দ্য ডেইলি করপোরেট ডেস্ক
ঢাকা, ১৮ আগস্ট ২০২৬: বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতে স্থানীয় বিনিয়োগ বাড়ানো, দক্ষ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এবং বিদেশি মূলধন আকর্ষণের লক্ষ্য নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে ৪০০ কোটি টাকার ‘বাংলাদেশ ফান্ড অব ফান্ডস’। সরকারি উদ্যোগে চালু হওয়া এই তহবিল সরাসরি স্টার্টআপে অর্থ দেবে না; বরং নির্বাচিত দেশি-বিদেশি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডে বিনিয়োগের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে সম্ভাবনাময় স্টার্টআপে মূলধন পৌঁছে দেবে।
১৬ আগস্ট রাজধানীর আগারগাঁওয়ের আইসিটি টাওয়ারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম তহবিলটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিনিয়োগকারী, উন্নয়ন সহযোগী ও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সরাসরি স্টার্টআপে যাবে না ৪০০ কোটি টাকা
‘ফান্ড অব ফান্ডস’-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—এখান থেকে কোনো স্টার্টআপ সরাসরি অর্থের জন্য আবেদন করতে পারবে না। তহবিলটি পেশাদার ও অভিজ্ঞ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডে বিনিয়োগ করবে। পরবর্তীতে এসব ফান্ড তাদের নিজস্ব যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন পর্যায়ের স্টার্টআপে বিনিয়োগ করবে।
স্টার্টআপ বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল হাই জানান, সরকার এখানে মূলত পুরো ইকোসিস্টেমের তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকা পালন করবে। প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান, কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতা, স্থানীয় সমস্যার সমাধান এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রসারণের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে বিনিয়োগযোগ্য ফান্ড নির্বাচন করা হবে।
ফান্ড ম্যানেজার নির্বাচনে আর্থিক সক্ষমতা, অডিট রিপোর্ট, আইনগত বৈধতা ও পেশাদার ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখা হবে।
কেন এই তহবিল গুরুত্বপূর্ণ
গত এক দশকে বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলো আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রায় ১২০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে। তবে এর মাত্র প্রায় ৭ শতাংশ এসেছে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। অর্থাৎ, দেশের স্টার্টআপগুলোর মূলধন সংগ্রহ এখনো অনেকাংশে বিদেশি বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল।
এই পরিস্থিতিতে ‘ফান্ড অব ফান্ডস’ স্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক মূলধনের একটি নতুন উৎস তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এটি দেশে আরও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করবে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্যও বাংলাদেশকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় বিনিয়োগের সক্ষমতা বাড়লে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা বা ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বিদেশি মূলধনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকিও কমবে।
সরকারি অর্থ, কিন্তু পেশাদার ব্যবস্থাপনায়
অনুষ্ঠানে মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, অর্থের অভাবে কোনো সম্ভাবনাময় উদ্যোগ যেন থেমে না যায়, সে লক্ষ্যেই বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, শুধু সরকারি অর্থায়নের ওপর নির্ভর না করে বেসরকারি খাতকেও স্টার্টআপে বিনিয়োগে এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, দক্ষতা, সুশাসন ও পেশাদারিত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ‘ফান্ড অব ফান্ডস’ পরিচালনা করা হবে।
এর আগে স্টার্টআপ বাংলাদেশ নিজস্ব উদ্যোগে ৩৬টি প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপে প্রায় ১১১ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে।
শুরু হয়েছে ফান্ড ম্যানেজার বাছাই
৪০০ কোটি টাকার তহবিল বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে যোগ্য ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড ম্যানেজারদের কাছ থেকে Request for Expression of Interest (REOI) আহ্বানের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নির্বাচিত ফান্ডগুলো পরবর্তীতে স্টার্টআপে বিনিয়োগ করবে।
স্টার্টআপ বাংলাদেশের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই কাঠামোর মাধ্যমে শুধু অর্থায়ন নয়—স্টার্টআপগুলোকে মেন্টরশিপ, বাজারসংযোগ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গেও যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।
অর্থের পাশাপাশি তৈরি হবে বিনিয়োগ অবকাঠামো
সরকারের এই উদ্যোগকে শুধু ৪০০ কোটি টাকার একটি তহবিল হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। এর লক্ষ্য হচ্ছে দেশের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই স্টার্টআপ অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করা।
সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এর মাধ্যমে স্থানীয় ফান্ড ম্যানেজারদের সক্ষমতা বাড়বে, আন্তর্জাতিক মানের বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা তৈরি হবে এবং জ্ঞান ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের সুযোগ বাড়বে। পাশাপাশি স্টার্টআপগুলোর মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নতুন ব্যবসায়িক মডেল তৈরির সম্ভাবনাও বাড়বে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এই তহবিলের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে ফান্ড ম্যানেজার নির্বাচনের স্বচ্ছতা, বিনিয়োগের পেশাদার মূল্যায়ন এবং রাজনৈতিক বা আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থাপনার ওপর। ভুল প্রকল্পে বিনিয়োগ বা অদক্ষ ব্যবস্থাপনা হলে সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাত যখন স্থানীয় মূলধনের সংকট, সীমিত ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বাজার এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন ৪০০ কোটি টাকার এই ‘ফান্ড অব ফান্ডস’ তাই কেবল নতুন একটি অর্থায়ন কর্মসূচি নয়—বরং দেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটি বড় পরীক্ষা।




