত শেখা যায়।
৫. সফল নেতাদের জীবনি পাঠ করে
আসলে যে নেতৃত্ব দেন তিনিই নেতা। শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে, পরাধীনতার বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে যারা ইতিহাসে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন তাদেরকে আমরা নেতা হিসেবে জানি। মহাত্মা গান্ধী অহিংস-অসযোগ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে, নেলসন ম্যান্ডেলা বর্ণ প্র্থার বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে, মার্টিন লুথার সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন।
আরও পড়ুন:কেনো টাইম ম্যানেজমেন্ট সফলতার চাবিকাঠি
এবার আসি কোনো বই পড়ে নেতৃত্ব সম্পর্কে কি কি শিখতে পারব।
নেতৃত্ব কী?
নেতৃত্বের হলো তার অনুসারীদের কাজকে অভিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে নির্দেশনা দেওয়া। যিনি বা যারা এরূপ নির্দেশনা দিয়ে থাকেন তাকে বা তাদেরকে নেতা বলা হয় থাকে।
- নেতৃত্বের দুটি পক্ষ থাকে। এক হচ্ছে নেতা এবং অন্যজন হচ্ছে তার অনুসারী।
- নেতা আদেশ দিয়ে থাকেন।
- অনুসারীরা নেতার আদেশ মান্য করে।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ‘x company’ তে তাদের কাজ করার জন্য কয়েকটি গ্রুপ থাকে। এই গ্রুপ গুলোতে Leader বা একজন নেতা থাকেন যিনি তার অনুসারী যারা আছেন তাদেরকে নির্দেশ দিয়ে থাকেন। এবং তার অনুসারীরা তাদের নেতার আদেশ মান্য করতে বাধ্য থাকে।
কয়েকজন বিশেষজ্ঞের মতে নেতৃত্বের সংজ্ঞা:
১. কিথ ডেভিস (Keith Davis)-এর মতে:
“নেতৃত্ব হল উদ্দেশ্য অর্জনের নিমিত্তে অন্যান্য লোকদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎসাহিত ও সাহায্য করার একটি প্রক্রিয়া।”
২. আর. ডাব্লিউ. গ্রিফিন (R. W. Griffin)-এর মতে:
“অন্যকে প্রভাবিত করার ক্ষমতাকে নেতৃত্ব হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায়।”
৩. ভ্যান ফ্লিট (Van Fleet)-এর মতে:
“নেতৃত্ব হল একটি প্রভাব-প্রক্রিয়া যা অন্যদের আচরণ পরিবর্তনে ব্যবহৃত হয়।”
সাধারণভাবে বলা যায়, নেতৃত্ব হলো সেই সামাজিক প্রক্রিয়া, যেখানে একজন নেতা তাঁর ব্যক্তিগত গুণাবলী ও প্রভাবের মাধ্যমে একদল অনুগামীকে স্বেচ্ছায় দলীয় বা সাংগঠনিক লক্ষ্য অর্জনের দিকে চালিত করেন।
নেতৃত্ব কেন গুরুত্বপূর্ণ?
নেতৃত্ব একটি দল, সংগঠন বা সমাজের জন্য অপরিহার্য, কারণ এটি কর্মীদের একত্রিত করে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে চালিত করে এবং সাফল্যের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করে। নেতৃত্ব ছাড়া যেকোনো প্রচেষ্টা বিশৃঙ্খল ও লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে পারে। নিম্নে এর গুরুত্ব তুলে ধরা হলো:
১. ইউনিটি তৈরিতে
একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য কতিপয় ব্যক্তির
মিলবন্ধনে একটি ইউনিট বা সংঘ তৈরি হয়। এই সংঘ বা ইউনিটকে যথাযত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য একজন নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। নেতৃত্ব যত শক্তিশালী হয় দলের ইউনিটি তত মজবুত হয়।
- নেতিত্বের ফলে সংঘের কতিপয় ব্যক্তির মধ্যে ইউনিটি তৈরি হয়।
- প্রতিটি ইউনিটের একটি লক্ষ্য থাকে। অর্থাৎ, ইউনিটের সকল ব্যক্তি একই লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করে।
২. লক্ষ্যার্জন নিশ্চিত করা
দক্ষ নেতৃত্ব জনশক্তিকে সঠিকভাবে পরিচালনা
করে লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে। তার নির্দেশ
এর মাধ্যমেই তার অনুসারীরা লক্ষ্য অর্জনের
দিকে ধাবিত হয়।
- পরিকল্পনার অভিপ্রেত ফলকেই লক্ষ্য বলে।
- এই লক্ষ্য যাতে নিশ্চিত হয় সে দিকে খেয়াল রেখেই অনুসারীদের গাইড করা হয়।
৩. কর্তৃত্বের মাধ্যমে কাজ আদায়
অধস্তনদের আদেশ দান ও বাধ্য করার
ক্ষমতাকে কর্তৃত্ব বলে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃত্বশালী না হলে কখনোই অধস্তনদেরকে পরিচালনা সম্ভব হয় না।
কেবল যোগ্য নেতা তার কর্মীদের প্রকৃতি, যোগ্যতা -অযোগ্যতা, চাওয়া-পাওয়া সম্পর্কে অবগত থাকে। ফলে কাকে, কবে, কোন দায়িত্ব, কতটুকু প্রদান করলে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব হয় তা নেতা নির্ধারণ করতেপারে। ফলে কর্তৃত্ব প্রয়োগ সহজ হয়।
- নেতাকে অবশ্যই কর্তিত্বশালী হতে হবে।
- লক্ষ্য অর্জনের জন্য সঠিক উপায়ে কর্মীদের পরিচালনা করতে হবে।
- তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ বন্টন করতে হবে।
৪.সহযোগিতার ভিত্তি
যেকোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ছাড়া লক্ষ্যার্জন
সম্ভব নয়। কার্যকর নেতৃত্ব সংগঠনের অভ্যন্তরে
এরূপ সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। নেতৃত্বকে ঘিরে জনশক্তি ঐকাবদ্ধ হয় এবং পারস্পরিক সহযোগিতায় কার্য সম্পাদন করে।
- লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রতিটি ব্যক্তি, বিভাগ, উপবিভাগের মধ্যে একতা থাকা জরুরি।
- এই ঐক্যবদ্ধকরণের কাজ নেতৃত্বের মাধ্যমেই সম্ভব।
সুতরাং, নেতৃত্ব সম্পর্কে আগ্রহী ব্যক্তি যদি সঠিক বইটি বাছাই করে মনযোগী হতে পারেন তবে তিনি উপরের বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতে পারবেন।
এবার কিছু বিখ্যাত ব্যক্তিদের বই এবং সেগুলো দিয়ে নেতৃত্ব সম্পর্কে কি শেখ যাবে তা তুলে ধরা হলো:
| বইয়ের নাম | লেখকের নাম | কি শেখ যাবে |
| Leaders Eat Last | Simon Sinek | নেতৃত্বদানের কৌশল শেখা যাবে |
| Extreme Ownership | Jocko Willink and Leif Babin | শতভাগ দায়িত্ব নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা শেখাবে |
| Mindset | Carol Dweck | অগ্রগতি এবং শেখার প্রতি একটি উন্মুক্ত মানসিকতা তৈরি করতে শেখাবে |
| Atomic Habits | James Clear | ছোট ছোট অভ্যাসের মাধ্যমে বড় অর্জন করার উপায় শেখাবে, যা নেতৃত্বকে শক্তিশালী করবে |
উপসংহার
বই পড়া নেতৃত্ব শেখার একটি অত্যন্ত কার্যকর উপায় হলেও এটি নেতৃত্বের সম্পূর্ণতা দেয় না। বই থেকে অর্জিত জ্ঞানকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা, অন্যদের সাথে কাজ করা এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবে সন্দেহ নেই, বই হলো একজন ভালো নেতার জন্য অপরিহার্য সরঞ্জাম, যা তাকে জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিকতার আলোয় ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। বইয়ের জ্ঞান আর বাস্তব অভিজ্ঞতার সঠিক মিশেলই একজন ব্যক্তিকে একজন যোগ্য ও সফল নেতা হিসেবে গড়ে তোলে।
সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
১. নেতৃত্ব কী?
উত্তর: কোনো দল বা গোষ্ঠীর আচরণ ও কাজকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যপানে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কৌশলকেই নেতৃত্ব বলে।
২.বই পড়ে নেতৃত্ব শেখা সম্ভব?
উত্তর: হ্যাঁ সম্ভব। যদি সে বই পড়ার ক্ষেত্রে মনযোগী হয় এবং যা পড়েছে সেগুলো বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারে তবেই বই পরে নেতৃত্ব শেখা সম্ভব।
৩. সফল নেতাদের জীবনি কিভাবে নেতৃত্ব শেখাতে সহায়তা করতে পারে?
উত্তর: একজন সফল নেতা কিভাবে নেতৃত্ব দিয়ে তার কাজকে সফল করেছেন সে বিষয়গুলো ভালোভাবে বুঝতে পারা, তাদের নেতৃত্বের গভীর মূল্য় উপলব্ধি করার মাধ্যমে নেতৃত্ব শেখা যায়।
৪. কেনো সঠিক বই বাছাই করা জরুরি?
উত্তর: পৃথিবীতে অনেক ধরনের বই আছে। তার মধ্যে থেকে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী বই বাছাই করে নিতে হয়। নয়তো যে বিষয় সম্পর্কে শিখতে চাচ্ছি তা অন্য বই এর মাধ্যমে শিখা সম্ভব নয়।
৫. নেতৃত্ব কেন জরুরি?
উত্তর: কোনো একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য, কাজটির সম্পর্কে গাইডলাইন দেওয়ার জন্য, কাজটি ঠিকভাবে হচ্ছে কিনা তদারক করার জন্য নেতৃত্ব জরুরি।
৬. দৈনন্দিন জীবনে নেতৃত্বের প্রয়োজন রয়েছে?
উত্তর: হ্যাঁ। জীবনে চলার পথে প্রায় প্রত্যেকটি পদক্ষেপে নেতৃত্বের প্রয়োজন রয়েছে।




